হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৩ ০০:৫৯ এএম
আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৬:০৪ পিএম
ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে খাতুনগঞ্জে অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় সেখানে অভিযান পরিচালনা করছেন ভোক্তা সংরক্ষণ অধিকার অধিদপ্তর। প্রবা ফটো
চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের আড়তগুলোতে এক দিনের ব্যবধানে ৯৫ টাকা কেজির পেঁয়াজের দাম উঠে গেছে ২০০ থেকে ২২০ টাকায়। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে ১০০ টাকা। জানা গেছে, শুক্রবার (৮ ডিসেম্বর) ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে খাতুনগঞ্জে অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়ে যায়।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাতুনগঞ্জে গড়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ ট্রাক পেঁয়াজ বেচাকেনা হয়। একটি ট্রাকে ১৩ টন করে পেঁয়াজ পরিবহন করা হয়। সেই হিসেবে ২০টি ট্রাকে পেঁয়াজ পরিবহন করা হয় ২ লাখ ৬০ হাজার। প্রতি কেজিতে যদি ১০০ টাকা করে লাভ করা হয়। তাহলে এক দিনে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নিয়েছেন অন্তত দুই কোটি ৬০ লাখ টাকা।
তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। পেঁয়াজের আড়তদাররা জানিয়েছেন, তারা কমিশনে বিক্রি করেন। আমদানিকারকরা তাদের আড়তে মাল রেখে যেই দর নির্ধারণ করে দেন, ওই দামেই আড়তদাররা পেঁয়াজ বিক্রি করেন। তাই এই বাড়তি টাকাও খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী নয়, আমদানিকারকরাই হাতিয়ে নিয়েছেন।
জানতে চাইলে পেঁয়াজ আমদানিকারক খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হলে তখন পণ্যের দাম এমনিতেই বেড়ে যায়। তখন এমনিতেই বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। কে কার থেকে বেশি লাভ করবে, সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পর সেই অস্থিরতা বিরাজ করছে খাতুনগঞ্জে। শুক্রবার সকালেও আমরা ১০৫ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করেছি, কিন্তু শনিবার সকালে সেটি ১৭০/১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আড়তগুলোতে মাল নেই, তাই কারও কাছে কয়েক বস্তা পেঁয়াজ থাকলে তারা চাইবেন বেশি দামে বিক্রি করতে। এখন সেটিই হচ্ছে। বাজারে সরবরাহ সংকট হলে সামনে দাম আরও বেড়ে যাবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে খাতুনগঞ্জে ২০ থেকে ২৫ ট্রাক পেঁয়াজ বেচাকেনা হয় ঠিক আছে। কিন্তু এখন দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই পরিমাণ বেচাকেনা হওয়ার সুযোগ নেই। আড়তগুলোতে এখন পেঁয়াজ নেই।’
ভারত তো হুট করে কাল রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে তাহলে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার যেই পেঁয়াজ খাতুনগঞ্জে এসেছে সেগুলো গেল কোথায়Ñ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আড়তদাররা বিক্রি করে দিয়েছেন। টেলিভিশনের খবর দেখে মানুষ কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন, যে কারণে পেঁয়াজগুলো দ্রুত বিক্রি হয়ে গেছে।’
চলতি মাসের শুরুতে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ৩০ হাজার কেজি পেঁয়াজ আমদানি করে চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রাইশান এন্টারপ্রাইজ। ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা এসব পেঁয়াজের শুল্কায়ন করা হয় গত ২ ডিসেম্বর।
শুল্কায়ন মূল্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পেঁয়াজগুলোর প্রতি কেজির শুল্কায়ন মূল্য (এটি হলো-আমদানি মূল্য যার ওপর ভিত্তি করে শুল্কায়ন করা হয়) ছিল ৮২ সেন্ট। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আল আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় প্রতি ডলার ১১০ টাকা হিসেবে এই আমদানি মূল্য পরিশোধ করে। সেই হিসেবে প্রতি কেজি পেঁয়াজের আমদানি মূল্য ছিল ৯০ টাকা। এর সঙ্গে ৫ টাকা পরিবহন খরচ হিসেব করলে পেঁয়াজ আমদানিতে কেজি প্রতি খরচ পড়ছে সর্বোচ্চ ৯৫ টাকা।
এই ৯৫ টাকা দামের প্রতি কেজি পেঁয়াজ গতকাল শনিবার খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকায়। সেই হিসেবে প্রতি কেজি পেঁয়াজে এখন লাভ হচ্ছে অন্তত ১০০ থেকে ১২০ টাকা। অথচ এক দিন আগেও শুক্রবার খাতুনগঞ্জে এই পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল প্রতি কেজি ১২০ টাকা। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কেজিতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে অন্তত ১০০ টাকা। শনিবার এই পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকায়।
বিষয়টিকে অযৌক্তিক বলেছেন ভোক্তারা। ভারত থেকে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ হওয়ার অজুহাতে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কেজিতে ১০০ টাকা দাম বাড়িয়ে দেওয়া অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর ব্যবসায়ীরা যেই প্রক্রিয়ায় পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে মানুষের পকেট কেটেছেন, সেটিকে ব্যবসা বলা যায় না। এটা ডাকাতি। ভারত রপ্তানি বন্ধ করেছে গতকাল (শুক্রবার), সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কারণ বাজারে এখন যেসব পেঁয়াজ আছে সেগুলো কয়েকদিন আগে আমদানি করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করি বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে সুশাসনের অভাব রয়েছে। তাই ব্যবসায়ীরা যে যেভাবে পারছে একটা অজুহাত দেখিয়ে মানুষের পকেট কাটছে। ব্যবসায়ীদের এই অতিমুনাফা আমাদেরকে স্তম্ভিত করেছে। সরকারের বিধিবিধানকে তোয়াক্কা না করে ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো ব্যবসা করবে সেটি হতে পারে না। আমরা চাই এটি বন্ধ হোক।’
পেঁয়াজ আমদানির গত ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নভেম্বর মাস পর্যন্ত যেসব পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে সেগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশের শুল্কায়ন মূল্য ছিল প্রতি কেজি ৩২ সেন্ট বা ৩৫ টাকা (প্রতি ডলার ১১০ টাকা হিসেবে)। এরপর নভেম্বর মাসে ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। নভেম্বর মাস থেকে এখন পর্যন্ত যেসব পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে সেগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশের শুল্কায়ন মূল্য ছিল প্রতি কেজি ৮১ সেন্ট। প্রতি ডলার ১১০ টাকা হিসাবে প্রতি কেজি পেঁয়াজের আমদানি মূল্য পড়ছে ৮৯ টাকা। শুক্রবার ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগ পর্যন্ত এই ৮৯ টাকা আমদানি মূল্যের পেঁয়াজ খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়ে আসছিল। কিন্তু শুক্রবার ভারত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর খাতুনগঞ্জে হু হু করে বেড়ে যায় পেঁয়াজের দাম। শুক্রবার সকালে যেখানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১২০ টাকায়, সেখানে একই দিন বিকালে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১৬০ টাকায়। এরপর শনিবার সকালে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়। দুপুর না হতেই ওই পেঁয়াজের দাম বেড়ে প্রতি কেজি বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২২০ টাকায়। এই হিসেবে এক দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা।