ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৩ ১২:১৭ পিএম
আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:২৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, মাছ উৎপাদনে বিশ্বের স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৩’ প্রতিবেদনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় এবং বদ্ধ জলাশয়ে উৎপাদনে পঞ্চম। অথচ দেশে মুক্ত বা বদ্ধ কোনো জলাশয়েরই মাছের দাম ৩০০ টাকার নিচে নেই।
‘গরিবের মাছ’খ্যাত পাঙাশও এখন কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২২০ টাকা। তবে ওজনে দেড় বা দুই কেজি হলে তা ২৫০ থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এমনকি গ্রামের বাজারেও কেজিপ্রতি ১৮০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে পাঙাশ।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর রায়েরবাজার ও হাতিরপুলে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অন্যান্য মাছের তুলনায় অনেকটা কম দামেই মিলছে পাঙাশ। তবে বিক্রি হচ্ছিল ২০০ থেকে ২২০ টাকায়।
রায়েরবাজারে মাছ কিনতে আসা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সোহাগ হাসান বলেন, নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এখন অনেক মাছ কেনা হয় না। পাঙাশ, তেলাপিয়া ও মলা মাছ দিয়েই চলছে জীবন। অনেকক্ষণ দরদাম করে এক কেজি ওজনের একটি পাঙাশ ২০০ টাকায় কিনেছেন তিনি।
একই বাজারে কথা হয় মাছ কিনতে আসা রমিজা খাতুন, ফাতেমা খাতুন ও হোসনে আরার সঙ্গে। বাসাবাড়িতে কাজ করেন তারা। তারা বলেন, এক বছর আগেও ১০০ থেকে ১৩০ টাকায় কিনেছেন পাঙাশ মাছ। রমিজা খাতুন বলেন, ‘ছোট পোলা পাঙাশ পছন্দ করে। অনেকদিন ধইরাই মাছ খাওনের বায়না ধরছে। তাই কেজিপ্রতি ২২০ টেকা দিয়া দেড় কেজির একটা মাছ কিনছি। জানি এ টেকা দিয়া আরও কিছু বাজার-সদাই কিনতে পারতাম।’
ফাতেমা খাতুন বলেন, ‘এহন এমন দিন আইল, ৩০০ টেকার নিচে কোনো মাছই পাওন যায় না।’
হাতিরপুল বাজারের মাছ বিক্রেতা মিজানুর রহমান জানান, পাঙাশ ছাড়া অন্যান্য মাছ যেমন চাষের শিং ৩৫০ থেকে ৪০০ ও বিলের শিং ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। পাবদা ৫০০ টাকা, রুই ৩৫০ থেকে ৪৮০, মলা ৪০০, তেলাপিয়া ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা। তবে ছোট তেলাপিয়া ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
মহাখালীর বাজারে মাছ ব্যবসায়ী বিমল চন্দ্র বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে মাছের ব্যবসা করছেন তিনি। আগে ঝড়-তুফান হলে ঢাকায় গাড়ি আসতে পারত না। তাতে মাছের দাম বাড়ত। কিন্তু এখন সেই অবস্থা নেই। শত দুর্যোগেও গাড়ি আসতে পারে। কিন্তু মাছের দাম কমে না।
বিমল চন্দ্র জানান, বাজারটিতে তেলাপিয়া কেজিপ্রতি ২২০ টাকা, পাঙাশ ২০০, রুই ৩৩০ থেকে ৩৫০, কই ১৬৫ থেকে ১৮০, শিং ও পাবদা ৪০০, চাপিলা ৩৮০ এবং বাটা মাছ ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট ৪৩ লাখ টন মাছ উৎপাদন হয়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে যা ছিল ২৯ লাখ টন। এই সময়ে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ১৪ লাখ টন। আর বাজারে বিক্রি হওয়া মাছের ৫৬ শতাংশই এখন চাষের।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা সমীক্ষা-২০২২ অনুযায়ী, দেশে বছরে মাছের চাহিদা ৪৬ দশমিক ৬৪ লাখ টন। বছরে জনপ্রতি মাছের চাহিদা ২৩ দশমিক ৭২ কেজি। আর গ্রহণের পরিমাণ ২৫ কেজি।
পাঙাশের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিক্রেতারা বলছেন, এখন মাছের খাবারের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকের বেতন, পরিবহন, সংরক্ষণসহ সার্বিক ব্যয় আগের তুলনায় বেড়েছে।
অন্যান্য জেলার তুলনায় ময়মনসিংহের ত্রিশালে মাছ চাষ বেশি হয়ে থাকে, বিশেষ করে পাঙাশ। ত্রিশালের মাছচাষি আব্দুল কাদের বলেন, এখন পাঁচ হাজার পাঙাশ উৎপাদনে শুধু খাবারের জন্যই ৫ লাখ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। অন্যান্য খরচ তো আছেই। এ কারণে দামও বাড়ছে।
মৎস্য ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এ দুর্দিনে দেশে সাধারণ মানুষের মাছের চাহিদা মেটাচ্ছে পাঙাশ, তেলাপিয়া ও কার্পজাতীয় কম দামের চাষের মাছ। তবে একদিকে উৎপাদন, পরিবহন ও সংরক্ষণে বাড়তি খরচ বাজারে মাছের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে বিপণন ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণেও বাড়ছে মাছের দাম। এ ছাড়া চাষ করা মাছের খাদ্যের ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশই আমদানি করতে হচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং এর আগে করোনা পরিস্থিতিতে খাদ্য আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এসবের প্রভাব পড়েছে মাছের বাজারে।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) সহকারী অধ্যাপক মো. মাসুদ রানা বলেন, যে পাঙাশ ২২০ টাকা কেজিতে কিনছি, সেটি চাষি বিক্রি করছে মাত্র ১২০-১৩০ টাকায়। অর্থাৎ বাকি ৯০ বা ১০০ টাকাই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। এক কেজি পাঙাশ উৎপাদনে দেড় কেজি খাবার প্রয়োজন হয়। আর এর দাম ৯০ টাকা। তার সঙ্গে যুক্ত হয় অন্যান্য খরচ। সবমিলে চাষির বেশি একটা মুনাফা থাকে না। আবার এক মণ মাছ বিক্রি করতে গেলে তাকে ৪২ কেজি দিতে হয়, সে হিসাবে মাছের দাম পড়ে মাত্র ১১০ থেকে ১২০ টাকা। অথচ ক্রেতাদের সেই মাছ কিনতে হয় ২২০ টাকা করে।
মাসুদ রানা আরও বলেন, চাষি এক বছর মাছ পালন করে যে টাকা পায় না, কয়েকটি হাত বদল করে আড়তদার ও পাইকাররা সেই পরিমাণ টাকা নিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে কীভাবে সরাসরি বাজারে ক্রেতাদের হাতে মাছ দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। তবেই মাছের দাম কমানো ও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. রোকনুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সরকার মাছের খাবার আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে দাম কমাতে সহায়তা করতে পারে। প্রয়োজনে ভর্তুকিও দিতে পারে। এতে মাছের উৎপাদন ব্যয় কমবে। ভোক্তা কম দামে মাছ খেতে পারবে।