রাশেদুল হাসান
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৩ ১৭:০৭ পিএম
আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৩ ১৯:৩৩ পিএম
বাজারে যার দাম ৩ হাজার টাকা, ঘুরতে ঘুরতে সরকারি দপ্তরে গিয়ে সেই সিলিং ফ্যানের দাম হয়ে যাচ্ছে ১৩ হাজার। বস্ত্র অধিদপ্তরের নতুন অফিসের সাজসজ্জার জন্য কেনাকাটায় ঘটেছে এমন অনিয়ম। ফ্যানসহ ওই অফিসের আনুষঙ্গিক প্রায় সব পণ্যই কেনা হয়েছে চড়া দামে। অনিয়মের এই চিত্র উঠে এসেছে মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (সিএজি) এক প্রতিবেদনে। তাতে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মাত্র ৯টি কেনাকাটার কাজে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ১১২ কোটি টাকা নয়ছয় করা হয়েছে।
সিএজির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে বস্ত্র অধিদপ্তর কারওয়ান বাজারে তাদের নতুন অফিসের জন্য একেকটি ফ্যান কেনা ও ফিটিং বাবদ খরচ করে ১২ হাজার ৯০০ টাকা। সেই সময় একটি ৫৬ ইঞ্চি সিলিং ফ্যানের বাজারমূল্য ছিল ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। কিন্তু অধিদপ্তর বিআরবি কোম্পানির (লাভলী ব্র্যান্ড) ৩০টি ফ্যান লাগাতে গিয়ে খরচ করেছে ৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। একই সময় ৪ হাজার ৫০০ টাকা দামের প্যানাসনিক ব্র্যান্ডের প্রতিটি টেলিফোন সেট (মডেল-৭৭৩০) কেনা হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ টাকা দরে।
বস্ত্র অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ওই সময় অন্যান্য ইলেকট্রনিক সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও অনিয়ম করেছেন। দেখা গেছে, তারা অফিসের জন্য বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে ৮টি টেলিফোন সেট, ৩টি ইমেজ প্রিন্টার, ৮টি লেজার প্রিন্টার, একটি স্ক্যানার, তিনটি ল্যাপটপ, ১১টি ডেস্কটপ কম্পিউটার, ক্যামেরা, ১১টি ইউপিএসসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনেছেন। যার সর্বোচ্চ বাজারমূল্য আসে ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ৪২৮ টাকা। কিন্তু অধিদপ্তর ব্যয় করে ৩১ লাখ ৬২ হাজার ৪০০ টাকা।
মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের (সিএজি) ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ক্রয়-সংক্রান্ত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্বাভাবিক উচ্চ দরে এসব সরঞ্জাম কেনার বিল পরিশোধ করা হয়েছে ম্যাক্সেল করপোরেশন, ট্রেড জোন ও অ্যানেক্স করপোরেশন নামের তিনটি কোম্পানিকে। এর মাধ্যমে ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৭২ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ওই অর্থবছরে এভাবে ৯টি কেনাকাটা ও প্রকল্পের কাজে মোট ১১২ কোটি টাকা লোপাট করা হয়। বিষয়টি নিরীক্ষা অধিদপ্তর ব্স্ত্র অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানায়। কিন্তু একজনকে বদলি করা ছাড়া কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যব্স্থা নেওয়া হয়নি। ২০২২ সালের ২২ নভেম্বর নিরীক্ষা অধিদপ্তর অভিযোগগুলো পাঠায় সংসদীয় কমিটির কাছে। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, টেলিযোগাযোগ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি কেনাকাটায় শুধু এই তিন কোম্পানি টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেছে। এরাই ঘুরেফিরে সব কাজ পেয়েছে। ওই সময় সংস্থার মহাপরিচালক ছিলেন মোহাম্মদ ইসমাইল। ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ২৮ মে পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
কম্পিউটার, টেলিযোগাযোগ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি ক্রয়ের কাজটি করেছে প্রকৌশলী (সিভিল) নিরঞ্জন কুমার দেবনাথ, সহকারী পরিচালক ফরিদা ইয়াছমিন ও পরিসংখ্যান কর্মকর্তা গিয়াসউদ্দিনসহ ছয় সদস্যের একটি কমিটি। কাজের অনুমোদনপত্রে তৎকালীন উপপরিচালক (প্রশাসক) লায়লা ইয়াফিরের স্বাক্ষর রয়েছে।
নিরঞ্জন কুমার দেবনাথ, ফরিদা ইয়াছমিন ও গিয়াসউদ্দিন এখনও চাকরিতে বহাল রয়েছেন। জানতে চাইলে সাবেক উপপরিচালক লায়লা ইয়াফির ও পরিসংখ্যান কর্মকর্তা গিয়াসউদ্দিন গত ২৫ মার্চ প্রতিবেদককে জানান, নিরঞ্জন কুমার দেবনাথ ছিলেন ওই ক্রয় কমিটির আহ্বায়ক। তিনিই মূল সবকিছু দেখভাল করেছেন। এখানে তাদের মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
নিরঞ্জন কুমার দেবনাথের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষ ছাড়া কারও কাছে জবাবদিহি করতে তিনি বাধ্য নন।
কেনাকাটায় ১১২ কোটি টাকার দুর্নীতি
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বস্ত্র অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইল ৪২টি টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের জন্য মোট ৪৬ আইটেমের ২৪ সেট বই না কিনেই সংশ্লিষ্ট খাত থেকে ২৯ লাখ ৯৮ হাজার ৩৮০ ব্যয়ের হিসাব দেখিয়েছেন। এ টাকা অ্যানেক্স করপোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়। বই কেনার নামে টাকা নেওয়া হয় নারায়ণগঞ্জ টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের বাজেট থেকে। নিরীক্ষা অধিদপ্তর জানায়, ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের বাজেট বরাদ্দ, ব্যয় বিবরণী ও বিল-ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে তারা জানতে পেরেছে ওই অর্থবছরে বইপত্র ও সাময়িকী কেনাই হয়নি। বাস্তবে ইনস্টিটিউটে যাচাইকালে ক্রয়কৃত বইপত্র বা সাময়িকী পাওয়া যায়নি । মালামাল গ্রহণ ও বিতরণ-সংক্রান্ত কোনো প্রমাণও কেউ দেখাতে পারেনি।
