প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৩ ২০:১৯ পিএম
আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৩ ২২:১৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
নদী রক্ষা আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশের নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা অনুসন্ধান না করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন তাড়াহুড়ো করে অসম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করেছে। কমিশনের ‘বাংলাদেশের নদ-নদীর সংজ্ঞা ও সংখ্যা’ বইয়ে নদ-নদীর সংখ্যা কমানো হয়েছে। বইটিতে ৫ শতাধিক ভুল তথ্য বা তথ্যের অসঙ্গতি রয়েছে। সম্প্রতি ৩৭ হাজার ৩৯৬ জন নদী দখলদারের তথ্য মুছে ফেলেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। শিগগির বইটি প্রত্যাহারসহ কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা নদী দখলদারদের নাম ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
শুক্রবার (১০ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে নোঙর বাংলাদেশ আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা অভিযোগ করেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন থেকে নদী দখলদারের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে এবং নদীর সংখ্যা কমিয়ে দেখানো হয়েছে। নোঙর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সুমন শামসেরের সঞ্চালনা ও সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন, ইনিশিয়েটিভ ফর পিসের (আইএফপি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শফিকুর রহমান।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বইটির শুরুতেই সমস্যা রয়েছে। এতে নদীর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা অসম্পূর্ণ। বইটিতে ৫ শতাধিক ভুল তথ্য বা তথ্যের অসঙ্গতি রয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু ভুল রয়েছে অত্যন্ত গুরুতর। যেমন বাংলাদেশে পদ্মার একটি অংশ যে গঙ্গা নামেও প্রবাহিত তার উল্লেখ নেই। দীর্ঘ নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ইছামতীর নাম। এই নদীর দৈর্ঘ্য ৪৬৩ কিলোমিটার। কিন্তু বাস্তবে দেশের একক বৃহত্তম নদী হলো করতোয়া। বাংলাদেশ অংশ করতোয়ার দৈর্ঘ্য ৪৬৩ কিলোমিটার। এ ছাড়া ভারতীয় অংশেও করতোয়ার ৮০ কিলোমিটার রয়েছে। বইটিতে ২৭টি বদ্ধ জলাশয়কে নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলোর দৈর্ঘ্য উল্লেখ করা হয়েছে একর হিসাবে পরিমাপ করে।
প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, নদী ও পানিবিশেষজ্ঞ, গবেষক, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের তথ্য, প্রতিবেদন, প্রকাশিত বই ও সরেজমিন অনুসন্ধানের তথ্য থেকে দেখা গেছে, নদ-নদীর সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। এর মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে ১ হাজার ৯০৮টি নদ-নদীর নাম পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পার্বত্য এলাকার অনেক ঝরা, ছড়া, বরেন্দ্র অঞ্চলের খাঁড়ি রয়েছে, যেগুলো বৈশিষ্ট্য অনুসারে পূর্ণাঙ্গ নদী। নদী রক্ষা কমিশনের বইতে সুন্দরবনের ১৭৯টি নদ-নদীর নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে, কিন্তু সুন্দরবনে নদ-নদী আছে ২২৭টি। বইটিতে চট্টগ্রাম বিভাগের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার তথ্য নেওয়া হয়নি। এই বিভাগের তালিকাভুক্ত নদ-নদীর বাইরেও ৩৪৫টি নদ-নদীর নাম পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বইটির আরেকটি বড় ব্যত্যয়, এতে উল্লিখিত ১ হাজার পাঁচটি নদ-নদীর মধ্যে ৫৫১টির উৎস ও মোহনার উল্লেখ করা হয়নি। যেকোনো নদ-নদীর বর্ণনায় তার উৎস ও মোহনা উল্লেখ করা অত্যাবশ্যক।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা আন্দোলন সংগঠক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করেন, উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে নদী ও পরিবেশ রক্ষা করতে বারবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। তিনি বলেন, বর্তমান নদী রক্ষা কমিশনের কোনো কিছু রক্ষা করার বা দখল ঠেকানোর ক্ষমতা নেই। লোকবল, আইনি সুরক্ষা কিছুই নেই। সর্বশেষ নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দখলদারদের নাম মুছে দিয়েছেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে তাকে কি দখলদারদের নাম মুছে দেওয়ার স্বার্থেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল? আবার দেখা গেল মেঘনা নদী দখলে মন্ত্রীর নাম নেওয়ার পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো। নদীর সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকার পরেও তাকে কী কারণে নিয়োগ দেওয়া হলো, ওয়েবসাইট থেকে নদী দখলদারদের নাম মুছে দেওয়া হলো বা তাকে কেন সরিয়ে দেওয়া হলো—এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর আমরা পাইনি। আবার বালু উত্তোলনের কারণে নদী শেষ হয়ে যাচ্ছে, যার সঙ্গে মন্ত্রী জড়িত এমন অভিযোগ যে তিনি করলেন, এর কোনো ব্যাখ্যা আমরা ওই মন্ত্রী বা সরকারের তরফ থেকে পাইনি। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জনগণ জানতে চায়।
সেমিনারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নোঙর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সুমন শামস বলেন, দখলদারদের তালিকার ওপর যে বইটি প্রকাশ করা হয়েছিল সেটিকে ভুলে ভরা তালিকা বলে মুছে ফেলা হয়েছিল। পরে নদী রক্ষা কমিশনের সদ্যসাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী ভুলে ভরা এই তালিকা সংশোধন করে আপলোড করার কথা বলেছিলেন। তিনি দায়িত্ব নিয়ে ৪৮টি নদীর সমীক্ষা করলেন। সেই প্রকল্পের ফল আমরা এখনও জানতে পারিনি। সার্ভার থেকে সেই তালিকা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তিন বছর মেয়াদি ৩০ কোটি টাকার প্রকল্প যা পরবর্তী সময়ে পাঁচ বছরে যায় সেই প্রকল্পের ফল আমরা জানতে পারিনি। এখন সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দখলদারদের তালিকা যেটি পরে জরিপ করে দেখা গেছে, যা ৫০ থেকে ৬০ হাজারে পৌঁছে গেছে, সেই তালিকা প্রকাশ করা হোক।
রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বলেন, প্রকল্প থেকে দখলদারদের যে তালিকা রয়েছে তা দ্রুত যাচাই করে বর্তমান কমিশন প্রকাশ করুক এবং ভুলে ভরা নদীর সংখ্যা নিয়ে যে বইটি আছে তা আপাতত স্থগিত করা হোক।