প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৩ ১১:১৬ এএম
আপডেট : ২৫ জুন ২০২৩ ১৩:০০ পিএম
ফাইল ফটো
পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য এক আশীর্বাদ। এ সেতু চালুর পর শিল্প, কৃষি ও পর্যটন খাতে বহুমুখী প্রকল্প নিয়ে কর্মপরিকল্পনা সাজিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এতে অবহেলিত দক্ষিণবঙ্গের সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। পদ্মা সেতুর ফলে লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পূরণ হচ্ছে বহু বেকারের স্বপ্ন।
পদ্মা সেতু চালু হয় ২০২২ সালের ২৫ জুন। আজ এ সেতু উদ্বোধনের এক বছর পূর্ণ হলো। বহুমুখী এ সেতু খুলে দেওয়ার পর পদ্মাপাড় ও সেতু ঘিরে গড়ে উঠছে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ঝিমিয়ে পড়া শিল্পনগরী খুলনা চাঙ্গা হয়েছে। কলকারখানায় বেড়েছে বিনিয়োগ।
সেতু ঘিরে নির্মাণ হচ্ছে নতুন নতুন কলকারখানা, পোশাক শিল্প, হোটেল-মোটেল। বিনোয়োগকারীরা এ অঞ্চলে বিনিয়োগ করাতে জমির দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। বেশিরভাগের কাজ রয়েছে নির্মাণাধীন। বেকারদের হচ্ছে কর্মসংস্থান।
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কাজির হাটে হতে যাচ্ছে সিকদার হিমাগার, সিকদার অটোব্লক ফ্যাক্টারি, সিকদার হ্যাচারি। পদ্মা সেতুর পাশে নাওডোবায় শুরু হয়েছে ভূইয়া অটোব্লক ফ্যাক্টারি। পাশেই চলছে আরও একটি বেসরকারি অটোকনস্ট্রাকশন ফ্যাক্টারির কাজ। গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর এলাকায় গড়ে উঠেছে মিনা ফ্যাশন হাউস নামে একটি গার্মেন্টস। এ ছাড়া সরকারিভাবে চলমান আছে শেখ হাসিনা তাঁতশিল্প। স্থানীয়দের হয়েছে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, দূর হতে শুরু করেছে বেকারত্ব।
নাওডোবার বাসিন্দা মাহবুবুল হাসান রেজাউল জানান, পদ্মা সেতুকে ঘিরে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হচ্ছে। এতে এ অঞ্চলের জমিজমার দাম বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। স্থানীয় মানুষের হচ্ছে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।
জাজিরা উপজেলা চেয়ারম্যান ও সিকদার পোশাক শিল্পের মালিক মোবারক আলী সিকদার জানান, পদ্মা সেতু হওয়াতে এখন দেশে বিনিয়োগ করছি এ অঞ্চলের মানুষের কথা চিন্তা করে।
শরীয়তপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি, নড়িয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, মানি চেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি একেএম ইসমাইল বলেন, শরীয়তপুরে পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে থ্রি-স্টার মানের হোটেল-মোটেল তৈরি হবে। গার্মেন্টস, মাঝারি শিল্প, মৎস্য, গবাদিপশু, কৃষি ও পরিবহন খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এরই মধ্যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। যা শুধু এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে না, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জীবনমানের উন্নয়ন হবে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলাতেই বিসিক শিল্পনগরী রয়েছে। এর মধ্যে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে আছে দুটি করে শিল্পনগরী। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ২ হাজার ৪০০ একর জায়গায় এ শিল্পনগরী করার পরিকল্পনা রয়েছে বিসিকের। ২০২৬ সালের মধ্যে এসব শিল্পনগরী বাস্তবায়ন করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মাগুরা জেলা বিসিকের উপব্যবস্থাপক ফরিদা ইয়াসমিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এ জেলা কৃষিনির্ভর। এদিকে মাগুরা ও নড়াইলে নিজস্ব শিল্পাঞ্চল না থাকায় জেলা দুটি অনেকটাই পিছিয়ে। ২০২২ সালে পদ্মা সেতুটি উদ্বোধন হওয়ার পর থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ঢাকা থেকে বড়ো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে। আমরা অপেক্ষায় আছি নিজস্ব শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার। পদ্মা সেতুর কল্যাণে শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে জেলায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।
গত এক বছরে সরকারিভাবে খুলনায় বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণসহ বাস্তবায়নকাজ চলমান রয়েছে। আবার অনেকগুলো অবকাঠামোগত নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসকের রাজস্ব ও ভূমি শাখার তথ্যমতে, পদ্মা সেতু উদ্বোধন থেকে শুরু করে খুলনায় বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বৃদ্ধি, উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য সংরক্ষাণাগার ও আইসিটির উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে। সরকারের এসব প্রকল্পের কোনোটির জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে। আবার কোনোটির ভূমি অধিগ্রহণ চলছে।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ঢাকা থেকে মাত্র ৫ ঘণ্টায় সাগরকন্যা পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। কুয়াকাটার ব্যবসায়ীরা জানান, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই পর্যটক বাড়ছে। বাড়ছে স্থানীয়দের কাজের সুযোগ।
বরিশাল বিসিকে গড়ে উঠেছে প্রথম পোশাক তৈরির কারখানা, বোতলজাত পানি পরিশোধনাগারসহ নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া সেখানকার বৃহৎ ফরচুন সুজসহ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের পণ্য আনা-নেওয়ায় সময় সাশ্রয় হওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে যশোরের। অভয়নগর মাছের ঘের মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান গোলদার বলেন, অভয়নগরে ২০ হাজার মৎস্যচাষি রয়েছে। এসব চাষি বছরে ৩০ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করেন। যার বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বছরের ২৪ হাজার টন উৎপাদিত মাছ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
যশোর জেলা প্রশাসক তাজুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পদ্মা সেতুর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, ক্ষুদ্র ও ভারী শিল্প, দুগ্ধ ও মাংস শিল্প বিকশিত হয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষের কাজের ক্ষেত্র অনেক সম্প্রসারিত হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে যশোরের কৃষি ও শিল্পে বিপ্লব ঘটবে।
পদ্মা সেতুর প্রভাবে গোপালগঞ্জের কর্মসংস্থান খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। গোপালগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সাধারণ সম্পাদক শেখ মাসুদুর রহমান বলেন, পদ্মা সেতু হওয়ার কারণে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে গোপালগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়েছে। কাছেই রয়েছে বেনাপোল স্থলবন্দর, সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর ও পায়রা বন্দর। ফলে বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তাদের দৃষ্টি এখন গোপালগঞ্জের দিকে। এসব শিল্প উদ্যোক্তা এরই মধ্যে গোপালগঞ্জে শিল্পকারখানা তৈরির জন্য জায়গা কিনছেন। অনেকে গোপালগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদনও করছেন। শিল্পে অনুন্নত এই জেলা পদ্মা সেতু হওয়ার কারণে শিল্পে একটি ভূমিকা রাখবে এবং এখানকার তৈরি পণ্য সহজে ঢাকাসহ সারা দেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। ফলে এ অঞ্চলের বেকারত্ব ঘুচবে।
পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী ও খেটে খাওয়া মানুষ একটু ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় বুক বেঁধে আছেন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ঘিরে। চোখে-মুখে তারা দেখছেন সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের রঙিন সোনালি স্বপ্ন।