এ নিয়ে কয়েকটি টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের প্রধানের সঙ্গে কথা বললে তারা প্রতিদিনের বাংলাদেশ জানান যে, তাদের নামে কেনা হয়েছে এমন কোনো বই বা সাময়িকী তারা পাননি। ঘটনার সময় ফরিদপুর টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন মো. মোয়াজ্জেম। গত ২৪ মার্চ তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কোনো বই ও সাময়িকী পায়নি। পেলে তো তা প্রতিষ্ঠানে থাকত। আমি পাইনি, তবে বই কেনা হয়েছে বলে শুনেছি। পটুয়াখালী ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের সুপারিনটেনডেন্ট এইচ এম নাসির উদ্দিনও জানান, তিনি বস্ত্র অধিদপ্তর থেকে এরকম কোনো বই বা সাময়িকী পাননি।
অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক মো. নূরুজ্জামান জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জ টেক্সাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের তৎকালীন ইনচার্জ মো. ছামিদুল হককে এ অনিয়মে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে পিরোজপুরে বদলি করা হয়েছে।
অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে মেশিনারিজ কেনা হয় বস্ত্র অধিদপ্তরের আওতাধীন শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট গৌরনদী স্থাপন প্রকল্পেও। এ বিষয়ে সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই প্রকল্পের ৫টি মেশিন বাবদ ৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়। সংস্থাটির হিসাবে সেগুলোর প্রকৃত বাজারদর আসে ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বস্ত্র অধিদপ্তরের আওতাধীন ৪টি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্পে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির পরিবর্তে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (পিপিআর) মাধ্যমে প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে ঠিকাদারের কাছ থেকে মেশিনারিজ সংগ্রহ করা হয়। নিরীক্ষা অধিদপ্তর জানায়, পিপিআর মোতাবেক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ না করে এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে অংশগ্রহণ ছাড়াই ঠিকাদারের কাছ থেকে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনে মোট ৯২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, গোপালগঞ্জে শেখ রেহানা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন প্রকল্পেও অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে বিভিন্ন মেশিনারিজ কিনে স্থাপন ও সন্তোষজনক পরিচালন নিশ্চিত করা ছাড়াই ১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
গৌরনদীতে শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্পে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ডিপ্লোমা-ইন-টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের দ্বিতীয় শিফটের ক্লাস পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কর্মচারীকে ১৮ লাখ ৮৫ হাজার ১৬৩ টাকা সম্মানী ভাতা দেওয়া হয়। এ ছাড়া নকল ক্যাশ মেমোর মাধ্যমে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ব্যয় দেখানো হয়েছে।
বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে গত ২৭ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. নূরুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এসব কাজে যারা জড়িত, এদের অনেকে জনপ্রশাসন থেকে প্রেষণে আসা কর্মকর্তা। তাদের বিরুদ্ধে আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারি না, কারণ অধিদপ্তর তাদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ নয়। আমরা মোট তিনজনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখেছি। তাদের বিরুদ্ধে আদালতেও মামলা করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। একজন এরই মধ্যে চাকরি ছেড়ে পালিয়েছে।’
অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই অডিটগুলোর নিষ্পত্তি করা যায়নি। এদের বেশিরভাগ অবসরে। বর্তমানে যারা কর্মরত, তাদের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. ইসমাইল গত ২৭ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ঘটনাগুলো অনেক আগের, এখন কিছু বলতে পারব না। বর্তমানে যারা দায়িত্বে আছেন, তারা এ বিষয়ে জবাব দিতে পারবেন। আর প্রকল্পের কেনাকাটার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটাগুলো হয় একটি কমিটির মাধ্যমে। হেড অব ডিপার্টমেন্ট হিসেবে আমি শুধু অনুমোদন করতাম। অনিয়মের বিষয় যদি থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই আমার চোখে পড়ত। যেহেতু অডিট আপত্তি হয়েছে, তাই বর্তমানে যারা দায়িত্বে আছেন, তারাই জবাব দেবেন।