প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:০১ এএম
আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:০১ এএম
আজ ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়ার ১৪৩তম জন্মদিন। একই দিনে মৃত্যুবরণ করেন এই মহীয়সী। সেই হিসেবে ৯১তম মৃত্যুবার্ষিকী। দিনটি উপলক্ষে রংপুরে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রে আলোচনাসভার আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি। এছাড়া জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হবে। প্রকাশ করা হয়েছে বিশেষ ক্রোড়পত্র, পোস্টার, বুকলেট।
দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘নারী-পুরুষের সমতার দাবি নিয়ে কলম আন্দোলনের মাধ্যমে উপমহাদেশের নারীদের জীবন পরিবর্তনের ধারার সূচনা করেছিলেন মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।’ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বেগম রোকেয়া ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন আধুনিক নারী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সমাজ তথা রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের জন্য পুরুষের পাশাপাশি নারীকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন। তার এই উপলব্ধি ও আদর্শ আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।’
নারী জাগরণের পথিকৃৎ রোকেয়ার কর্ম ও আদর্শ সামনে রেখে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অনন্য অর্জনের জন্য প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া পদক দেওয়া হয়। এবারও পাঁচজন নারী পাচ্ছেন রোকেয়া পদক। আজ শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের সম্মাননা পদক দেবেন।
১৮৮০ সালে ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দে রক্ষণশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রোকেয়া। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর ভারতের কলকাতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রোকেয়ার জীবনকর্ম সম্পর্কে গবেষণা, তার গ্রন্থাবলির অনুবাদ, প্রচার ও প্রকাশনা, সংস্কৃতিচর্চা এবং স্থানীয়দের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তার জন্মস্থান পায়রাবন্দ ইউনিয়নের খোর্দ্দ মুরাদপুরে স্থাপন করা হয় রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র। ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০১ সালের ১ জুলাই এটির উদ্বোধন করেন তিনি। প্রথমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কেন্দ্রটির দায়িত্ব নিলেও পরে বাংলা একাডেমির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের স্থাপত্য পরিকল্পনা অনন্য। ফটকে স্বাগত জানাচ্ছে বাগানবিলাস। এরপর পিচঢালা চকচকে পাকা রাস্তা। দুই ধারে পরিপাটি ঝাউগাছের সারি। গেস্টহাউস, স্মৃতিকেন্দ্র, ডরমিটরি সাজানো-গোছানো। প্রশাসনিক ভবনে রয়েছে মিলনায়তন, গবেষণাকক্ষ, সেমিনারকক্ষ। ডরমিটরির সামনে শানবাঁধানো পুকুর। কোনো কোনো বছর পুকুরের পানিতে শোভা পায় লাল শাপলা। পুকুরপাড়ে কোলাহলমুক্ত পরিবেশে নেচে বেড়ায় নানা প্রজাতির পাখি। স্মৃতিকেন্দ্রের চারদিক গাছগাছালিতে ভরা। ৩ একর ১৫ শতক আয়তনের দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিকেন্দ্রটি। রোকেয়াকে স্মরণ করতে গেস্টহাউসের সামনে রয়েছে ভাস্কর্য। চতুর্ভুজ আকৃতির ঝাউ ও শোভাবর্ধনকারী গাছে আবৃত্ত জায়গাটি। সেখানে জ্ঞানের প্রদীপ বই হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন রোকেয়া। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ভাস্কর্যটি হয়তো নারীদের অনুপ্রেরণা হয়েছে। তবে স্মৃতিকেন্দ্রের অচলাবস্থা রোকেয়ার এ ত্যাগকে ম্লান করেছে, বলছেন স্থানীয়রা। বাংলা একাডেমি নতুন করে উদ্যোগ নিয়ে কেন্দ্রটি সচল করবে বলে জানিয়েছে।
রোকেয়ার জন্মভিটা ও স্মৃতিকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, জন্মভিটার ধ্বংসাবশেষ অযত্ন-অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। শ্যাওলা জমেছে ধ্বংসাবশেষের ইটগুলোতে। টিকে রয়েছে রোকেয়ার বাড়ির একটি জানালাসহ দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ। অপরদিকে স্মৃতিকেন্দ্রের বিভিন্ন কক্ষের জানালার কাচ ভেঙে গেছে। অডিটরিয়ামের লাইটÑফ্যান নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। টয়লেটগুলোরও শোচনীয় অবস্থা।
পায়রাবন্দের আব্দুর রহিম বলেন, রোকেয়ার জন্মভিটা সংরক্ষিত পুরার্কীতি হলেও এর কোনো যত্ন নেই। রোকেয়াকে নিয়ে গবেষণার জন্য স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও তার কোনো কার্যক্রম নেই। স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপনের পর একে ফেলে রাখা মানে রোকেয়াকে অমর্যাদা করা। শিক্ষার্থী আয়শা আক্তার বলেন, প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর এলে রোকেয়া দিবস উপলক্ষে স্মৃতিকেন্দ্রের সাজসজ্জা হয়। জেলা ও জেলার বাইরে থেকে লোকজন আসে, অনুষ্ঠান উপভোগ করে। এরপর সবাই রোকেয়াকে ভুলে যায়। তাই স্মৃতিকেন্দ্রে কোনো কার্যক্রম চালু নেই।
পায়রাবন্দ রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, আমাদের স্বপ্ন ছিল শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকবে স্মৃতিকেন্দ্রটি। দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখানে রোকেয়াকে নিয়ে গবেষণা করতে আসবেন শিক্ষার্থীরা। বছরজুড়ে প্রশিক্ষণ-সাংস্কৃতিক চর্চা হবে। দেশের খ্যাতিমান মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনা থাকবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আমাদের অধরাই থেকে গেল। স্মৃতিকেন্দ্রটি চালুর বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শুধু আশ্বাসই দেওয়া হচ্ছে।
রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও রোকেয়া দিবস উপলক্ষে রোকেয়ার জন্মভিটায় তিন দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালিত হবে। স্মৃতিকেন্দ্রটি চালু ও রোকেয়ার জন্মভিটা সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে আমার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকবে। স্মৃতিকেন্দ্রটি নিয়ে সরকারের নানা পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছে রংপুর অফিস)