× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাক্ষাৎকারে ড. হাদিউজ্জামান

কয়েকটা ফুটওভার ব্রিজ ছাড়া কোনো দাবিই পূরণ হয়নি

রাশেদুল হাসান

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৩ ১৪:২১ পিএম

অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান।

অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে প্রাণ যায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের আবদুল করিম ওরফে রাজিব ও দিয়া খানম মীম নামের দুই শিক্ষার্থীর। এ ঘটনায় ওই দিন থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নামে আন্দোলনে। এ আন্দোলনের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সড়ক কতটুকু নিরাপদ হলো?

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামানের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদক রাশেদুল হাসান। 

প্রবা : সড়ক কতটুকু নিরাপদ হলো, আপনি সন্তুষ্ট? 

হাদিউজ্জামান : দুর্ঘটনা কমবে সে ব্যাপারে আশা করতে পারছি না। আমরা যেভাবে সড়ক সম্প্রসারিত করছি, দুই লেন থেকে চার-আট-দশ লেন করছি। তারপরও প্রতিদিন সড়কে প্রাণ ঝরছে। হঠাৎ করে বড় দুর্ঘটনা ঘটে একসঙ্গে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। শুধু অবকাঠামো তৈরি করে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কারণ কানাডা, আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের অনেক দেশে যেখানে সড়কের কোনো ঘাটতি নেই তারপরও দুর্ঘটনা নিয়ে তারা অনেক দিন ভুগেছে। এমনকি ভারতের হরিয়ানা রাজ্যেও ব্যাপক দুর্ঘটনা হতো। তারা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, যানবাহন ও চালকের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়ায় সফলতা পেয়েছে। কিন্তু আমাদের তথ্য-উপাত্ত বলছে, আমাদের এ রোগটা দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে।

প্রবা : দুর্ঘটনা কমছে না কেন? 

হাদিউজ্জামান : সরকারের থেকে বলা হয়Ñ আসলে স্বল্পমেয়দি প্রকল্প নিয়ে দুর্ঘটনা কমানো যায় না। এর জন্য যেটা করতে হবে, ৩৬৫ দিনই রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দরদ দিয়ে কাজ করতে হবে। দুর্ঘটনা কমাতে হলে সচেতনতা, যানবাহন ব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনার পর ট্রমা ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সড়ক উন্নয়ন করে চকচকে করে ফেললে হবে না, চালক, যানবাহন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ও চিকিৎসার বিষয়ে সমানতালে কাজ করতে হবে। তা না হলে দুর্ঘটনা কমবে না। কিন্তু আমাদের মনোযোগ শুধু অবকাঠামো তৈরির দিকে, সে কারণেই আসলে দুর্ঘটনা কমছে না।

প্রবা : ছাত্রদের আন্দোলনের দাবির প্রতিফলন সড়কে আছে কি? 

হাদিউজ্জামান : সড়ক আন্দোলনের যে দাবিগুলো ছিল সড়কে শৃঙ্খলা নিয়ে আসা, তা অত্যন্ত যৌক্তিক ছিল। আন্দোলনের পাঁচ বছর হয়ে গেল, এর মধ্যে কয়েকটা ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ ছাড়া আর কোনো দাবিই পূরণ হয়নি। আর ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যায় কি না, সেটা আরেকটা তর্কসাপেক্ষ বিষয়। বিষয়টা এমন যে, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটবে সেখানে একটা ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করে দেবেন। আর পরে দুর্ঘটনা আর কোথাও হবে না, জিনিসটা তা নয়। সামগ্রিকভাবে সড়কে শৃঙ্খলা আনাটাই হচ্ছে একটা বিষয়। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ করতে হবে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বলা হয়, ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ করতে হবে। এরপরও দেখা যায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে চলছে। সরকারি নির্দেশার পরও সড়কে অবৈধ গাড়ি ও অবৈধ চালক দুটোই বাড়ে। কোনো দুর্ঘটনার পরই দেখা যায় চালকের লাইসেন্স ছিল না কিংবা গাড়ির ফিটনেস ছিল না। দাবিগুলোর মধ্যে অধিকাংশ দাবির কোনো অগ্রগতি নাই। এখনও দুই বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় যাত্রী পথচারীর প্রাণ ঝরছে সড়কে। 

প্রবা : দেশের সড়কগুলোর নকশা কি দুর্ঘটনা প্রতিরোধী? 

