জনশুমারি প্রতিবেদন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৩ ১০:৫০ এএম
ছবি : সংগৃহীত
জনশুমারি ও গৃহগণনার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রবাসী জনসংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ৫০ লাখ ৫৩ হাজার ৩৫৮ জন বাংলাদেশি প্রবাসে আছেন। অন্যদিকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, বিদেশে কর্মরতের সংখ্যা ১ কোটি ৪৮ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭৪ জন। তা ছাড়া চলতি বছরের ৫ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, বিশ্বের ১৭৬টি দেশে বাংলাদেশের ১ কোটি ৪৯ লাখের অধিক কর্মী রয়েছে। আবার গত ১২ সেপ্টেম্বর সংসদে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ১ কোটি ৫৫ লাখ ১৩ হাজার ৪৬০ জন প্রবাসে কর্মরত। এসব তথ্যের সঙ্গে জনশুমারির প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যের বড় ধরনের গরমিল দেখা দিয়েছে। হিসেব মিলছে না মোটামুটিভাবে এক কোটি মানুষের। প্রশ্ন উঠেছে, এসব মানুষ কোথায় গেল? নাকি আগের তথ্যই সঠিক ছিল না?
মঙ্গলবার (২৮ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নিজস্ব কার্যালয়ে জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর ‘ন্যাশনাল রিপোর্ট’ প্রকাশনা বিষয়ক অনুষ্ঠান হয়। এতে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২১-এর প্রকল্প পরিচালক মো. দিলদার হোসেন। বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) নাসিমা বেগম, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন এবং পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মো. কাউসার আহাম্মদ। এতে উন্মুক্ত আলোচনাপর্ব পরিচালনা করেন বিবিএসের যুগ্ম সচিব ড. দিপংকর রায়।
প্রতিবেদনটি সম্পর্কে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বিবিএস একটি বিশাল কাজ করেছে। এটি জাতীয় নীতিনির্ধারণে সহায়তা করবে। আমাদের প্রত্যাশা বিবিএস স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করবে।’ তিনি বলেন, জনশুমারিতে দেখা যাচ্ছে, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানদের সংখ্যা কমেছে। কেন কমেছে, এটি খুঁজে বের করা দরকার।
উল্লেখ্য, দেশে এটিই প্রথমবারের মতো ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত জনশুমারি ও গৃহগণনা কার্যক্রম। জনশুমারিটি ২০২২ সালের ১৫ থেকে ২১ জুনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে প্রাথমিক প্রতিবেদন দেয় সংস্থাটি। পরে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যাচাই-বাছাই করে আরও একটি প্রতিবেদন দেয় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)।
‘অনেক মানুষ দেশে ফিরে এসেছিল’
অনাবাসীদের সংখ্যা প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক মো. দিলদার হোসেন জানান, দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদেশে থাকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ। সেখানকার ২০ লাখ ৫১ হাজার ৯৫২ জন প্রবাসে থাকে। আর সবচেয়ে কম প্রবাসে থাকে রংপুর বিভাগের মানুষ। বিদেশে থাকেন সেখানকার ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৩১ জন। তা ছাড়া বরিশালের ১ লাখ ৫১ হাজার ৫২৮ জন, ঢাকার ১৪ লাখ ৩১ হাজার ১৩১ জন, খুলনার ৩ লাখ ৬ হাজার ৭০০ জন, ময়মনসিংহের ১ লাখ ৫৪ হাজার ২২৭ জন, রাজশাহীর ২ লাখ ৬৯ হাজার ২০৪ জন এবং সিলেটের ৫ লাখ ৭৩ হাজার ১৮৫ জন অনাবাসী।
দেশের বিভিন্ন তথ্য বলছে, দেড় কোটি মানুষ প্রবাসে থাকে অথচ জনশুমারিতে এটি ৫০ লাখ কেন উল্লেখ করা হচ্ছে?Ñ এ প্রশ্ন করা হলে ড. দিপংকর রায় বলেন, ‘এ সময় অনেক মানুষ দেশে ফিরে এসেছিল। তা ছাড়া আমরা এই সংখ্যাই পেয়েছি। এর চেয়ে সঠিক তথ্য আমাদের কাছে নেই।’ সাংবাদিকরা পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে জানতে চান, ‘আমরা তাহলে প্রবাসীর সংখ্যা সম্পর্কে কী লিখব?’ পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান ইঙ্গিতে ড. দিপংকর রায়কে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে বলেন। এ সময় দিপংকর রায় বলেন, ‘আমরা এই সংখ্যাই পেয়েছি।’
