কপ-২৮ সম্মেলন
আমিনুল ইসলাম মিঠু, দুবাই থেকে
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ২৩:৪৬ পিএম
আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ০০:৪৯ এএম
জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-২৮) সপ্তম দিনের আলোচনায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের নেতারা। প্রবা ফটো
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় সবুজ জ্বালানিতে জোর দিচ্ছে বিশ্বসম্প্রদায়। বুধবার (৬ ডিসেম্বর) দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-২৮) সপ্তম দিনের আলোচনায় গুরুত্ব পায় মাল্টিলেভেল অ্যাকশন, আর্বানাইজেশন ও পরিবেশ সমৃদ্ধকরণ ও যোগাযোগ খাত।
বিভিন্ন আলোচনায় সবুজ জ্বালানিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা তৈরিতে সহযোগিতা চেয়েছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। এ দিন কপ-২৮ সম্মেলনের সপ্তম দিনে জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আনা এক প্রস্তাবে ১০৬টি দেশ স্বাক্ষর করেছে। এটি গৃহীত হলে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন ও ভারতের মতো বড় রাষ্ট্রগুলো এখনও এই প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেনি। অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার সংকুচিত করতে একটি প্রস্তাব এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। যেখানে নতুনভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র না করার সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু ভারত ও চীন এটিতে এখনও সম্মতি দেয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে পৃথিবীর খাদ্য ব্যবস্থাপনা রূপান্তরের জন্য বিশ্বনেতারা কথা বলেছেন। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অন্যায্য যে খাদ্যব্যবস্থা আছে তা টিকিয়ে রেখে কোনোভাবেই জলবায়ু পরিবর্তন সামাল দেওয়া সম্ভব কি নাÑ সে আশঙ্কাও ব্যক্ত করেছেন তারা। পাশাপাশি সম্মেলনে বিভিন্ন সহ-অধিবেশনে খাদ্যব্যবস্থা রূপান্তরে নানা পরিকল্পনা ও মতামত তুলে ধরা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, জেলে ও আদিবাসী মানুষেরা কষ্টভোগ করছেন তা আলোচনা এসেছে।
বিকালে বাংলাদেশের প্রয়াত জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. সালিমুল হককে নিয়ে এক স্মরণসভার আয়োজন করে কপ-২৮ সেক্রেটারিয়েট। এ সময় বিভিন্ন সরকারি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা অংশ নেন। এ সময় সালিমুল হকের অবদানকে স্মরণ করা হয়। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজনে গুরুত্ব দিতে জোর দেওয়া হয়। যেমনÑ সালিমুল হকের দেখানো বাংলাদেশসহ বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত দেশের শরণার্থীরা যাতে স্থানীয়ভাবে অভিযোজন করতে পারেন, সেসব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়। এ সময় ক্ষয়ক্ষতির তহবিলকে দ্রুত বাস্তবায়ন এবং উন্নত দেশগুলোকে তহবিল ছাড় দেওয়ার জন্য তাগিদ দেয় বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণের নানা দিক তুলে ধরেছেন। এ দিন সকাল থেকে বিভিন্ন সাইড ইভেন্টে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে সবুজ জ্বালানি ব্যবহার নিয়ে প্রতিবাদ ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও যোগ দেন বাংলাদেশি পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। এ সময় গ্লোবাল সাউথে জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধ ও কৃষি, ভূমি ও জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে এক প্রতিবাদে যোগ দেন সম্মেলনে অংশ নেওয়া জলবায়ুকর্মীরা। তারা বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রযুক্তি নির্ভরতা পৃথিবীর ভূমি ও কৃষি ব্যবস্থাপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট নিরসনে কৃষকদের স্থানীয় অভিযোজনের আওতায় আনা ও যত দ্রুত সম্ভব কয়লা, তেল ও গ্যাসনির্ভরতা বদলে সবুজ জ্বালানি যুক্ত করতে তহবিল গঠনের দাবি জানান পরিবেশবাদীরা।
সম্মেলনে যোগ দেওয়া জলবায়ু গবেষক পাভেল পার্থ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের আলোচনায় তুলে ধরেছি অভিযোজনের ক্ষেত্রে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা জলবায়ু সহিষ্ণু ও সহনশীল কৃষিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ কোনোভাবেই মানুষের জন্য উপকার বয়ে আনবে না। ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লবের ভেতর দিয়ে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র, পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হয়েছে তা এখন প্রমাণিত হয়েছে। এখন আবার সেই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বাণিজ্য ও মুনাফা বিস্তারের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর যে কৃষির কথা বলছে তা পৃথিবীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলবে। তাই কৃষকের নেতৃত্বে কৃষি পরিবেশ বিদ্যার ভেতর দিয়ে স্থানীয় অভিযোজন চর্চা, কৌশল বা স্থানীয় যে বীজ আছে তা দিয়ে অ্যাগ্রো-ইকোলজিকে প্রমোট করতে হবে। এটিই হচ্ছে একমাত্র আসল ক্লাইমেট সলিউশন। যার মাধ্যমে মানুষ ও জলবায়ুকে সুরক্ষিত করা যাবে।