বিশ্ব খাদ্য দিবস আজ
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৩ ১০:৩৩ এএম
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৩ ১৬:৩৬ পিএম
‘পানি খাদ্য, পানিই জীবন/কেউ থাকবে না পিছিয়ে’Ñ এটি হচ্ছে এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য। আজ সোমবার বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে এ দিবস। কৃষি মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) উদ্যোগে বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
দিবসটি উপলক্ষে আজ রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মিলনায়তনে আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। বিশেষ অতিথি থাকবেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। আলোচনাসভা শেষে বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি কারিগরি সেশন অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে বিশ্ব খাদ্য দিবসকে সামনে রেখে গতকাল কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিগত ১৫ বছরে দেশে খাদ্য উৎপাদনে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার দেশের কৃষির উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে যুগোপযোগী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। কৃষি গবেষণা-সম্প্রসারণে কার্যকর সংযোগ স্থাপন, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ কৃষকের নিকট সহজলভ্য করা এবং কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, ফসলের নতুন নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। ফলে কৃষিব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়। আধুনিক, লাভজনক ও যান্ত্রিক কৃষিব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। উচ্চফলনশীল ও প্রতিকূলতাসহিষ্ণু নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন ও প্রবর্তনের ফলে খাদ্যশস্য, সবজি ও ফল উৎপাদনে বৈচিত্র্য এসেছে এবং ফসল উৎপাদনে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে যেখানে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ২৮ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন, সেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ফসলের উৎপাদনেও ধারাবাহিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে চালের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ১৩ লাখ টন, যা ২০২২-২৩ সালে ৪ কোটি টনেরও বেশিতে উন্নীত হয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে গমের উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ৪৯ হাজার টন, ২০২২-২৩ সালে উৎপাদন হয়েছে ১১ লাখ ৭০ হাজার টন।
এ ছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত সার, বিদ্যুৎ ইত্যাদি খাতে মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল মাত্র ৫ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভর্তুকি বাবদ ২৫ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
প্রসঙ্গ প্রতিপাদ্য
এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের যে প্রতিপাদ্য বেছে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে এফএওর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, বিশ্বের মাত্র ২.৫ ভাগ পানি পানীয়, কৃষি এবং শিল্পে ব্যবহারের উপযুক্ত। পানি হলো মানুষ, অর্থনীতি ও প্রকৃতির চালিকাশক্তি এবং খাদ্যের ভিত্তি। কৃষিতে মিঠাপানির ৭২ ভাগ ব্যবহার হওয়ায় তা পানযোগ্য পানির চাহিদায় প্রভাব ফেলে। এতে আরও বলা হয়, বিশ্বে প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ জলজ খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পানি দূষণ, বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয়, সংরক্ষণহীনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব পড়ছে জলজ খাদ্যের টেকসই ব্যবস্থাপনায়।
এফএওর প্রতিবেদন : বিশ্বব্যাপী বেড়েছে দুর্যোগ, বেড়েছে কৃষি ও পশুপালনে ক্ষতি
পাঁচ দশকের ব্যবধানে বিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগ তিনগুণ বেড়ে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও গবাদিপশু পালন খাত। যেখানে ১৯৭০-এর দশকে প্রতিবছর ১০০টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটত, সেখানে গত ২০ বছরে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪০০।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য ইমপেক্ট অব ডিজাস্টার অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি’ শীর্ষক ফ্ল্যাগশিপ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য দিবসকে সামনে রেখে কৃষি ও পশুসম্পদ নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনটি গত ১৩ অক্টোবর প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে গত ৩০ বছরে বিশ্বে প্রায় ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের ফসল এবং গবাদিপশুর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে হিসাবে বছরে গড় ক্ষতির পরিমাণ ১২৩ বিলিয়ন ডলার। এসব ক্ষতি বৈশ্বিক কৃষির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশের সমান।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলো। এসব দেশের মোট কৃষি জিডিপির ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত তিন দশকে দানাদার শস্যে ক্ষতির পরিমাণ প্রতিবছর গড়ে ৬৯ মিলিয়ন টন। এই ক্ষতি ২০২১ সালে ফ্রান্সের সমগ্র শস্য উৎপাদনের সমান ছিল। আর ফল, শাকসবজি ও চিনিতে গড় ক্ষতি ৪০ মিলিয়ন টন। এসব ক্ষতির পরিমাণ জাপান ও ভিয়েতনামে ২০২১ সালে উৎপাদিত মোট ফল ও সবজির সমান। তা ছাড়া মাংস, দুগ্ধজাত দ্রব্য ও ডিমে প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয় ১৬ মিলিয়ন টন। এই ক্ষতির পরিমাণ মেক্সিকো ও ভারতে ২০২১ সালে এসব পণ্যের পুরো উত্পাদনের সমান।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় তিনটি পরামর্শও দেওয়া হয়েছে এফএওর প্রতিবেদনে। এক. কৃষির সমস্ত উপখাতের ওপর বিপর্যয়ের প্রভাবের তথ্য ও তথ্যের উন্নতি করতে হবে; দুই. সকল স্তরে নীতি ও কার্যক্রম গ্রহণ করে দুর্যোগঝুঁকি কমাতে হবে; এবং তিন. স্থিতিশীলতার জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
অপরদিকে ডেটা ইন ইমার্জেন্সিস মনিটরিংয়ের (ডিআইইএম) একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারি কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সে সময় বাংলাদেশে চাল ও খাবারের দাম বেড়েছিল ৩৫ শতাংশ। ৯০ শতাংশের বেশি কৃষক কৃষি উপকরণ সংগ্রহ করতে অসুবিধায় পড়েছিল। ধান রোপণের জন্য জনবল ও যন্ত্রপাতি, ফসল কাটা ও মাড়াইয়ের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েছিল।