আজ মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত খসড়ার প্রস্তাব উঠছে
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৩ ০০:৩৫ এএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৩ ১১:০৯ এএম
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ছবি : সংগৃহীত
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষার মাধ্যমে মানুষের মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখা হবে। তাই সংশ্লিষ্ট আইনটিকে করা হবে নাগরিকবান্ধব। এ লক্ষ্যে ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৩’-এর চূড়ান্ত খসড়া করেছে সরকার। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ থেকে খসড়াটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। আজ সোমবার তেজগাঁয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে পারে। এটি অনুমোদন পেলে পরবর্তী দ্বাদশ জাতীয় সংসদে পাসের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
তবে এ আইন প্রণয়নের শুরুতেই মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব হওয়ার আশঙ্কায় এটির কয়েকটি ধারা সম্পর্কে আপত্তি জানিয়ে আসছে জাতিসংঘসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা। এ আপত্তি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খসড়া আইনটি সম্পর্কে মতামত নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় সেসব মন্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়। মতামতের ভিত্তিতে এরপর আইনটি শিথিলের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ফৌজদারি অপরাধ পুরোপুরি বাদ দিয়ে এতে সাজা হিসেবে শুধু রাখা হয় জরিমানা।
প্রসঙ্গত, ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৩’-এর খসড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর মতামত প্রদানসংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি আইনটির খসড়া চূড়ান্ত করেছে। খসড়ায় বলা হয়- রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, সরকারি-বেসরকারি সব শিল্প-কারখানার প্রক্রিয়া ও উদ্ভাবনী তথ্য, ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত দেশীয় প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির গোপনীয় তথ্যের সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। উপাত্ত সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, ব্যবহার বা পুনর্ব্যবহার, হস্তান্তর, প্রকাশ, বিনষ্টকরণ ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিধান করার আবশ্যকতা এবং উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ-সংক্রান্ত কার্যাবলি তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণের জন্য বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা স্থাপন করার প্রয়োজনীয়তার আলোকে এ-সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ থেকে ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৩’-এর একটি খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়েছে, আইনটি প্রণীত হলে উপাত্ত সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ বা ধারণ, অভিযোজন, পরিবর্তন, প্রত্যাবর্তনসহ অন্যান্য বিষয়ের নিশ্চয়তা প্রদানের মাধ্যমে এটি দেশের ডিজিটাল সেক্টরের উন্নয়নের পাশাপাশি স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন’-এর খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু করা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে সভা, কর্মশালা, একাধিকবার ওয়েবসাইটে প্রদর্শনের মাধ্যমে সর্বসাধারণের মতামত নিয়ে, বিভিন্ন অংশীজন, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সিভিল সোসাইটির সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তাদের অভিমত ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে এবং সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খসড়াটি সংশোধন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি-বিষয়ক উপদেষ্টা প্রস্তাবিত আইনের খসড়া পর্যালোচনা করে পরামর্শ দিয়েছেন। ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৩’-এর খসড়া পরিমার্জন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ’ থেকেও প্রমিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অংশীজন মতবিনিময়ের মাধ্যমেও আইনটির খসড়া পুনরায় পরিমার্জন করা হয়েছে।
আইনটির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
খসড়া ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৩’-এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছেÑ উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ-সংক্রান্ত কার্যাবলি তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণের জন্য বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা স্থাপন নিশ্চিত করা। জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণা এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে উপাত্তের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কোনো ব্যক্তির উপাত্ত সুরক্ষা ও এর প্রক্রিয়াকরণ-সংক্রান্ত কার্যাদি নিয়ন্ত্রণ ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান করা। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উপাত্ত সুরক্ষার নীতিগুলো অনুসরণ করে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে মুক্ত বাণিজ্যের প্রসার ও বিস্তৃতি ঘটানোর ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উপাত্তের ব্যবহার নিশ্চিত করা।
‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০১৩’-এর খসড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামত প্রদানসংক্রান্ত কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ভারতের প্রণয়ন করা একই ধরনের আইনটিকে বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশ একই অঞ্চলভুক্ত দেশ এবং আইনগুলো অনেক ক্ষেত্রে কাছাকাছি হওয়ায় ভারতের আইনটিকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা উচিত।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
এ প্রসঙ্গে গত ২০ সেপ্টেম্বর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মন্তব্য করেন যে আইনটির মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ না করে সুরক্ষা নিশ্চিতে এটিকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আইনটিতে ব্যক্তিগত তথ্যের সংজ্ঞা পরিষ্কার ও পর্যাপ্ত নয়। এ ছাড়া এ আইনের অধীন যে বাংলাদেশ উপাত্ত সুরক্ষা বোর্ড গঠিত হবে, তা সরকারের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। সেখানে সরকারই ব্যবহারকারী এবং বিচারকারীও হবে। যা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করবে। এই কর্তৃপক্ষ হতে হবে সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালক আবু সাঈদ মো. কামরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বিভিন্ন মহলের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এ আইনের খসড়া করা হয়েছে। আইনটিকে নাগরিকবান্ধব করা হয়েছে। নামের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ভারত সরকার গত আগস্ট মাসে নতুন করে ‘ডিজিটাল পারসোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট, ২০২৩’ নামে আইন প্রণয়ন করেছে। এই প্রস্তাবিত বিলটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।