দীপক দেব
প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০০:৫৮ এএম
আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:৩১ এএম
শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন ও দুর্নীতির মামলা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে দেওয়া খোলা চিঠির বিরুদ্ধে গত কয়েক দিনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিবৃতি দিয়ে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার এক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া বিবৃতি প্রদানে অস্বীকৃতি ও খোলা চিঠির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় শুরু তোলপাড়।
বিষয়টি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন কথা বলেছেন। এমরান আহম্মদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনাঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই ব্যক্তি। এডিজি এমরান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এটি করেছেন বলেও মনে করেন তারা।
এদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সরকারের একজন আইন কর্মকর্তার এমন অবস্থানের বিষয় নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আইনাঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, দলের মধ্যে ভিন্ন আদর্শের অনেকেই ঢুকে আওয়ামী লীগকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলার ষড়যন্ত্র করে আসছে। একইভাবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রেও একইরকম ঘটনা ঘটেছে। ডিএজি এমরান আহম্মদ ভূঁইয়াকে ভিন্ন আদর্শের মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা।
দলটির কেউ কেউ বলছেনÑ যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিবৃতি (ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন ও দুর্নীতির মামলা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠি) নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তাদের (বিবৃতিদাতাদের) আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন, সেখানে রাষ্ট্রের একজন আইন কর্মকর্তা হয়ে ডিএজি এমরান কীভাবে এমন বক্তব্য দেন। বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কাদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য সে এমটা করেছে, এটা খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন কেউ কেউ।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আইন কর্মকর্তা নিয়োগের সময় দুই-চারটা ভুল হয়েছে। যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের মধ্যে দুয়েকজন ভালো লোক না বা আমাদের আদর্শের লোক না। অনেক আইন কর্মকর্তার মধ্যে এমন প্রকৃতির দুই-চারজন পড়ে গেছে।’ সম্প্রতি মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের শোক প্রকাশের বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে টেনে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দলের (আওয়ামী লীগ) মধ্যেও এমন হাইব্রিড রয়েছে। যারা ত্যাগীদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তেমনি আইন কর্মকর্তাদের মধ্যেও দুই-চারজন ঢুকে গেছে। এর মধ্যে একজন (ডিএজি এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া) ধরা পড়ল।’
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন বলে মনে করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে ড. ইউনূসের বিষয়ে কথা বলার আগে তার (এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া) পদত্যাগ করা উচিত ছিল। অথবা তার কর্তৃপক্ষ অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু তিনি কোনোটাই করেননিÑ এটা শৃঙ্খলা পরিপন্থি।’ এমরান আহম্মদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি দেখবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়।’
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন ও দুর্নীতির মামলা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠি (বিবৃতি) পাঠিয়েছেন বিশ্বে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ১৬০ ব্যক্তি। তাদের মধ্যে ১০৭ জন নোবেলজয়ী রয়েছেন। শিকাগোভিত্তিক জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান সিজিয়ন পিআর নিউজওয়্যার তাদের ওয়েবসাইটে গত ২৮ আগস্ট এই চিঠি প্রকাশ করে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলন নিয়ে করা সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বিচার বন্ধের দাবি জানানো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে বিচার বন্ধের দাবি না করে ড. ইউনূসের পক্ষে বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী পাঠিয়ে নথিপত্র পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
