আলাউদ্দিন আরিফ
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৩ ১১:১৯ এএম
আপডেট : ১৩ জুন ২০২৩ ১১:২০ এএম
ফাইল ফটো
বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটছে। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে এক সভায় এই বিষয়ে আলোচনা হয়।
পুলিশ সুপারদের (এসপি) পাঠানো হামলা-পাল্টা হামলার চিত্রে বলা হয়, বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জেলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীনদের সংঘর্ষের কারণে আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি ঘটছে। বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, ফেনী, নেত্রকোণা, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তারা এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা চান।
সভা থেকে এসপিদের বলা হয়েছে, বালুমহাল আইনের শর্ত লঙ্ঘন করলে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে জেলা প্রশাসককে জানাতে হবে। বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে পুলিশের যেকোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা বন্ধ করতে হবে। বালু তোলায় পাম্প ড্রেজার ব্যবহার করা যাবে না অর্থাৎ ইজারাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সুইং ড্রেজার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ওই সভায় বলা হয়, বালু উত্তোলনে খরচ কম; লাভ বেশি- তাই এটা নিয়ে একটি বড় বাণিজ্য চলছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা এসব বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করছেন। যেসব জায়গা বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা দেওয়া হয় জেলা প্রশাসন থেকে ওইসব জায়গা ‘ডিমার্কেশন’ বা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। বালুমহাল আইনে এই বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।
বলা হয়েছে, ১২ ফুটের বেশি গভীর থেকে কেউ বালু উত্তোলন করতে পারবে না। বালু কোনোভাবেই পাম্প ড্রেজার দিয়ে তোলা যাবে না। বালুমহাল আইনের তিনটি শর্তের বাইরে কোনো ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে জিডি করে রেফারেন্স দিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) জানাতে হবে।
সিলেট জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বালুমহাল ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। তারা নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করে দেয়। কিন্তু যারা ইজারা পান, তারা আশপাশ থেকেও বালু উত্তোলন করেন। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানা জমি থেকেও বালু তুলে নেন। এতে আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কা দেখা দেয়। আমাদের কাছে এ ধরনের অভিযোগ আসার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি।
মামুন আরও বলেন, বালুমহাল ইজারা নিতে একাধিক পক্ষ আগ্রহী থাকে। যে পক্ষ ইজারা পায় তাদের কাছে অন্যপক্ষ চাঁদা দাবি অথবা নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এতে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দেয়। গত মাসেও সিলেটের ছাতকে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে একজন মারা যায়। ওই ঘটনায় ১৮ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। সিলেটের আরেক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বালু উত্তোলন ও বালুমহালের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গত দুই-তিন মাসে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের মধ্যে বেশ কয়েকটি হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশ জানিয়েছে, বালুমহালের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গত ৭ জুন হরিরামপুরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ঝিটকা বাজার ও লেছড়াগঞ্জ বাজারে ওই হামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক আব্দুল আজিজ, ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুস্তাকিম চৌধুরী রিফাত ও ছাত্রলীগ কর্মী ফয়েজ আহমেদ আহত হন। এদিকে কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সুয়াবিলে বালুমহাল নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আলা উদ্দিন নামে এক যুবক নিহত হন। গুরুতর আহত হন আনোয়ার ও সেকান্দর নামে দুজন।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানা-পুলিশ জানায়, সোনারগাঁওয়ের বৈদ্যেরবাজারে মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষে জাকির হোসেন নামে একজন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন পাঁচজন। ওই ঘটনায় করা মামলার এজাহারে বলা হয়, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি নবী হোসেন ও যুবলীগ নেতা আমির হোসেনের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। বালু বিক্রির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে নবী ও আমির গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এতে জাকির নিহত হন।
বালুমহালের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এরকম অভিযোগ প্রতিদিনই পাচ্ছে পুলিশ। ফলে এসব বিষয় নিয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ কল্পে কিছু নির্দেশনা দেয় পুলিশ সদর দপ্তর।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বালু উত্তোলন নিয়ে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা সিলেট, সিরাজগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে ঘটার সম্ভবনা বেশি। সবচেয়ে দামি বালু হচ্ছে সিলেটের লাল বালু। বালু উত্তোলনের জন্য যে এরিয়া দেওয়া হয়, সেখানেই যেন বালু উত্তোলন করা হয়- বিষয়টি স্থানীয় পুলিশকে নিশ্চিত করতে হবে। বালু উত্তোলনে সুইং ড্রেজার ব্যবহার করতে হবে। কারণ সুইং ড্রেজার ব্যবহার করলে নদীর পাড় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে না। কোথাও অবস্থার অবনতি হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপার বিষয়টি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সকে অবহিত করবে।’