নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২২ ১৬:৩৩ পিএম
আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২২ ১৬:৩৬ পিএম
জাতীয় জাদুঘরে ড. এনামুল হকের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানান শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। ছবি: ফোকাস বাংলা
নিমতলীর পুরনো জরাজীর্ণ বাড়ি ছেড়ে ঢাকা জাদুঘরের সব কার্যক্রম স্থানন্তরিত হয়েছে শাহবাগের চার একরের চারতলা ভবনে। তবে বিশালাকার এ ভবনে সংগ্রহশালাতে নেই ইতিহাসের বহু নির্দশন, গ্রন্থাগারে সেই প্রত্নতত্ত্বের আকর গ্রন্থ। চারতলা ভবনকে জাতীয় জাদুঘর হিসেবে ক্রমেই দর্শকনন্দিত করে তুলতে উদ্যোগী হলেন ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ, ভাষাসংগ্রামী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. এনামুল হক। নিজের সঞ্চয়ের অর্থ খরচ করে, নিজের ভাণ্ডার থেকে বইপত্র এনে সমৃদ্ধ করে তুললেন জাতীয় জাদুঘর।
বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় ‘কিংবদন্তিতুল্য’ এই গবেষকের প্রয়াণের পর সংস্কৃতিচর্চায় তার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা স্মরণ করে শোকার্ত হলেন তার সহকর্মী, সহযোদ্ধা ও সংস্কৃতিজনরা।
১৯৮৩ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকা জাদুঘর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রুপান্তরিত হলে ড. এনামুল হক প্রথম মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। গত ১০ জুলাই ঈদুল আজহার বিকেলে ঢাকার বনানীতে নিজ বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। মৃত্যুকালে তিনি ছেলে সমুদ্র হক, মেয়ে হৃদি হক, নাতি-নাতনীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
মেয়ে বিদেশ থেকে ফেরার পর জানাজার সিদ্ধান্ত হয় পারিবারিকভাবে। ঢাকার একটি হাসপাতালের হিমঘরে মরদেহ সংরক্ষণ করা হয় তিনদিন। পরে আজ বৃহস্পতিবার সকালে সহকর্মী ও অনুরাগীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণে।
মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানান শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর,বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা, আইকম বাংলাদেশ, জাহানারা ফাউন্ডেশন।
শ্রদ্ধা নিবেদনপর্বে মেয়ে হৃদি হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের ছোটবেলা কেটেছে নিমতলীর সেই ঢাকা জাদুঘরের পাশে। বাসা জাদুঘরের পাশে হলেও বাবাকে খুব একটা বাড়িতে আমরা পাইনি। বাবা সারাদিন ব্যস্ত থাকতেন জাদুঘরে। জাদুঘরের বিস্তার আরও কিভাবে করা যায় তা নিয়েই চিন্তা করতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তা করে যেতে পেরেছেন, এটাই তার সাফল্য। ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ হিসেবে বাবা সারাজীবন ইতিহাস চর্চা করেছেন।
হৃদি হক জানান, মৃত্যুর আগের দিন রাতে তিনি বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের বার্ষিক প্রকাশনার সম্পাদনার কাজ করছিলেন। তারও আগে তিনি তার সুদীর্ঘ কর্মজীবনের নানা অধ্যায় নিয়ে আত্মজীবনী রচনা করে গেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে পরে তা বই আকারে প্রকাশ করা হবে বলে জানান হৃদি।
শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ড. এনামুল হককে ‘কিংবদন্তিতুল্য’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আজকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর যে আদল পেয়েছে তার পেছনে তার অবদানই বেশি। প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি তিনি পটের গানে তুলে ধরেছেন বঙ্গবন্ধুকে। তার জীবনকে সেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত চিত্রিত করেছেন। বঙ্গীয় শিল্পকলার সবকটি ধারা নিয়ে তার বিপুল উৎসাহ ছিল। বিটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দেখা হয় না চক্ষু মেলিয়া’র মাধ্যমে তিনি আমাদের দেশের আনাচেকানাচে যে অতীত ইতিহাস লুকায়িত রয়েছে তা তুলে এনেছেন, নতুন আঙ্গিকে দেশকে চিনিয়েছেন।
জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টিবোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আজকের বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও ড. এনামুল হক যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ওনি দেশকে ভালোবাসতেন। ওনি জানতেন, দেশকে জানতে হলে আগে দেশকে দেখতে হবে। সেই দেখার কাজটিই তিনি ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে করতেন। তার লেখা বইগুলো স্কুল-কলেজে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। সংস্কৃতির বিকাশে অনন্য অবদান রাখায় বাংলাদেশ তাকে চিরদিন স্মরণ রাখবে। পরে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ড. এনামুল হককে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মান গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
হৃদি হক জানিয়েছেন, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯ টায় বগুড়ায় ড. এনামুল হক আর্ট অ্যান্ড কালচারাল একাডেমি- টিএমএসএসে এনামুল হকের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সকাল সাড়ে ১০ টায় বগুড়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার কফিনে নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হবে। পরে গ্রামের বাড়ি ভেলুরপাড়াতে ড. এনামুল হক ডিগ্রি কলেজে বাদ জুমা সর্বশেষ জানাজার নামাজের পর তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
১৯৩৬ সালে বগুড়া শহরে জন্ম ড. এনামুল হকের। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে দেশজুড়ে যে আন্দোলন সূচিত হয়েছিল, ড. এনামুল হক তাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা তাই তাকে কারাগারে পাঠায়। পরে মুক্তি পেয়ে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৬৪ সালে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামস অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক পরিচালিত ‘মিউজিওলজি’তে তিনি ডিপ্লোমা ডিগ্রি নেন। ১৯৭১ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় তিনি লন্ডনে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন গণ-সংস্কৃতি সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আন্তর্জাতিক প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরগুলো নিয়ে গঠিত কমিশন আইকমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। পাশাপাশি এশিয়াটিক সোসাইটি, এফডিসি, জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক থাকাকালীন সময়ে বিটিভিতে তার উপস্থাপনায় ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’ শীর্ষক ইতিহাসনির্ভর অনুষ্ঠানটি ব্যাপক আলোচিত হয়।
ড. এনামুল হক ২০১৪ সালে একুশে পদক, ২০১৭ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব স্বাধীনতা পুরস্কার ও ২০২০ সালে ভারত সরকারের ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার পান।