এ ব্যাপারে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশিক্ষণ) আ স ম আশরাফুল ইসলাম ও বহির্গমন শাখার পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভূঁইয়াকে মোবাইল করলে তাদের পাওয়া যায়নি।
৪০ বছরে শহরাঞ্চলে জনসংখ্যা বেড়েছে ৩ কোটি ৯৬ লাখ
প্রতিবেদনে জানানো হয়, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১। গত জুলাইয়ে বিবিএস প্রকাশিত পরিসংখ্যানে যা দেখানো হয়েছিল ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬। অর্থাৎ যাচাই-বাছাইয়ে নতুন করে যুক্ত হয়েছে আরও প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ। প্রাথমিক হিসাবে বিভিন্ন কারণে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ মানুষ বাদ পড়েছিল। সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী সেসময় দেশের জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৪৩ লাখ ৫৫ হাজার ২৬৩ জন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে দেশে প্রথম জনশুমারি করা হয়। সেসময় জনসংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল ৭ কোটি ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ৭১। ১৯৮১ সালের শুমারিতে তা বেড়ে ৮ কোটি ৭১ লাখ ১৯ হাজার ৯৬৫ জন হয়। ১৯৯১ সালের শুমারিতে জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১০ কোটি ৬৩ লাখ ১৪ হাজার ৯৯২।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ৪০ বছরে শহরাঞ্চলে জনসংখ্যা বেড়েছে ৩ কোটি ৯৬ লাখ। ১৯৮১ সালে শহরাঞ্চলে বসবাসকারী জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৪১ লাখ। সেখানে ২০২২ সালে জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৫ কোটি ৩৭ লাখ। দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে গ্রামে বসবাস করে ১১ কোটি ৬০ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৪ জন। শহরে ৫ কোটি ৩৭ লাখ ৬৩ হাজার ১০৭ জন। দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে পুরুষ ৮ কোটি ৪১ লাখ ৩৪ হাজার ৩ জন এবং নারী ৮ কোটি ৫৬ লাখ ৮৬ হাজার ৭৮৪ জন। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পুরুষের চেয়ে মহিলার সংখ্যা সামান্য বেশি।
বিভাগভিত্তিক জনসংখ্যা পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে বরিশাল বিভাগের জনসংখ্যা ৯৩ লাখ ২৫ হাজার ৮২০। চট্টগ্রাম বিভাগের জনসংখ্যা ৩ কোটি ৪১ লাখ ৭৮ হাজার ৬১২। ঢাকা বিভাগে রয়েছে ৪ কোটি ৫৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫৮৬ জন। খুলনা বিভাগে বাস করছে ১ কোটি ৭৮ লাখ ১৩ হাজার ২১৮ জন। ময়মনসিংহ বিভাগের জনসংখ্যা ১ কোটি ২৬ লাখ ৩৭ হাজার ৪৭২ জন। রাজশাহী বিভাগে ২ কোটি ৭ লাখ ৯৪ হাজার ১৯ জন। রংপুর বিভাগে ১ কোটি ৮০ লাখ ২০ হাজার ৭১ জন। এ ছাড়া সিলেট বিভাগের জনসংখ্যা ১ কোটি ১৪ লাখ ১৫ হাজার ১১৩ জন।
বস্তিতে মোট জনসংখ্যা ১৭ লাখ ৩৬ হাজার ৩০২। এর মধ্যে পুরুষ ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৪০৩ জন এবং নারী ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৪৪৩ জন। এ ছাড়া ভাসমান জনসংখ্যা ২২ হাজার ১৮৫ জন।
কমেছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান, বেড়েছে সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মানুষ