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) তথ্য বলছে, পৃথিবীতে নিঃসরণ হওয়া মোট কার্বনের ২৫ ভাগ আসে পরিবহন খাত থেকে। যার ৪৫ শতাংশ আসে ব্যক্তিগত ও বাস থেকে। আর বাকি ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ আসে পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্ট যানবাহন থেকে। আর ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনে (এনডিসি) বাংলাদেশ অঙ্গীকার করেছে ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি, শিল্প ও পরিবহন খাতে ৫% কার্বন নিঃসরণ কমাবে।
সর্বশেষ হাল নাগাদ তথ্যমতে, ২০১২ সালে বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল ১৬৯ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় জ্বালানি খাতে, যা ৯৩ মিলিয়ন টন বা ৫৫%, পরিবহন খাতে আসে ১৭ মিলিয়ন টন বা ১০ শতাংশ। বিদ্যুৎ খাতে আসে ২১ মিলিয়ন টন বা সাড়ে ১২% আর কৃষি খাত থেকে আসে তিন মিলিয়ন টন বা ২ শতাংশ।
বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন প্রতিনিধিরা। তারা জানান, উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে বাংলাদেশের মাত্রা তার একভাগেরও কম। তবে সেটিও কমানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ সরকার। এজন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশবিষয়ক বিশেষ দূত সাবের হোসেন চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ২০৪০ সালের মধ্যে আমাদের মোট জ্বালানির ৪০ ভাগ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। আমাদের মুজিব প্রসপারিটি আছে সেখানেও বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। আমাদের সোলার হোস সিস্টেম আছে। সুতরাং বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাস্তবায়নে কাজ করছে। সম্মেলনে বাংলাদেশ কী করেছে সেটা জানানো হচ্ছে। আর এ সম্মেলনের মাধ্যমে আইনি সমঝোতাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে জলবায়ু সম্মেলনের আলোচনাগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির বিষয়টি। দুবাই জলবায়ু সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ২৫০০ লবিস্ট বা ব্যবসায় প্রতিনিধি যোগ দিয়েছে। যা গত ২৭টি সম্মেলনের চেয়েও বেশি বলছেন বিশ্লেষকরা। আর এবারের সম্মেলনে প্রতিবাদের সুযোগ সংকুচিত করার অভিযোগ উঠেছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মেলনের ইতিহাসে সবচাইতে বেশি লবিস্ট আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে প্রতিবাদ আয়োজনের সুযোগগুলো সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধে কতটা কম আন্তরিক স্বাগতিক দেশ ও কপ সেক্রেটারিয়েট। এমন আচরণে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের মূল গতি ও ধারা নিয়ে জলবায়ু গবেষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
এক ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি সাইমন স্টিয়েল বলেন, এখন সব দেশের সরকারকে অবশ্যই তাদের আলোচকদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলতে হবে। আমাদের আকাঙ্ক্ষার মাত্রা বাড়াতে হবে। গ্লোবাল স্টকদের মাধ্যমে জলবায়ু অ্যাকশনকে একটি ধারায় আনা হয়েছে। আমরা অভিযোজনের তহবিল দ্বিগুণ করব। এখন আমাদের নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে। আর নিজেদের লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। বৈশ্বিক অভিযোজন লক্ষ্যের প্রতি আমাদের লক্ষ্য স্থির করতে হবে। আট বিলিয়ন মানুষ এখন সামনের সারিতে। বর্তমানে মাত্র ৫০টি দেশে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্মেলনে যোগ দেওয়া ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, বুধবার কপ-২৮ এর প্রথম সপ্তাহ শেষ হলো। এ সপ্তাহে কিছু আশার দিক রয়েছে, তবে হতাশাও আছে। আশার কথা হচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতির তহবিল গঠন শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়নি। হতাশার কথা হচ্ছে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার পর যাতে রূপান্তর ন্যায্য ও মানুষের জন্য কল্যাণের জন্য হয়Ñ সে কথাটি কোথাও নেই। এজন্য জলবায়ু তহবিলে অর্থায়ন যথেষ্ট পরিমাণে থাকতে হবে। যাতে মানুষ দ্রুততার সঙ্গে সুফল পেতে পারে। আরেকটি হতাশার বিষয় হচ্ছে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলা হলেও সঙ্গে সঙ্গে নিউক্লিয়ার পাওয়ার, হাইড্রোজেন ফুয়েলসহ বিভিন্ন ফলস সলিউশনের বিষয় আনা হয়েছে। তবে এর মধ্যেও আশার কথা হলো, গত সপ্তাহে ক্ষয়ক্ষতির তহবিলে অর্থ আসা শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার জমা হয়েছে।