১৬০ নাগরিকের স্বাক্ষর সংবলিত এই চিঠিকে বিচারব্যবস্থার ওপর হস্তক্ষেপের শামিল হিসেবে দেখে এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে পাল্টা বিবৃতি দিয়েছেন অনেকেই। এরই ধারাবাহিকতায় আইনজীবীদের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সেখানে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া বিবৃতি প্রদানের অস্বীকৃতি ও খোলা চিঠির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে এই বিবৃতি প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। যদিও অভিযোগটি সত্য নয় বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
গত সোমবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে গণমাধ্যমকর্মীদের এমরান আহম্মদ বলেন, ‘আমি মনে করি অধ্যাপক ড. ইউনূস একজন সম্মানীয় ব্যক্তি। তার সম্মানহানি করা হচ্ছে এবং এটা বিচারিক হয়রানি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অধ্যাপক ড. ইউনূসের পক্ষে ১৬০ জনের বেশি নোবেলজয়ী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেকেই বিবৃতি দিয়েছেন যে, ওনাকে বিচারিক হয়রানি করা হচ্ছে। সেটার বিপরীতে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস থেকে প্রতিবাদ জানিয়ে একটি বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে কর্মরত সবাইকে সেই বিবৃতিতে সই করার জন্য নোটিস দেওয়া হয়েছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই বিবৃতিতে সই করব না।’ ড. ইউনূস ইস্যুতে ১৬০ বিদেশি নাগরিক যে চিঠি দিয়েছেন, তার সঙ্গে ‘একমত’ বলেও উল্লেখ করেন এই ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল।
এমরান আহম্মদ ভূঁইয়ার বিবৃতি প্রদানের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিনও। গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডিএজি এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে দিয়েছেন, কাউকে খুশি করার জন্য দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘উনাকে (এমরান) সই করতে কখনও বলিনি। কোনো দিন কোনো আইন কর্মকর্তা বা কাউকে সই করতে বলি না। আমাদের অফিস থেকে আমার জানা মতে, নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, কোনো বিবৃতি তৈরি করা হয়নি।’
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘ড. ইউনূসের পক্ষে ১৬০ জনের বিবৃতির প্রথম দিনেই অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে বলে দিয়েছি, উনারা (ইউনূসের পক্ষে) যে স্টেটমেন্ট দিয়েছেন তা সঠিক হয়নি। কারণ, তারা জানতেন না সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক তাদের (ড. ইউনূসের) আবেদন দুবার প্রত্যাখ্যান হয়েছে। সর্বোচ্চ বিচারিক আদালত যখন বলে এটা হবে, তখন প্রশাসনিকভাবে কেউ প্রত্যাহার করতে পারে না। সে কারণে আমি প্রথম দিনই বলে দিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, এখন অ্যাটর্নি জেনারেল বলার পরে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলদের কি আর স্বাক্ষর করার প্রয়োজন আছে? আপনারা (সাংবাদিকরা) কী মনে করেন? আমি তো নিজেই এই অফিস থেকে বলে দিয়েছি। আমি বলা মানেই তো অ্যাটর্নি জেনারেলের বলা। তারপরও বলছি, সবাইকে স্বাক্ষর করতে হবে এই কথা বলিনি। এটা বলার কোনো প্রশ্নই আসে না।’
এএম আমিন উদ্দিন, ‘দ্বিতীয় কথা হলো, ‘তার যদি এটা মনে হয় যে সবাইকে স্বাক্ষর করতে বলেছি, তাহলে তিনি (এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া) তো আমার কাছে জানতে চাইতে পারতেন, এমন কোনো নির্দেশনা দিয়েছি কি না। তিনি সেটি জানতে চাননি। তার মানে কী? তিনি আমার কাছে জিজ্ঞেস না করেই কীভাবে জানলেন আমি বলেছি স্বাক্ষর করতে?’
‘কাউকে খুশি করার জন্য ডিএজি এমনটি করেছেন’ উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘কাল তো উনার ছুটি ছিল, তার তো কোনো ডিউটি ছিল না। উনি স্যুট পরে চলে এসেছেন। তিনি টিভির সামনে গিয়ে কী কারণে ব্রিফিং করলেন, কেন করলেন, কোন উদ্দেশ্যে করলেন, সেটা আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখুন। কাকে খুশি করার জন্য তিনি এসব কথা বলেছেন?’
খুলে ফেলা হয়েছে এমরান আহম্মদ ভূঁইয়ার নেমপ্লেট
এদিকে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান আহম্মদ ভূঁইয়ার নাম সংবলিত নেমপ্লেট খুলে ফেলা হয়েছে। গতকাল দুপুরে আরেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এসএম ফজলুল হক নেমপ্লেট খুলে ফেলেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া রাষ্ট্রের একজন আইন কর্মকর্তা হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাই একজন মুক্তিযোদ্ধা ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তার নেমপ্লেট আমি খুলে ফেলেছি। তার নেমপ্লেট অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে থাকতে পারে না বলেই মনে করি।’
সরকারি আইন কর্মকর্তাদের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল ১ জন, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ৩ জন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ৬১ জন, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ১৪৮ জন। এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া ২০১৯ সালের ২১ জুলাই ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদে পুনর্নিয়োগ পান।