দেশে ক্রমাগত কমছে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা। স্বাধীন দেশে প্রথম জনশুমারি হয় ১৯৭৪ সালে। তখন এ দেশে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর আরও চারটি শুমারি হয়েছে। সবশেষ ২০১১ সালের শুমারিতে দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ৫ শতাংশ হিন্দু। বর্তমানে ২০২২ সাল শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আগে ছিল শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ। এখন হয়েছে শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। আগে খ্রিস্টান ছিল শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ। আগে অন্যান্য ধর্মের মানুষ ছিল শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ। এখন কমে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
অন্যদিকে এ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সামগ্রিকভাবে সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মানুষ বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনসংখ্যা বেড়েছে। ১৯৮১ সালে এদের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৮২৮। ৪১ বছর বছর পর অর্থাৎ ২০২২ সালে তা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৮ জনে।
অন্যদিকে মুসলিম জনসংখ্যাও বেড়েছে দেশে। ২০১১ সালে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৯০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে
দেশে পুরুষের চেয়ে নারী বেশি
দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার। দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে পুরুষ ৮ কোটি ৪১ লাখ ৩৪ হাজার ৩ জন এবং নারী ৮ কোটি ৫৬ লাখ ৮৬ হাজার ৭৮৪ জন। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পুরুষের চেয়ে এখন নারীর সংখ্যা কম হলেও বেড়েছে।
আলোচকরা যা বললেন
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, ‘চূড়ান্ত সংখ্যা নিয়ে কিছু প্রশ্ন আসবেই। ঢাকা সিটি করপোরেশন হোল্ডিংয়ের খাতা দেখে গণনা করে তাদের জনসংখ্যা কত। কিন্তু আমরা বাইরের লোকদেরও চিন্তা করি। এ সংখ্যা নিয়ে আরও গভীরে গিয়ে দেখতে হবে।’
এমএ মান্নান বলেন, ‘এই শুমারিতে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিতে এক বছর তিন মাস লেগেছে। অথচ প্রথম সেন্সাসে সময় লেগেছিল তিন বছর। একটি শুমারিতে তো পাঁচ বছরই লেগেছিল।’ তিনি বলেন, ‘সরকারপ্রধান অতিরিক্ত খরচ বর্জন করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। কাজ যত কম খরচে করা যায় সে কথাই বলেছেন। আমরা তাই করেছি।’ তিনি বলেন, ‘বিবিএসের আরও স্বাধীনতা দরকার। সরকারপ্রধান আমার কাজে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দিয়েছেন। আমি কোনো কাজে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা করিনি।’
নাসিমা বেগম বলেন, ‘সরকারিভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে অন্যদের তথ্য ব্যবহার কমবে। সবার কাছে তথ্য থাকলে টুইস্ট কম হয়। তথ্য-উপাত্তের ক্ষুধা অনেক। সে অনুযায়ী তাদের জোগানও দিতে পারে।’
ড. শাহনাজ আরেফিন বলেন, ‘এসব তথ্য-উপাত্ত জাতীয় উন্নয়নে সহযোগিতা করবে। এই শুমারিতে সবার প্রত্যাশা ছিল সর্বোচ্চ ভালো করার। আমরা যতটুকু সঠিকভাবে আনতে চেয়েছিলাম, তা করতে পেরেছি। আমাদের ৬টি উইং দিয়ে কাজ হবে না। আরও বাজেট ও কার্যক্রম বাড়ানো দরকার।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সব ডেটা আনতে পারি না। তা ছাড়া সব ডেটা এককভাবে আনাও যায় না।’
১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু ‘আদমশুমারি’ শব্দটি উল্লেখ করে বলে জানান ড. মো. কাউসার আহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘কেন জনসংখ্যা কমল বা বাড়বে, সেই জবাব বিবিএস দেবে না। বরং এ উত্তর আসবে গবেষকদের কাছ থেকে। আমাদের নারীদের ৫০ শতাংশের কাজ নেই। তাদের কীভাবে কাজ দেওয়া যায়Ñ এ প্রশ্নের উত্তরও মিলবে তাদের কাছ থেকে।’ কাউসার আহাম্মদ বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডেটাতে ভিন্নতা দেখা যায়। এসব কীভাবে সমন্বয় করা যায়, সে উদ্যোগ নিতে হবে।’