প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৩ ১৬:২২ পিএম
আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৩ ১৬:৪৩ পিএম
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের গাজীপুর শাখার সভাপতি মো. শহীদুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন—এমন দাবি করেছেন বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের নেতারা। রবিবার (৯ জুলাই) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন তারা। একই বক্তব্য আসামিদের পরিবারের সদস্যদেরও। আর মামলার বাদী কল্পনা আক্তার জোর দিচ্ছেন তদন্তের ওপর। তার মতে, তদন্তে যা বেরিয়ে আসবে সেটি সবাই জানতে পারবে। বাকিটা আইনি বিষয়।
২৫ জুন সন্ধ্যায় টঙ্গীর প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার লিমিটেডের পোশাকশ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে যান শহীদুল ইসলাম। সেখানে বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় পরদিন তিনি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে গিয়ে অভিযোগ জানানোর হুমকি দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শহীদুল বেরিয়ে আসার পর ওই কারখানার ঝুট ব্যবসায়ী কামরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হানিফ ম্যানেজার ও তার সহযোগীদের বাধার মুখে পড়েন তিনি এবং তার সঙ্গে থাকা আরও দুই শ্রমিক নেতা। ওই দুজন হলেন বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক কর্মচারী পরিষদের গাজীপুর জেলা শাখার সভাপতি মো. মোস্তফা এবং জাতীয় নিট ডাইং গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের গাজীপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফ।
ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে শহীদুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি কল্পনা আক্তার ছয়জনকে আসামি করে টঙ্গী পশ্চিম থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তারা হলেন, যথাক্রমে পোশাকশ্রমিক মাজহারুল, আকাশ, রাসেল, রিপন, সোহেল ও ঝুট ব্যবসায়ী হানিফ ম্যানেজার।
বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি তুহীন চৌধুরী জানান, ১ নং আসামি মাজহারুল সংগঠনের গাজীপুর জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। ২ নং আসামি আকাশ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাসেল সংগঠনের গাজীপুর জেলা সভাপতি।
সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, ২৫ জুন ঘটনার সময় মাজহারুল পরিবারের সঙ্গে কোরবানির পশু কিনতে যাচ্ছিলেন। আকাশ বিজিএমইএ অফিসে ছিলেন। রাসেল বোর্ড বাজারে সংগঠনের অফিসে অবস্থান করছিলেন। টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশ মাজহারুলকে ঘটনাস্থলে ডেকে নিয়ে গ্রেপ্তার দেখায়। বাকি আসামিরা মামলার পর থেকে পলাতক ছিলেন। তাহলে কেন তাদের আসামি করা হয়েছে, তার অবশ্য সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি সংগঠনের নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে আসা আকাশের স্ত্রী নাসরিন আকতার বলেন, ’মোস্তফা নামে টঙ্গীর এক পোশাকশ্রমিকের সঙ্গে আকাশের দ্বন্দ্ব ছিল। তিনি কিছু দিন বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের টঙ্গী শাখায় কাজ করেছেন। নানা কারণে পরে তাকে সংগঠন থেকে বের করে দেন আকাশ। মোস্তফা অনেক চেষ্টা করেছিলেন সংগঠনে ফিরতে। সেটি না পেরে তিনি স্থানীয় মাসুদ, আলী আজগরকে নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখানেও সুবিধা করতে না পেরে তিনি আমার স্বামীকে শহীদ ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ফাঁসিয়ে দিয়েছেন।’
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় নেতারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
নাসরিন আকতার বলেন, ’এই মোস্তফা ঘটনাস্থলের সাক্ষী হিসেবে আকাশ, মাজহারুল ও রাসেলের নাম কল্পনা আপাকে বলেছে। কল্পনা আপা পরে তাদের আসামি করে ফেলেছেন। শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে আকাশের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি যখন হৃদরোগে আক্রান্ত হন, তখন আকাশ তার জন্য টাকা তুলেছিল। তাদের কোনো শত্রুতা ছিল না।’
শহীদুল হত্যা মামলার আরজিতে মারামারির কথা উল্লেখ করেছেন বাদী কল্পনা আক্তার। তবে ২৫ জুন টঙ্গীর প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার লিমিটেডের সামনে কোনো মারামারি হয়নি বলে রবিবারে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন নেতারা।
শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ’এ কারখানার বেতন-ভাতা নিয়ে মালিকপক্ষ টালবাহানা করছে। শ্রমিকরা নিজেরাই যেখানে কঠোর আন্দোলন করছে, তখন তারা কোন যুক্তিতে একজন শ্রমিক নেতাকে হত্যা করতে যাবে?’
টঙ্গীর গাছা থানার এসআই মো. জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে শ্রমিক নেতা শহীদুল ইসলামের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে তায়রুন্নেছা মেমোরিয়াল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। প্রতিবেদনে শহীদুলের শরীরে কোথাও জখমের চিহ্ন নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে তুহীন চৌধুরী জানান, শহীদুল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে আমরা লোকমুখে শুনেছি। পুলিশের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, কোনো মারধরের চিহ্ন নেই। আমাদের সংগঠনের তিন নেতাকে ফাঁসানো হয়েছে।
মামলার বাদী কল্পনা আক্তার এ প্রতিবেদককে বলেন, ’প্রত্যক্ষদর্শী অনেকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, আসামিরা সবাই প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার কারখানার লোক। আমি তখন তো জানতাম না, এরা কে কোন শ্রমিক সংগঠনের নেতা। এখন তদন্তে যদি বের হয়ে আসে যে শহীদুল হত্যাকাণ্ডে কোনো সংগঠন বা নেতা জড়িত, তবে সেটা তো সবাই জানতে পারবে। বাকিটা আইনি বিষয়।’
কল্পনার অভিযোগ অস্বীকার করে সোয়েটার কারখানার মালিক মো. সাইফ উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ’শহীদুলের মৃত্যুর ঘটনায় আমার কারখানার কেউ জড়িত নন।’
গাজীপুর জেলা শিল্প পুলিশের অ্যাডিশনাল এসপি মোহাম্মদ ইমরান আহম্মেদ জানিয়েছেন, রবিবার সকালে শহীদুল হত্যা মামলার ছয় নম্বর আসামি হানিফ ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নানা বিষয়ে তথ্য রয়েছে আমাদের কাছে। আমরা সবকিছু যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। হানিফকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে বিস্তারিত অনেক কিছু জানা যাবে।
এদিকে শ্রমিক নেতা শহীদুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। এ ঘটনায় ২৮ জুন মার্কিন শ্রম বিভাগ (ইউএসডিওএল) নিন্দা জানিয়েছে। ঘটনার পর বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ)-এর সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, এ হামলায় মালিকপক্ষের কেউ জড়িত নয়। দুই শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের মধ্যে মারামারিতে শহীদুলের মৃত্যু হয়েছে।