হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২২ ১৪:২০ পিএম
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২২ ১৮:২১ পিএম
ইলা মিত্র। ফাইল ছবি
ইলা মিত্রের নাম শোনামাত্রই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে তেভাগা আন্দোলন, নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ, নারী আন্দোলনের নেত্রীসহ নানান অভিধা। মঙ্গলবার (১৮ অক্টোবর) এই মহীয়সীর ৯৭তম জন্মবার্ষিকী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও তার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
ইলা মিত্র নারী অধিকারের কণ্টকাকীর্ণ পথকে ভেঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও প্রেরণার বাতিঘর হিসেবে আখ্যায়িত।
সাঁওতাল কৃষকদের ‘রানীমা’ ইলা মিত্রের প্রকৃত নাম ইলা সেন। ১৮ অক্টোবর ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতৃভিটা ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার বাগুটিয়া গ্রামে। বাবা ছিলেন সরকারি পদস্থ কর্মকর্তা। পড়াশোনা করেছেন কলকাতার বেথুন কলেজে। শৈশব থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি গান, আবৃত্তি ও ক্রীড়া জগতেও তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাবার চাকরির সুবাদে কলকাতাতেই থাকতেন। বাঙালি মেয়ে হিসেবে ইলা মিত্রই প্রথম ১৯৪০ সালে হেলসিঙ্কিতে অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হন। কিন্তু সেবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য অলিম্পিক স্থগিত হয়ে যায়।
কলকাতায় অবস্থানকালে ইলা মিত্র রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড় আন্দোলন’ ও ১৯৪৩ সালে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিতে যোগদান করেন।
১৯৪৫ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মালদহের কৃষক আন্দোলন ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রমেন সেনের সঙ্গে। এরপর থেকে ইলা সেনের নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘মিত্র’। ওই বছরেই তিনি চলে আসেন মালদহ জেলার নবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুরহাটের শ্বশুরবাড়িতে।
জীবনে শুরু হয় আরেকটি নতুন অধ্যায়। স্বামী রমেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন জমিদারি উচ্ছেদ ও জোতদারি শোষণের বিরুদ্ধে। সাঁওতাল কৃষকদের আন্দোলনে স্বামীর সহযাত্রী হিসেবে নিজেকে যুক্ত করেন। আদিবাসীরা তাকে নিজেদেরই একজন ভাবতেন। ক্রমেই তিনি হয়ে ওঠেন সাহস ও সংগ্রামের প্রতীক। ছেচল্লিশে নোয়াখালীতে দাঙ্গা বাঁধলে তিনি সেখানেও ছুটে যান।
১৯৪৬-৪৭ সালে ফসলের দুই-তৃতীয়াংশের ওপর কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাংলার ১৯টি জেলায় গড়ে ওঠে তেভাগা আন্দোলন। এই আন্দোলনে তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখেন।
১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারিতে ‘নাচোল বিদ্রোহ’ সংঘটিত হয়। ৫ জন পুলিশকর্মী খুন হয়, অস্ত্র লুট হয়। সরকার কৃষকসভার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় নাচোল হত্য মামলা। এই মামলায় ইলা মিত্রের নামে ওয়ারেন্ট জারি হয়। দেশভাগের পর বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে জুতসইভাবে এই বিদ্রোহই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ৭ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে রহনপুর স্টেশন থেকে পুলিশ ইলা মিত্রকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে নাচোল স্টেশনে। টানা চারদিন অকথ্য নির্যাতন চালায়। অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেছিলেন, তবু পুলিশের কাছে তিনি মুখ খোলেননি। পুলিশি নির্যাতনের মুখে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। গণদাবির মুখে তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। টানা আট মাস চিকিৎসার পর তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
সুস্থ হয়ে তিনি শুরু করেন নতুন জীবন। কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চারবার মানিকতলা কেন্দ্র থেকে বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ভারতীয় মহিলা ফেডারেশনের জাতীয় পরিষদের সদস্য, পশ্চিমবঙ্গের মহিলা সমিতির সহ-সভানেত্রী এবং ভারত ও সোভিয়েত সাংস্কৃতিক সমিতির সহ-সভাপতি ছিলেন।
ইলা মিত্র বেশ কয়েকটি রুশ গ্রন্থ অনুবাদ করেছিলেন। অনূদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে—‘জেলখানার চিঠি’, ‘হিরোশিমার মেয়ে’, ‘মনে-প্রাণে’, ‘লেনিনের জীবনী’ ও ‘রাশিয়ার ছোটগল্প’ উল্লেখযোগ্য। ‘হিরোশিমার মেয়ে’ গ্রন্থটির জন্য ‘সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু’ সম্মানে ভূষিত হন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় রমেন্দ্র ও ইলা মিত্র বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করেছেন। আজীবন নিজেকে বাংলাদেশি ভাবতেন। অকুতোভয় এই সংগ্রামী বীর নারী ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর কলকাতায় পরলোকগমন করেন।