কাজী হাফিজ
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:২৩ পিএম
আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:২৪ পিএম
আনসার বাহিনীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দিয়ে জাতীয় সংসদে ‘আনসার ব্যাটালিয়ন বিল-২০২৩’ উত্থাপন নিয়ে সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে সাধারণ নির্বাচনের আগে আনসার বাহিনীকে এ ধরনের ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগ অনেকেই ইতিবাচক মনে করছেন না। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের এমপি বুধবার (২৫ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘নির্বাচনের আগে আনসার বাহিনীকে পুলিশি ক্ষমতা দেওয়া দুরভিসন্ধিমূলক। সাধারণ মানুষের ধারণা, নির্বাচনে সরকারের প্রভাব আরও বাড়াতেই আনসার ব্যাটালিয়ন বিল-২০২৩ সংসদে তোলা হয়েছে।’
বিশেষজ্ঞ মত হচ্ছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আনসার বাহিনী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অংশ। নির্বাচনী অপরাধের ক্ষেত্রে আনসার বাহিনীর সদস্যরাও একজন পুলিশ কর্মকর্তার মতোই বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রাখেন। সংসদ নির্বাচনের আইন ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২’-এর অনুচ্ছেদ ২ (১১ ক ক) এবং ৮৭-তে এ ক্ষমতা আনসার বাহিনীকে দেওয়া আছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার আব্দুল মোবারক বুধবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২-এর ২ (১১ ক ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অর্থ হচ্ছেÑ পুলিশ বাহিনী, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, আনসার বাহিনী, ব্যাটালিয়ন আনসার, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং কোস্ট গার্ড বাহিনী। আর এই আইনের ৮৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনকালে ভোটগ্রহণের দিন ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে নির্বাচনী অপরাধের জন্য শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনরত কোনো ব্যক্তি ছাড়া যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার মতোই বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করতে পারবে।
আব্দুল মোবারক আরও বলেন, ‘আনসার বাহিনীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া নিয়ে যে বিতর্ক হচ্ছে তা অহেতুক। দণ্ডবিধির ১০০ এবং এর পরবর্তী কয়েকটি ধারা অনুসারে একজন সাধারণ নাগরিকের মতো আনসার বাহিনীর সদস্যদেরও আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। তারা আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার্থে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কাউকে আটক করার অধিকার রাখেন।’
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব বেগম জেসমিন টুলি জানান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এক সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগগুলো বা সশস্ত্র বাহিনীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল এ সংজ্ঞা থেকে প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগগুলো বাদ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ব্যবস্থার যে সংস্কার প্রস্তাব রেখেছিল, তাতেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনপরবর্তী সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচনী আইন সংস্কার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে আওয়ামী লীগ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা সম্পর্কে তাদের বিরোধিতা থেকে সরে আসে। এ সময় র্যাবকেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই নির্বাচনে সেনাবাহিনী ২০০১ সালের মতো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অংশ হিসেবেই দায়িত্ব পালন করে।
সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই নয়, অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনগুলোতেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে নবম সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের সময় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা থেকে প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগগুলো বাদ দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনগুলোতেও অভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়। এ অবস্থায় সশস্ত্র বাহিনী ছাড়া আনসারসহ অন্য সব বাহিনীই বর্তমানে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশের মতোই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অংশ।