রাশেদুল হাসান
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৩ ১২:২৬ পিএম
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পুরানো ছবি।
স্বামী ও সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল রাজধানীর ডেমরার গৃহিণী সখিনা বেগমের। সিএনজি অটোরিকশাচালক স্বামী মো. আক্তার হোসেনের আয়ে সংসার ভালোই চলত। কিন্তু ২০০৮ সালে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা এলাকার গাউছিয়ায় ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হন তিনি। তিন দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার লাশের খোঁজ পায় পরিবার। এরপর সখিনার জীবনে নেমে দুঃখের ছায়া। স্বামীকে হারিয়ে ভাইদের সংসারে ছিলেন কিছুদিন। এখন তিনি দুবাই প্রবাসী।
সখিনা বেগম বলেন, ‘একটা দুর্ঘটনা আমার পরিবারটাকে শেষ করে দিলো। আমার একমাত্র সন্তান থাকে ঢাকায়, আর আমি কয়েক হাজার মাইল দূরে আছি। বিয়েশাদি করিনি। একা থাকি দুবাই। করি মানুষের কাজ। কেউ কি সুখে থাকলে এত দূরে আসে।’
তিনি জানান, তিনি দুবাইয়ে এক মালিকের সন্তানদের দেখাশোনা করেন। তার আয় দিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালান।
সখিনা বেগমের মতো অনেকেই সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবারের উপার্জনক্ষম স্বজনকে হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে রাজনীতিবিদ, ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, কবি ও সাহিত্যিকসহ; সব শ্রেণি-পেশার মানুষের। এ মিছিলে আছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিশুক মুনীরসহ অনেক মেধাবী মানুষ। মৃত্যু ছাড়াও অনেকে অঙ্গ হারিয়ে সংসার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝায় পরিণত হয়েছেন।
২০১৮ সালে জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। এরপর ওই বছরের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে দেশজুড়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। সরকার তাদের দাবিগুলো মেনে নিয়ে দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি রেখে নতুন সড়ক আইন পাস করে। বাকি দাবিও পূরণ করার আশ্বাস দেওয়া হয়। দাবি পূরণের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরে যায়। তবে এই আন্দোলনের পর পাঁচ বছর কেটে গেলেও সড়কে মৃত্যু কমেনি, বরং বেড়েছে।
নতুন সড়ক আইন হওয়ার পর সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, সড়কে মৃত্যু প্রতিবছর বাড়ছে। বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ জন সড়কে প্রাণ হারায়। ২০২২ সালে এ প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮ জনে। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৭ হাজার ২২১ জন নিহত হয়। আহত ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। আর ২০২২ সালে দেশে কমপক্ষে ৬ হাজার ৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৯ হাজার ৯৫১ জনের প্রাণ ঝরেছে। এ সময় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ১২ হাজার ৩৫৬ জন।
গত ২২ জুলাই ঝালকাঠির ছত্রকান্দায় ‘বাশার স্মৃতি’ পরিবহন নামে একটি যাত্রীবাহী বাস পুকুরে পড়ে যায়। শুধু এই একটি ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ জানায়, চালক মোহন খানের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। এই বাস ভান্ডারিয়া থেকে বরিশাল যাচ্ছিল, অথচ বাসটির রুট পারমিট ছিল খুলনা-বরগুনা রুটে। মোট ৫২ আসনের বাসটিতে যাত্রী ছিল ৭০ জনের বেশি।
দুর্ঘটনা গবেষকরা জানান, ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের যে দাবিগুলো ছিল তার বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। কয়েকটি ফুটওভারব্রিজ ছাড়া আর অন্য কোনো দাবি পূরণ করা হয়নি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘সড়ক আন্দোলনে ছাত্রদের যে দাবিগুলো ছিল, পাঁচ বছর হয়ে গেলেও এর মধ্যে কয়েকটি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ ছাড়া আর কোনো দাবিই পূরণ হয়নি। আর ফুটওভারব্রিজ দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যায় কি না, সেটা আরেক তর্কসাপেক্ষ বিষয়। বিষয়টা এমন যে, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটবে সেখানে একটা ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করে দেওয়া হবে। আর পরে দুর্ঘটনা আর কোথাও হবে না, জিনিসটা তা নয়। সামগ্রিকভাবে সড়কে শৃঙ্খলা আনাটাই হচ্ছে একটা বিষয়।’
দুর্ঘটনা গবেষক হাদিউজ্জামান আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ করতে হবে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়, ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ করতে হবে। এরপর দেখা যায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে চলছে। সরকারি নির্দেশনার পরও সড়কে অবৈধ গাড়ি ও অবৈধ চালক দুটোই বাড়ে। কোনো দুর্ঘটনার পরই দেখা যায়, চালকের লাইসেন্স ছিল না কিংবা গাড়ির ফিটনেস ছিল না। দাবিগুলোর মধ্যে অধিকাংশের কোনো ধরনের অগ্রগতি নেই। এখনও দুই বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় যাত্রী ও পথচারীর প্রাণ ঝরছে সড়কে। সরকার শুধু অবকাঠামো তৈরিতে জোর দিচ্ছে, দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যেসব বিষয়ে জোর দেওয়া দরকার, সেখানে জোর দিচ্ছে না।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সব দাবি পূরণ না হলেও কিছু পূরণ হয়েছে বলে দাবি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মুনিবুর রহমানের। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘ছাত্রদের নিরাপদ সড়কের দাবি পুরোপুরি আদায় হয়নি। এই দাবিগুলোর সব পুলিশের কাজ নয়। এগুলো সব পক্ষের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে করা হবে। অনেক বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। পুলিশ তার অংশটুকু করার চেষ্টা করছে। পুলিশ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাশীল-ক্ষমতাহীন বৈষম্য করছে না। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে সড়কে শৃঙ্খলা আনা যাবে না।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার জানান, বিআরটিএ সড়ক নিরাপদ করার জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের চেষ্টা করছে।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘গাড়ির ফিটনেস যাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা না দেখে দিতে না পারেÑ এজন্য প্রতিটি গাড়ি সার্কেল অফিসে পরিদর্শন করার সময় পরিদর্শক ও গাড়ির ছবি তুলে রাখা হয়। আমরা এর একটা ভলিউম তৈরি করছি। গাড়ি না দেখে ফিটনেস দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হচ্ছে। এসব ঘটনায় মামলা ও সাসপেন্ড করার উদাহরণ আছে। সুতরাং আমরা আমাদের দিক থেকে সিরিয়াস। এখন কেউ যদি না দেখে ফিটনেস দেয়, সেটা সে রিস্ক নিয়ে নিজ দায়িত্বে দিচ্ছে।’