হাদিউজ্জামান : চালক, পথচারী ও যাত্রী ভুল করতেই পারে, কিন্তু সড়কের নকশা এমন হবে যে দুর্ঘটনা‍গুলো ঘটার সুযোগ থাকবে না। যেহেতু আমরা চালক, যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা ওইভাবে তৈরি করতে পারিনি, তাই আমাদের সড়কের নকশাটা আরও অভিনব করতে হবে। আমরা তৈরি করে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছি, কিন্তু রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা রাখিনি। সামাজিক বন্ধনের টানে মানুষ রাস্তার এপার-ওপার যাবেই। তাই দেখা যায়, মহাসড়কে দুর্ঘটনার একটা বড় অংশ থাকে পথচারী। আমরা মহাসড়কে যানবাহনের গতি বাড়াতে ও দূরত্ব কমাতে চাই, কিন্তু দুর্ঘটনা কমানোর কোনো দর্শন উন্নয়নের সময় গুরুত্ব পাচ্ছে না। বর্তমানে মহাসড়কে ছোট ছোট গাড়ি চলার সার্ভিস লেন করা হচ্ছে। এটা ভালো। তবে পথচারীবান্ধব আন্ডারপাস করা দরকার। 

প্রবা : ট্রেনিং, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস সঠিকভাবে প্রদানে কী করা হচ্ছে? 

হাদিউজ্জামান : সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। এই প্রতিষ্ঠানটির বয়স ৪০ বছর হয়ে গেছে। তারা এখনও যেভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিচ্ছে, তা আমি বলব অনেকটা ‘তামাশা’। একজন চালক যখন সড়কে অন্যান্য যানের মধ্যে গাড়ি চালাবেন তাকে ট্রাফিক সংকেত মেনে চালাতে হয়। কিন্তু তারা মাঠপর্যায়ে যে পরীক্ষা নেয় তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেভাবে গাড়ি ডান-বাম করতে পারলেই লাইসেন্স পায়, সেটাকে আমি বলব তারা একটা দুর্ঘটনা ঘটানোর লাইসেন্স পেল। ফিটনেস সনদ দেওয়ার সময় ৪৪টি বিষয় পরীক্ষা করা হয়। যেভাবে পাঁচ মিনিটে শুধু চোখ দিয়ে এ পরীক্ষা করা হয়, এটা অবাস্তব। একটি গাড়ির ব্রেকিং সিস্টেম ও অন্যান্য যান্ত্রিক বিষয় চোখে দেখে ফিট বলা হচ্ছে, কিন্তু তা কতটুকু ফিট তা একটি গবেষণার বিষয়। এভাবে চালক ও গাড়ি সড়কে নামলে বিশৃঙ্খলা কখনও দূর হবে না। তা ছাড়া, তারা যে পরিমাণ গাড়ির নিবন্ধন দেয়, সেই পরিমাণ চালক আছে কি না, সেটাও দেখা উচিত। মহাসড়কে যেসব ভারী যানবাহন, তাতে একটি বাহনে কমপক্ষে দুজন চালক দরকার। সে হিসাবে আমাদের কাগজকলমেই সাড় চার লাখ ভারী যানবাহনের চালক দরকার। আমাদের চালক আছে দেড় লাখ। কোনো কাজই বৈজ্ঞানিক উপায়ে হচ্ছে না। 

প্রবা : ট্রেনিং পেয়েই চালক হচ্ছেন নাকি ট্রেনিং ছাড়াই? 

