নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২২ ১৫:০০ পিএম
জগতের সব প্রাণীর শান্তি কামনায় চলছে প্রবারণা উৎসব। ছবি: প্রবা
অসত্য ও অসুন্দর কর্মকাণ্ডকে বর্জন করে সত্য ও কুশল কর্মপন্থাকে বরণ করে নিয়ে পৃথিবীকে শান্তিময় করে তোলার প্রতিজ্ঞায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আজ রবিবার (৯ অক্টোবর) উদযাপন করছেন তাদের ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। এই পূর্ণিমায় তিন মাসব্যাপী তথাগত বুদ্ধ তাবতিংশ স্বর্গে মাতৃদেবীকে অভিধর্ম দেশনার পর বাংকাশ্য নগরে অবতরণ করেন। এ দিনে ভিক্ষুদেরকে তা হিত, সুখ, কলাম, ও প্রসারে দিকে দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন এবং এই পূর্ণিমা তিথিতেই ত্রৈমাসিক বর্ষাবাসের পরিসমাপ্তি হয়।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, শ্রাবস্তীর জেতবনে একসময় ভগবান বুদ্ধ অবস্থান করছিলেন। সেই সময় বিপুল সংখ্যক প্রগাঢ় মিত্রভাবাপন্ন ভিক্ষু কোশল রাজ্যের এক আবাসে বর্ষাবাসে রত ছিলেন। ভিক্ষুরা শঙ্কিত ছিলেন এই ভেবে যে যদি তারা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে হয়তো তাদের ধ্যান-সাধনার পথে বাধার সৃষ্টি হবে। এ জন্য কেউ কারো সঙ্গে কোনো প্রকার বাক্যবিনিময় না করেই মৌনভাবে বর্ষাবাস পালন করেন। পরবর্তী সময়ে বর্ষাবাস সমাপ্ত হলে মহামানব গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুদের কাছে তাদের বর্ষাবাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন এবং প্রত্যুত্তরে ভিক্ষুগণ বললেন, তারা নিজেদের মধ্যে কোনোরূপ কথা না বলে মৌনভাবে বর্ষাবাস অতিক্রান্ত করেছেন। ভিক্ষুগণের এমন উত্তরে বুদ্ধ অসন্তুষ্ট হন। কারণ একসঙ্গে বসবাস করতে গেলে নিজেদের মধ্যে ভুলত্রুটি কিংবা মতানৈক্য হওয়া স্বাভাবিক। তাই বলে ভিক্ষুগণ মৌনব্রত পালন করতে পারেন না।
বুদ্ধ ভিক্ষুদের আদেশ প্রদান করলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, আমি অনুজ্ঞা প্রদান করছি—বর্ষাবাসিক ভিক্ষুগণ দৃষ্ট, শ্রুত অথবা আশঙ্কিত ত্রুটি বিষয়ে প্রবারণা করবে।’
জগতের সব প্রাণীর শান্তি কামনায় চলছে প্রবারণা উৎসব। ছবি: প্রবা
বুদ্ধ প্রবারণাকে ভিক্ষুদের জন্য পরস্পরের মধ্যে সংঘটিত অপরাধ থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় এবং অবশ্য পালনীয় নিয়ম হিসেবে নির্দেশ করেছেন।
প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে পরবর্তী এক মাস অর্থাৎ কার্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত কঠিন চীবর দান সম্পন্ন হয়ে থাকে। বর্ষাবাস সমাপ্তকারী ভিক্ষুরা কঠিন চীবর গ্রহণ করেন।
রবিবার রাজধানীর মেরুল বাড্ডার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার ও বাসাবোর ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে দিনভর রয়েছে নানা আয়োজন।
আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ধর্মমিত্র মহাথের জানান, এদিন ভোরে বিহারে অবস্থান করা ভিক্ষু সংঘের প্রভাতী পিণ্ডদানের পর বুদ্ধ পূজা সম্পন্ন হয়। এরপর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শীল গ্রহণ, অষ্টপরিস্কারসহ মহাসংঘদানের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে দেশের সব বিহারে। এসময় সম্মেলক প্রার্থনায় অংশ নেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা।
