ট্রেনে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার
ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৩ ০০:৪৪ এএম
আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৩ ১০:৪৮ এএম
ট্রেনে মায়ের সঙ্গে ছোট্ট শিশু। সংগৃহীত ছবি
কিছুক্ষণ পরপর কাঁদছে সাত মাস বয়সি স্নেহা। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কান্না থামানোর চেষ্টা করছেন মা ইয়াসমিন আক্তার। ট্রেনে আশপাশের সবার দৃষ্টি স্নেহার দিকে। কান্নায় তার মুখ লাল হয়ে গেছে। সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন শিশুটিকে কিছু খাওয়ানো যায় কি না। কিন্তু কিছুই খেতে চাচ্ছে না। ট্রেনভর্তি মানুষের কারণে মা ইয়াসমিনও বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না মেয়েকে। সম্প্রতি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী তূর্ণা এক্সপ্রেস ট্রেনে দেখা মিলে এই চিত্রের।
চার বছর বয়সি ছেলে আদনান ও সাত মাস বয়সি মেয়ে স্নেহাকে নিয়ে ট্রেনে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন মা ইয়াসমিন আক্তার। তিনি বলেন, মা অসুস্থ হওয়ায় যেতে হচ্ছে। তা ছাড়া মা-বাবা একা থাকেন। মাঝেমধ্যেই যেতে হয়। স্বামী দেশের বাইরে থাকেন। তাই বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি দুটোই সামলাতে হয়। কিন্তু মেয়েটা খেতে চায় না কিছু। ট্রেনে এত মানুষ, বুকের দুধ খাওয়ানোটা আমাদের জন্য স্বস্তিকর নয়। বাচ্চাও বেশি মানুষের মধ্যে অস্থির হয়ে যায়।
পাশেই নিজের নয় মাসের ছেলে পুণ্যকে তরল খাবার খাওয়াচ্ছিলেন জান্নাতুল ফেরদৌস ও ফাহিম আহমেদ দম্পতি। কখনও কখনও কিছুটা জোর করেই খাওয়াতে হচ্ছে। কোনো ট্রেনের আসন না পাওয়ায় রাতের ট্রেনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছিলেন তারা। উঠে পাশের শিশুটির কান্না থামাতে কোলে নিয়ে এলেন নিজের ছেলের কাছে। তিনি বলেন, যাতায়াতের সময় ব্রেস্ট ফিড করা যায় না। আবার সংরক্ষণ করে আনলেও বাচ্চা খেতে চায় না। পরিবেশটাও দরকার। তাই বাচ্চাকে গুঁড়ো দুধ খাওয়ান।
জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, এ ছাড়া বাচ্চার ডায়াপার পাল্টানো, খাওয়ানো ট্রেনে একটু কঠিন। ট্রেনে গেলে দুই ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে বাসে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। ভাড়াও বেশি গুনতে হয়। সেক্ষেত্রে ট্রেনেই যাতায়াতে সুবিধা। তবে সবাই তো কেবিন নিয়ে যাতায়াত করতে পারে না। অন্যরাও মাঝেমধ্যে বিরক্ত হয়। কখনও কখনও ভিড় এত বেশি হয়, ভয় থাকে শিশু ব্যথা পাবে কি না। সেখানে শিশুকে খাওয়ানো তো পরের বিষয়।
ট্রেনে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার থাকা জরুরি বলে মনে করেন মায়েরা। তবে রেল আইনে নারীদের জন্য আলাদা কামরা থাকার কথা থাকলেও তার কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।
সরকারের এ বছরের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে বলা হয়, উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে প্রতিটি স্টেশনে নারীদের জন্য আলাদা কাউন্টার থাকার কথা থাকলেও তা ব্যবহারের চর্চা নেই, স্টেশন ও ট্রেনে অপর্যাপ্ত ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারসহ নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থাও।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্মসংস্থানে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ট্রেনের একটি কামরা বা ৩০ শতাংশ আসন নারীদের জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের গত বছরের বাজেট প্রতিবেদন বলছে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের পাশাপাশি তুরাগ এক্সপ্রেস ও টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেনে নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা কামরা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে সরকারি সেবাপ্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তুরাগ এক্সপ্রেসে নারীদের জন্য আলাদা কামরা সংরক্ষণ করা হলেও টাঙ্গাইল কমিউটারে কামরা বরাদ্দ রাখা হয়নি। বন্ধ হয়ে গেছে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জগামী রুটে চলাচল করা নারায়ণগঞ্জ কমিউটারে থাকা নারীদের আলাদা কামরাটিও।
বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মেহেরুন নেছা। তিন বছর ধরে ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা আসা-যাওয়া করে অফিস করেন। তিনি বলেন, ট্রেনটি প্রায় আট মাস বন্ধ ছিল। এর আগে আমিও নারী কামরায় অনেক যাতায়াত করেছি। কামরাটিতে টয়লেটের ব্যবস্থা ভালো ছিল না, তবে অনেক স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী নারীরা উঠতেন। ছেলেরা ভুল করে উঠলেও নামিয়ে দিতেন। সেজন্য জরিমানারও ব্যবস্থা ছিল। অল্প সময়ের এ রাস্তায় মেয়েরা খুব সহজে নারী কামরায় গাদাগাদি করে হলেও যেতে পারতেন। এ ছাড়া স্কুলের মেয়েদের নিয়ে একটা স্বস্তির বিষয় ছিলÑ কোনোরকম যৌন হয়রানির বিষয় ছিল না। নতুন করে ট্রেনটি চালু হওয়ার পর কামরাটি বন্ধ হয়ে গেছে।
ট্রেনের নারী চালক সালমা খাতুনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ট্রেনে নারী কামরা সব সময়ই ছিল। পদ্মা সেতুর জন্য ট্রেনটি বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন। আবার নতুন করে এই মাসে চালু হয়। কামরাটি মেয়েদের গল্পের জায়গাও ছিল। কামরাটি বন্ধ হয়নি, কিন্তু এলোমেলো অবস্থায় চলছে। নারীদের কামরাটিতে এখন পুরুষরাও উঠছে। সেখানে কোনো নিয়ম মানা হচ্ছে না।
১৮৯১ সালের রেল আইনের ৬৪ ধারা অনুযায়ী, যাত্রীবাহী প্রতিটি ট্রেনে একটি কামরা (কমপক্ষে সর্বাপেক্ষা নিম্ন শ্রেণির) শুধু নারীদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। দূরত্ব ৫০ মাইলের বেশি হলে কামরায় একটি শৌচাগার থাকতে হবে। আর আইনটির ১১৯ ধারায় বলা হয়েছে, নারীদের জন্য সংরক্ষিত এটি জানার পরও বিনা অনুমতিতে কোনো পুরুষ এ কামরায় উঠলে ১০০ টাকা জরিমানাসহ বিভিন্ন শাস্তি পাবে।
১৮৯১ সালের আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে একটি খসড়া করা হয়েছে, সেখানেও ট্রেনে নারীদের জন্য কামরা সংরক্ষণের বিষয়টি বহাল রাখা হয়েছে। জরিমানা বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা অনধিক এক বছরের জেল বা উভয় দণ্ডসহ বিভিন্ন শাস্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মমতাজ পারভীন যাত্রীবাহী প্রতিটি ট্রেনে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট কামরা বরাদ্দ রাখতে নির্দেশনা চেয়ে গত বছরের ১৩ জানুয়ারি হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। এর আগে ২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর নারীদের জন্য আলাদা কামরা বরাদ্দ চেয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি একটি আইনি নোটিস পাঠিয়েছিলেন তিনি। রিটকারী গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি একটি সম্পূরক আবেদন করেন। এর ওপর শুনানি নিয়ে গত বছরের ১০ মার্চ আইনের বিধান অনুযায়ী যাত্রীবাহী প্রতিটি ট্রেনে নারী যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট কামরা বরাদ্দ রাখতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দেন হাইকোর্ট। নারী যাত্রীদের জন্য ট্রেনে নির্দিষ্ট কামরা সংরক্ষণ সংক্রান্ত রেলওয়ে আইনের ৬৪ ও ১১৯ ধারা বাস্তবায়নে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়।
আইনে নারীদের কামরার বিষয়টি জানতেন না বলে জানান রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব হুমায়ুন কবীর। খোঁজখবর নিয়ে তিনি বলেন, ‘আইনে কামরার বিষয়টি আছে সেটা জানা ছিল না। তবে খোঁজ নিয়ে জেনেছিÑ খসড়ায়ও এই আইন আছে। সম্প্রতি তুরাগ এক্সপ্রেসে নারীদের জন্য আলাদা কামরা করা হয়েছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ রুটের ট্রেনে কামরাটি বন্ধ আছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই আবার চালু হবে।’