হাদিউজ্জামান : ভারী যানবাহন চালকদের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। চালকদের বেশিরভাগ ‘ওস্তাদ’দের কাছ থেকে শেখা। টার্মিনালে পার্কিং করার সময় একটু ডান-বাম করে। এভাবে সে সড়ক-মহাসড়কে চলে যাচ্ছে, এটা কোনো প্রশিক্ষণের কাতারেই পড়ে না। প্রশিক্ষণের বিষয়ে যানবাহনের মালিক, সরকার ও বিআরটিএর চিন্তা করতে হবে। 

প্রবা : সড়ক আইন প্রয়োগ সঠিকভাবে হয়, পুলিশের ভূমিকা কী? 

হাদিউজ্জামান : আইন তখনই কাজ করবে যখন সড়কের ব্যবস্থাপনা ৯০ শতাংশ বিজ্ঞানভিত্তিক হবে। আর ১০ শতাংশ রাজনীতি থাকলেও সমস্যা নেই। কিন্তু সেখানে যখন ১০ শতাংশ বিজ্ঞান থাকে আর ৯০ ভাগই রাজনীতি, তখন আইন প্রয়োগ করা কঠিন। পৃথিবীতে যেখানে আইন কঠোর সেখানে দেখা যায় ১০০ জনের মধ্যে ৫ জন নিয়ম ভঙ্গ করে। যেখানে কেউই আইন মানে না, সেখানে পুলিশ অসহায়। সেখানে প্রযুক্তিও কাজ করবে না। এখানে ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিবো কোথায়’ অবস্থা। 

প্রবা : পথচারী ও অযান্ত্রিক বাহনের দুর্ঘটনার দায় কতটুকু? 

হাদিউজ্জামান : পথচারী ও রিকশাওয়ালাদের একটা বড় অংশ যেমন অসচেতন, তেমনি তাদের যে ধরনের অবকাঠামো দরকার তাও কিন্তু আমরা দিতে পারিনি। ঢাকা শহরের দুর্ঘটনার একটা বড় অংশ পথচারী। পথচারীদের জন্য আলাদা ফুটপাথ কিংবা রিকশার জন্য আলাদা লেন কোনোটিই আমরা করছি না। বিক্ষিপ্ত কিছু ফুটপাথ তৈরি করা হয়। রিকশা নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনাই করা হয়নি। একজন গ্রাম থেকে এসেই রিকশা নিয়ে নেমে যাচ্ছে। অনেকে ট্রাফিক সিগন্যাল কিছুই বোঝে না, গাড়ি নিয়ে মূল সড়কে চলে আসে। 

প্রবা : সড়ক নিরাপত্তা কত দূর? 

হাদিউজ্জামান : এই সব সমস্যার সমাধান বাস রুট রেশনালাইজেশন। সড়কে কে কার আগে যাবে, কে কার আগে যাত্রী তুলবেÑ এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে গণপরিবহনে যে সিস্টেমটা থাকা দরকার সেটা দাঁড়ায়নি। এই শহরে ৫ হাজার বাসের ২ হাজার মালিক। এই বিক্ষিপ্ত মালিকানার কারণে এই উচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতি। আমরা কেন এই বাস রুট রেশনাইলাইজেশন করতে পারছি না, তার কারণ হচ্ছে যারাই উচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন তারাই নীতিনির্ধারণ করেন। আমাদের মালিক কর্তৃক চালককে নিয়োগপত্র দেওয়ার কথা ছিল। নিয়োগপত্র দেওয়া মানে চালকের বেতন, কর্মঘণ্টা সবই নির্ধারিত, তার আর প্রতিযোগিতা করতে হবে না। চালকরা নাকি বলে, এভাবে বাস চালালেই (চুক্তিভিত্তিক) নাকি বেশি টাকা পাওয়া যায়। এখন বাসরুট রেশনাইলাইজেশন কমিটি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে মিটিং করছে, পাইলটিং করছে কিন্তু কাজ হচ্ছে না কিছুই। কমিটির সিদ্ধান্ত মালিকরা মানে না। আবার মালিকদের দাবি কমিটি মানে না। এখন জবাবদিহির একটা দুর্ভিক্ষ চলছে। কারও কাছে জবাবদিহি নেই। আমাদের এখন জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, তাহলেই সড়কে শৃঙ্খলা আসবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা