মামুন-অর-রশিদ
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৩ ১১:১৭ এএম
ফাইল ফটো
ভূরাজনৈতিক দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে এক্সন মবিলকে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ দিচ্ছে না বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এই বহুজাতিক কোম্পানি গত মার্চ মাসে বঙ্গোপসাগরে সরাসরি তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ব্লক ইজারা চেয়ে পেট্রোবাংলাকে চিঠি দেয়। সরকার কোম্পানিটিকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ দিচ্ছে, গত কয়েক মাস ধরে এমন আলোচনাও ছিল।
তবে জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, এক্সন মবিল বাংলাদেশে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ পাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, গত মার্চে এক্সন মবিল আনুষ্ঠানিকভাবে এক চিঠি দিয়ে সরাসরি ব্লক ইজারার ব্যাপারে পেট্রোবাংলার সঙ্গে আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে এই তেল-গ্যাস কোম্পানিটি পেট্রোবাংলার সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করার প্রস্তাব দেয়। এক্সন মবিলের চিঠি পাওয়ার পরপরই জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চেয়ে চিঠি দেয় পেট্রোবাংলা। তবে গত দুই মাসে এক্সন মবিলের বিষয়ে কী করতে হবে, সে সম্পর্কে কোনো নির্দেশনা পেট্রোবাংলাকে দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এক্সন মবিলের চিঠি পাওয়ার পর গত এপ্রিলে জ্বালানি বিভাগের নির্দেশনা চাই। এ বিষয়ে কী করতে হবে, আমাদের তা এখনও জানানো হয়নি।’ জ্বালানি বিভাগ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে কখনও এত দিন দেরি করে না বলেও জানান তিনি।
বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানের গভীর ও অগভীর অংশকে মোট ২৬টি ব্লকে বিভক্ত করা হয়েছে। অগভীর ব্লকে পানির গভীরতা সর্বোচ্চ ২০০ মিটার। এরপর থেকেই গভীর সমুদ্র ব্লকের শুরু। এখানে অগভীর সমুদ্রে ১১টি ও গভীর সমুদ্রে ১৫টি ব্লক রয়েছে। বর্তমানে ভারতের রাষ্ট্রীয় তেল গ্যাস কোম্পানি ওএনজিসি ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি বঙ্গোপসাগরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। পেট্রোবাংলা সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে চলতি বছরের শেষের দিকে নতুন দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে। এর আগেই পেট্রোবাংলার কাছে গভীর সমুদ্রের ব্লক ইজারা চেয়ে চিঠি দেয় এক্সন মবিল।
জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ভূরাজনৈতিক দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে এক্সন মবিলকে ব্লক ইজারা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের এই কোম্পানিটি গভীর সমুদ্রের যে ব্লকগুলোর ইজারা চেয়েছে, সেগুলো মিয়ানমার ও ভারতের সমুদ্রসীমান্ত লাগোয়া। এখান থেকে চীনের দূরত্বও খুব বেশি নয়। এসব ব্লক বহুজাতিক এই কোম্পানির হাতে তুলে দিলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা অবস্থান করবে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য স্বস্তিকর হবে না।’
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তাই এই ভূরাজনৈতিক ফাঁদে পা দেবে না বাংলাদেশ। এক্সন মবিলকে ব্লক ইজারা দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সবার আগে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশেই এক্সন মবিলের বিষয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী কোনো দেশই একে অপরকে সচরাচর ছাড় দেয় না। সাম্প্রতিক সময়ে একটি চীনা জাহাজ বাংলাদেশের হয়ে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস জরিপের কাজ করে। এই জাহাজটি ঘুরতে যতটুকু জায়গা প্রয়োজন, ভারতের কাছে বাংলাদেশ কেবল সেটুকু ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল। এ লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়েছিল। কিন্তু ভারত তাদের সাগরের অংশ ব্যবহার করে চীনা জাহাজকে ঘোরার অনুমতি দেয়নি। ফলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকার একটি অংশ জরিপের বাইরে থেকে গেছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, কেবল চীনা জাহাজ হওয়াতেই জরিপকারী জাহাজটির ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমোদন মেলেনি। এই অভিজ্ঞতার আলোকে এ বিষয়টিও আগে থেকেই চিন্তা করা প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সন মবিলের এত কাছাকাছি অবস্থান চীন মেনে নেবে কি না।
সাধারণত দরপত্র আহ্বান করলেই বহুজাতিক তেল গ্যাস কোম্পানি তাতে অংশ নিয়ে থাকে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ পেট্রোবাংলা সেই দরপত্র আহ্বান করতে চলেছে। কিন্তু এরই মধ্যে গত মার্চ মাসে এক্সন মবিল বেশ দ্রুততার সঙ্গে এই কাজ করার প্রস্তাব দিয়ে চিঠি পাঠায় পেট্রোবাংলায়। নির্বাচনী বছরে এসে এক্সন মবিলের এই উদ্যোগকে কেউ কেউ ‘কিছুটা রহস্যজনক’ও মনে করছেন।
এক্সন মবিল বাংলাদেশে কাজ পাচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ জ্বালানি খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখনও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। তারা মাত্র আমাদের কাছে চিঠি দিয়েছে। আমরা একটি কমিটি গঠন করব। তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হবে।’