অস্থায়ী শ্রমিকদের অবরোধ
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৩ ২১:০৯ পিএম
আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৩ ২১:৩১ পিএম
রেলের অস্থায়ী শ্রমিকরা রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় রেললাইন অবরোধ করে রাখায় রবিবার ভোগান্তির শিকার হয়েছেন রেলের যাত্রীরা। ফোকাস বাংলা ফটো
রেলের অস্থায়ী শ্রমিকরা রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় রেললাইন অবরোধ করে রাখায় রবিবার (১৬ জুলাই) ভোগান্তির শিকার হয়েছেন রেলের যাত্রীরা। এ দিন মোট ২৫টি ট্রেনের যাত্রা বিলম্ব হয়েছে ও একটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল হয়েছে।
সকাল ১০টার দিকে কারওয়ান বাজার রেল ক্রসিংয়ে কাফনের কাপড় গায়ে জড়িয়ে অস্থায়ী কর্মীরা রেললাইনে শুয়ে পড়েন। এ সময় বিভিন্ন দাবিতে তারা সমাবেশ করেন।
চাকরি স্থায়ীকরণ, আউটসোর্সিং প্রথা বাতিলসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত রেলের দুই শতাধিক অস্থায়ী কর্মী অবরোধে অংশ নেন। পরে রেলওয়ের ঢাকা বিভাগের পরিবহন ব্যবস্থাপক খাইরুল কবির জানান, বেলা ৩টার দিকে সারা দেশের সঙ্গে রেল যোগাযোগ পুনরায় শুরু হয়।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এই অস্থায়ী কর্মীদের আন্দোলনের ফলে পাঁচ ঘণ্টায় ২৫টি ট্রেনের যাত্রা বিলম্ব হয়েছে এবং একটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলের মহাপরিচালক কামরুল আহসান।
রেলের কর্মকর্তারা জানান, সকালে কারওয়ান বাজার রেল ক্রসিংয়ে তিতাস এক্সপ্রেস নামে একটি ট্রেন আটকে তারা এই অবরোধ শুরু করেন। পরে বেলা আড়াইটার দিকে রেলের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন ও পুলিশের তেজগাঁও অঞ্চলে সহকারী পুলিশ কমিশনার হাফিজ আল ফারুকের আশ্বাসে তারা অবরোধ তুল নেন। এরপর ঢাকার সঙ্গে বন্ধ থাকা সারা দেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
অবরোধের পর বিকাল ৪টার দিকে রেল ভবনে ২৫ জন অস্থায়ী শ্রমিকের সঙ্গে তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন রেলের মহাপরিচালক। বৈঠকে অস্থায়ী শ্রমিকরা তাদের দাবিগুলো উপস্থাপন করেন।
বৈঠক শেষে রেলের মহাপরিচালক জানান, শ্রমিকদের তিনটি দাবি রয়েছে। সেগুলো হলো—চাকরি স্থায়ীকরণ, স্থায়ীকরণের পূর্বে চাকরি বহাল ও আউটসোর্সিং প্রথা বাতিল করা।
মহাপরিচালক আরও জানান, তারা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে রেলমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েছিলেন। আমরা তাদের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে বসার ব্যবস্থা করব।
তবে মহাপরিচালক জানান, রেলের বর্তমান বিধি অনুযায়ী অস্থায়ী ভিত্তিতে জনবল রাখা এবং বেতন দেওয়ার সুযোগ নেই।
বৈঠক শেষে শ্রমিকদের প্রতিনিধি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন জানান, তাদের তিনটি দাবি পূরণ না হলে তারা আবারও কঠোর আন্দোলনে যাবেন।
টিএলআর শ্রমিক কারা, কেন এই আন্দোলন : টেম্পোরারি লেবার রিক্রুটমেন্ট (টিএলআর) শ্রমিক হচ্ছে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া রেলের গেটম্যান, ওয়েম্যান, খালাসি ও পয়েন্টস ম্যানরা। কাজ করলে বেতন কিন্তু কাজ না করলে বেতন নেই ভিত্তিতে এক একজন শ্রমিক পাঁচ থেকে দশ বছর এই পদগুলোতে চাকরি করছেন। অস্থায়ী শ্রমিকরা জানান, তারা চাকরিতে স্থায়ী হওয়ার জন্য দীর্ঘদিন অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরি করছে। কিন্তু সরকার তাদের চাকরি স্থায়ী না করে তাদের চাকরিচ্যুত করছে। রেলওয়ে এখন এই পদগুলোতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ করার প্রক্রিয়া করছে। ফলে অস্থায়ী চাকরিজীবীদের আউটসোর্সিংয়ের আওতায় কাজ করতে হবে, যার ফলে তাদের চাকরি কখনও স্থায়ীকরণ হবে না।
লালমনিরহাট থেকে আন্দোলনে যোগ দিতে আসা গেটম্যান আবু মুসা বলেন, ‘আমাদের অনেকে গেটম্যান পদে দশ থেকে পনেরো বছর ধরে চাকরি করছেন। তাদের আশা চাকরিতে স্থায়ী হবেন। রেলের বিধানে আছে, নিরবচ্ছিন্নভাবে তিন বছর চাকরি করলে চাকরি স্থায়ীকরণ করা হয়। কিন্তু এখন রেলওয়ে অস্থায়ী পদে কোনো জনবল না রেখে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দিতে চাচ্ছে। আমরা এই আউটসোর্সিং মানি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মৌখিকভাবে জানিয়ে দিয়েছেন আমাদের চাকরি নেই। এখন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ হবে। আমরা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চাকরি করতে চাইলে প্রথম তিন মাস বেতন ছাড়া চাকরি করতে হবে। তারপরে আউটসোর্সিং কোম্পানির আন্ডারে চাকরি করতে হবে। তারপরে আমরা বেতন পাব। আমরা আউটসোর্সিং কোম্পানির আওতায় চাকরি করতে চাই না। আমরা রেলের স্থায়ী কর্মী হিসেবে নিয়োগ পেতে চাই।’
তিনি জানান, ২০২৩-২৪ সালের বাজেটে অস্থায়ী শ্রমিকদের বেতন ভাতা খাতে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি, এর ফলে শ্রমিকরা বেতন পাবে না।
কমলাপুর স্টেশনে দুর্ভোগ : অবরোধের কারণে দিনভর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে রেলের যাত্রীদের। সকাল দশটা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত সারা দেশের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। সকালের অনেকগুলো আন্তঃনগর ট্রেন ঢাকা ছাড়তে পারেনি। সকাল দশটার কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস বেলা আড়াইটা পর্যন্ত কমলাপুরে দাঁড়িয়েছিল। বনানী বিমানবন্দর, টঙ্গী স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল অনেক ট্রেন।
ট্রেনের যাত্রা বিলম্বের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কমলাপুর স্টেশনে অপেক্ষা করে অনেক যাত্রী বিরক্ত হয়ে স্টেশন ত্যাগ করেছেন। রেলের কর্মচারীদের সঙ্গে ক্ষুদ্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেখা গেছে কয়েকজন যাত্রীকে।
রেলের ঢাকা বিভাগের ব্যবস্থাপক সফিকুল ইসলাম জানান, তিতাস ট্রেনের যাত্রা বাতিল হওয়ায় যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
দুপুর আড়াইটার দিকে কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসের যাত্রী আরিয়ান শাহিন জানান, সকাল ১০টার ট্রেন এখনও কমোপুরে দাঁড়িয়ে আছে। জানি না কী কারণে ট্রেন ছাড়ছে না।