অধ্যক্ষ ধর্মমিত্র মহাথের বলেন, ‘প্রবারণা’ শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত। প্রবারণা শব্দটির পালি ভাষারূপ পবারণা; এর অর্থ হল- প্রকৃষ্টরূপে বরণ করা। বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত এই তিন মাস বর্ষাব্রত পালন করেন। এই তিন মাস তারা বিহারে অবস্থান করেন। যেহেতু একসঙ্গে বসবাস করতে গেলে পরস্পরের মধ্যে ভুলভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক, সেহেতু ভিক্ষুদের মধ্যেও ভুলভ্রান্তি হতে পারে। এ তিন মাস আমরা একত্রে থেকে নিজের চিত্ত ও মনকে শুদ্ধ করতে তৎপর থাকি। তিন মাস আমরা শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা-এ তিনের অনুশীলন করি। বর্ষাব্রত পালন শেষে ভিক্ষুগণ আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথিতে প্রবারণা করেন।’
জগতের সব প্রাণীর শান্তি কামনায় চলছে প্রবারণা উৎসব। ছবি: প্রবা
এ দিনের তাৎপর্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রবারণা পূর্ণিমার অর্থ হচ্ছে, ভালো কাজকে বরণ করে নাও, খারাপ কাজকে ত্যাগ করো। যেটা শুদ্ধ সেটা বারবার করার চেষ্টা করো, আর যা জাতি ও সমাজের জন্য অকল্যাণকর তা থেকে দূরে থাকো। এ দিনে আমরা প্রার্থনা করি, আমরা যেন কোনো মানুষের ক্ষতি চিন্তা না করি। পরের জিনিসের প্রতি লোভ না করি। জাতির জন্য, সমাজের জন্য বা মানুষের কল্যাণের জন্য হিতকর কাজগুলোই আমরা করি, যেন গোট বিশ্ব-সুখে-শান্তিতে বিরাজ করে। সমস্ত দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে সুস্থ হয়ে মানুষ যেন শান্তিতে অবস্থান করে, আজ সেই প্রার্থনাই হয়েছে।’
তিনি বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমা শেষে তিন মাস বিহারে অবস্থান করা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ধর্ম প্রচারের জন্য দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বেন কাল (সোমবার) থেকে। এ সময়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ভিক্ষুদের কঠিন চীবর (সেলাইবিহীন বস্ত্র) দান করবেন।
প্রবারণা পূর্ণিমার এই পবিত্র দিনের আকর্ষণীয় একটি দিক হলো সন্ধ্যায় ফানুস ওড়ানোর উৎসব। ফানুস মূলত ওড়ানো হয় বুদ্ধের কেশ ধাতুর প্রতি পূজা ও সম্মান প্রদর্শন করতে।
কথিত আছে, গৌতম বুদ্ধ গৃহ ত্যাগ করার পর ভাবলেন, তার কেশরাশি সন্ন্যাস যাত্রার পথে পক্ষে অন্তরায়। তাই তিনি চুলের কয়গাছি কেটে রাজমুকুটসহ ঊর্ধ্বাকাশে নিক্ষেপ করেছিলেন। তাবতিংশ স্বর্গের দেবতারা তার কেশরাশি নিয়ে চুলমনি চৈত্য প্রতিষ্ঠা করে পূজা করতে লাগলেন। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই সশ্রদ্ধচিত্তে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস উড়িয়ে থাকেন।
গৌতম অরিন্দম বড়ুয়া সেলু জানান, রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে দেশের অধিকাংশ বিহারেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ফানুস উড়াবেন।
এদিন বিকালে মেরুলের আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ঢাকা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারের বিহারের অধ্যক্ষ ধর্মমিত্র মহাথের। স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশনের সভাপতি দিব্যেন্দু বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া ও সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় মহাথের।
এদিন বিকালে ‘প্রবারণা পূর্ণিমার তাৎপর্য ও বিশ্বশান্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন।
প্রবা/এইচকে