মামুন-অর-রশিদ
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২২ ০৭:১৭ এএম
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২২ ১৩:৫১ পিএম
লোডশেডিংয়ের কারণে মোমবাতি ও মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষক। ছবিটি সম্প্রতি ওয়ারীর যোগীনগরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তোলা। ছবি : ইন্দ্রজিৎ কুমার ঘোষ
চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের হিসাব না মেলায় কমছে না লোডশেডিং। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি বলছে, তারা চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছে না। ফলে লোডশেডিং করা ছাড়া বিকল্প নেই। দিনের বেলায় অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট আর সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
এখন দিনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াট আর সন্ধ্যার পর তা ২ হাজার মেগাওয়াট বাড়িয়ে ১২ হাজার করা হচ্ছে। সরকার আপাতত লোডশেডিং বাড়ালেও বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে চাইছে না। ফলে তাপমাত্রা না কমলে লোডশেডিং পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, লোডশেডিংয়ের প্রধান কারণ জ্বালানি সংকট। বিদেশ থেকে পেট্রোবাংলা চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস আমদানি করতে না পারায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এর বাইরে সরকার ব্যয় কমাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সীমিত করেছে। ফলে চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটে সারা বিশ্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত করেছে। আমাদের দেশেও এর বিকল্প কিছু করা হয়নি। দেশের অন্তত অর্ধেক জ্বালানির চাহিদা মেটানো হয় আমদানি করে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটে আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করতে না পারায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। আমরা বিদেশ থেকে গ্যাস আনতে না পারায় এ সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া শিল্পে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বদলে শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের জীবন এখন নাকাল। গরম কিছুটা কমে এলেও অফিস-আদালত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। তবে আপাতত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে বলছে সরকার। এর কোনো বিকল্প সরকারের হাতে নেই।
ঢাকায় লোডশেডিং কত
ঢাকার দুই বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি সূত্র বলছে, রাজধানীতে প্রতিদিন দিনের বেলা ৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা ইলেকট্র্রিক সাপ্লাই কোম্পানি ডেসকোর লোডশেডিং হচ্ছে দিনের বেলা ১৩০ মেগাওয়াট আর রাতে ২০ থেকে ৩০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) দিনের বেলা লোডশেডিং করছে ৪০০ মেগাওয়াট। সন্ধ্যার পর তা কমে হচ্ছে ৩০০ মেগাওয়াটের মতো।
রাজধানীর গুলশান-বনানী-বারিধারার মতো অভিজাত এলাকাসহ উত্তর ঢাকার পুরোটাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ডেসকো। তাদের রোজকার চাহিদা ৯৫০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে দক্ষিণ ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জের একাংশে বিদ্যুৎ বিতরণ করে ডিপিডিসি, যাদের সর্বোচ্চ চাহিদা ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট।
তবে ঢাকার উপজেলা সাভার, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ ও দোহারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এ সমিতিতে আরও ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং রয়েছে। সব মিলিয়ে ঢাকা জেলার লোডশেডিং ১ হাজার মেগাওয়াট।
আরইবির ৯ জোনের কোনটায় কত লোডশেডিং
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) সূত্র বলছে, তারা দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ বিতরণ করে। এর মধ্যে বরিশাল এলাকায় বিদ্যুতের অবস্থা সবচেয়ে ভালো। তবে দেশের সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ঢাকা অঞ্চলের।
ঢাকার দুই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ২ হাজার ৩৬৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ১ হাজার ৮৬৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ৪৪৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। একই দিন চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৩৫২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ মিলেছে ২৪১ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করতে হয়েছে ১১১ মেগাওয়াট। খুলনায় ১ হাজার ৭২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৯২৮ আর লোডশেডিং ছিল ১৪৪ মেগাওয়াট। রাজশাহীতে ৮৭৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৭৮৪ মেগাওয়াট, লোডশেডিং হয়েছে ৯২ মেগাওয়াট। কুমিল্লায় ৯৬৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৭৩৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে, লোডশেডিং করতে হয়েছে ২৩১ মেগাওয়াট। ময়মনসিংহে ৯৪৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৬৯০ মেগাওয়াট সরবরাহ করায় লোডশেডিং হয়েছে ২৫৯ মেগাওয়াট। সিলেটে ৩৯১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ২৮৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ লোডশেডিং ছিল ১০৭ মেগাওয়াট। রংপুরে ৫২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৪৬০ মেগাওয়াট অর্থাৎ লোডশেডিং করতে হয়েছে ৫৪ মেগাওয়াট। বরিশালে ২৯৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ২৯০ মেগাওয়াট। সবচেয়ে কম লোডশেডিং করতে হয়েছে এখানে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকট
দেশের ১৫৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭৩টি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র রয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি এই গ্যাসচালিত কেন্দ্র থেকে আসে। পেট্রোবাংলার হিসাব বলছে, দৈনিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ২ হাজার ২৫২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার সরবরাহ করা হয়েছে ৯৭২ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় ১ হাজার ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট কম গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। গ্যাসচালিত কেন্দ্রের মধ্যে ২৪টিতে গতকাল কোনো গ্যাসই সরবরাহ করা হয়নি। এতে দেশের গ্যাসচালিত কেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। পিডিবি বলছে, দেশের ৩ হাজার ৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি সংকটে বন্ধ রয়েছে।
শিডিউল ভেঙে লোডশেডিং
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিকে সরকার প্রতিদিন একটি ফিডারে ২ ঘণ্টা করে লোডশেডিং করতে বলেছিল। জুনের শেষ দিকে সরকার একটি শিডিউল করারও নির্দেশ দেয়। শুরুতে কিছুদিন শিডিউল মেনে লোডশেডিং করলেও পরে আর এ ধারা ধরে রাখতে পারেনি বিতরণ কোম্পানি। লোডশেডিং শিডিউলে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার মধ্যে ২ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে বলা হয়। কিন্তু এখন সকাল ৭টায় যেমন বিদ্যুৎ যাচ্ছে আবার রাত ৩টায়ও বিদ্যুৎ থাকছে না। কেন এমন হচ্ছে—জানতে চাইলে একটি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তা জানান, আমরা চাহিদার বিপরীতে যা পাই, তা-ই সরবরাহ করি। কিন্তু আমরা যা চাই তার চেয়ে কম পেলে আমাদের লোডশেডিং করার কোনো বিকল্প থাকে না।
কবে কমতে পারে লোডশেডিং
নভেম্বরের শুরুতে বিদ্যুতের চাহিদা কমে এলে লোডশেডিং কমতে পারে। তবে এর জন্য আরও ১২ দিন অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এখন দিনের বেলা সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১০ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট আর রাতে ১২ হাজার ৩০০ থেকে ১২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। অক্টোবরের মাঝামাঝি এসে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে। এর মধ্যে দেশের উত্তরের জেলাগুলোয় শীতের আগমনী বার্তা পৌঁছেছে। এসব এলাকায় আগামী ১০ দিনের মধ্যে তাপমাত্রা আরও নেমে যাবে। ফলে তখন ওই জেলাগুলোয় বিদ্যুতের চাহিদা অর্ধেকে নেমে আসবে। যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।
গত বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর দিনের বেলা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৯ হাজার ৪৪৫ মেগাওয়াট আর সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ১০ হাজার ৭৭৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল। ওইদিন দেশকে লোডশেডিং শূন্য দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি কারিগরি ত্রুটি ছাড়া দেশের সব সাবস্টেশনে চাহিদার পুরো বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে। এর পরদিন ১ নভেম্বর, ২০২১ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল দিনের বেলা ৯ হাজার ৪৪ মেগাওয়াট আর রাতের বেলা ১০ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ পরদিনই চাহিদা আরও কমে যায়।
ক্রমান্বয়ে বিদ্যুতের চাহিদা কমে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে মোটামুটি একই রকম থাকে। গত বছরের ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারির বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেকর্ড সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত বছর ১ ডিসেম্বর দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল দিনের বেলা ৭ হাজার ৮৭৫ মেগাওয়াট এবং রাতের বেলা ৯ হাজার ৯৯ মেগাওয়াট। আর চলতি বছর ১ জানুয়ারি দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ৬ হাজার ৫৪৪ মেগাওয়াট এবং রাতের বেলা ৭ হাজার ৯২২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে দেশে উৎপাদিত গ্যাস দিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করা সম্ভব।
প্রবা/আরএম/জেও