× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হুটহাট গর্ভধারণের যুগ এটি না

ফারহানা বহ্নি

প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৩ ১১:৫৯ এএম

গর্ভবতী নারী। ছবি : সংগৃহীত

গর্ভবতী নারী। ছবি : সংগৃহীত

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ির বস্তিতে তিন ছেলেমেয়ে ও শাশুড়িকে নিয়ে থাকেন আকলিমা আক্তার। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে সংসার চালান। স্বামী পেশায় গাড়িচালক। প্রথম সন্তানের জন্ম হাসপাতালে হলেও পর পর দুই সন্তানের জন্ম দেন বাসায়। আকলিমা জানান, ওষুধ খেলে বাচ্চা বড় হয়ে যেতে পারে। তখন সিজারে বাচ্চা জন্ম দেওয়া লাগত। সে জন্যই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেননি তিনি। 

তিনি বলেন, ‘শাশুড়ি, স্বামী যদি না চান হাসপাতালে কেমনে যামু? ওষুধপত্রের খরচ, ভর্তির খরচ দুনিয়ার ট্যাহা লাগে।’ 

একই চিত্র দেখা যায়, মিরপুরের পোড়া বস্তিতেও। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা জ্যোৎস্না খাতুন। সবে ১৯ বছরে পা দিয়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘পরীক্ষানিরীক্ষা করিয়েছি। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। আমার বড় বোনের বাচ্চাও বাসায় হইছে। হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি হয় না। এজন্য বাসায় করার কথা বলছে বড়রা।’ 

সরকারি হাসপাতালে প্রসবপূর্ব চারবারের সেবা বিনামূল্যে পাওয়া যায়। তবে ধাপে ধাপে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা কমতে থাকে। চতুর্থ ধাপে অধিকাংশ নারী আর হাসপাতালে আসে না। ফলে মাতৃত্বজনিত রোগে দিনের পর দিন ভুগতে হয় নারীদের। এ নিয়ে সচেতনতা ও অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন মাতৃস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

আজ রবিবার, ২৮ মে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। সারা দেশে সচেতনতা বাড়াতে ‘গর্ভকালে চারবার সেবা গ্রহণ, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করি’ এ প্রতিপাদ্যে পালিত হচ্ছে দিবসটি।

তবে প্রসবপূর্ব সেবাও অনেকে ঠিকমতো পাচ্ছেন না। যার কারণে হাসপাতালেও অনেক মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। সেই সঙ্গে চিকিৎসা ক্ষেত্রেও অনেক জায়গায় অবহেলা আছে বলে মনে করেন রোগীর স্বজনরা। ঢাকার একটি অফিসে কেয়ারটেকারের কাজ করতেন শাহীনা আক্তার। স্বামী আশরাফ হোসেন কসবায় ফোনের দোকানে কাজ করতেন। তিনি বলেন, আর্থিক টানাটানির সংসারে আরও একজন আসবে। তাই এ অবস্থাতেই কাজ চালিয়ে যান সামনের সময়ে কিছু টাকা বাঁচিয়ে রাখার জন্য। আমিও তার (স্ত্রী) পাশে ছিলাম না। আমাদের ছেলে যেদিন হলো, সেদিন আমরা হাসপাতালে গিয়েছিলাম। নরমাল ডেলিভারি হয়। ডাক্তার সেদিনই ছেড়ে দেন। পরদিন আমার স্ত্রীর খিঁচুনি ওঠে। পরে লাইফসাপোর্টে মারা যান তিন দিনের ছেলেকে রেখে। টাকাপয়সা যাদের নাই তারা তো উন্নত চিকিৎসা নিতে পারেন না। 

বাসায় ডেলিভারি করানো কতটুকু স্বাস্থ্যকরÑ প্রশ্ন করা হলে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. রওনক কলি বলেন, গাইনিসহ আমরা যারা ফিল্ড ওয়ার্ক করি, সবাই একটা মেসেজ দিতে চাইÑ ফ্যাসিলিটি ডেলিভারি। তারপরও দেশের যে প্রেক্ষাপট শ্বশুরবাড়ির চাপ, পর্দানশীলতাÑ এসব কারণে নারীরা আসতে চান না হাসপাতালে। সে ক্ষেত্রে এফবিএ প্রজেক্ট চালু আছে, যার মাধ্যমে বাসায় ডেলিভারি করানো হয়। কিন্তু সেটাও মানা হচ্ছে না। কেউ নিয়মিত চেকআপ না করালে গর্ভাবস্থায় তিনি উচ্চঝুঁকিতে থাকলেও সেটা  বোঝা যাবে না। 

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের জিনগত পরিবর্তন হচ্ছে। আগের যুগের জলবায়ু আর এখনকার যুগের জলবায়ু এক না। এখন নারীরা অনেক ঝুঁকিতে থাকেন। তাই মা বা নানি যে যাই বলুন না কেনÑ একজন নারীর অবশ্যই চেকআপের মধ্যে থাকতে হবে। সেই মায়ের অনেক রকম অটোম্যাটিক ডিজিজ আছে কি না, দেখতে হবে। জিনগত ত্রুটি হচ্ছে সারাজীবনের। পেশাদার কাজের মানুষ নন, এমন মাকেও পরীক্ষা করাতে হবে। যদি তার পরিবারের কারও রক্তচাপ থাকে, দেখতে হবে তার হৃদরোগ আছে কি না। হুটহাট করে গর্ভধারণের যুগ এটি না।

এক অনুষ্ঠানে বারডেমের অধ্যাপক ডা. টি. এ. চৌধুরী বলেন, মাতৃমৃত্যুর হার যদি কমিয়ে আনতে হয়, তাহলে একটাই উপায়Ñ প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারির ব্যবস্থা করা। ঘরে ডেলিভারি করাতে গিয়ে অনেক সময় নষ্ট হয়। এ ক্ষেত্রে রোগীর ক্ষতি হয়ে যায়। আমরা দেখি, যেসব রোগী হাসপাতালে আসেন, তাদের অধিকাংশ মরণাপন্ন অবস্থায় আসেন। যেখান থেকে রোগীর ফিরে আসার সম্ভাবনা কম থাকে। শ্রীলংকায় মাতৃমৃত্যুর হার খুবই কম এবং সেখানে প্রায় শতভাগ ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানে হয়। 

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে-২০২২ (বিডিএইচএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে দরিদ্র নারীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী, নারীদের ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তুলনায় ধনীদের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে সেবা গ্রহণের মাত্রা ছয় গুণ বেশি ছিল। ২০২২ সালে এসে এখনও তা দ্বিগুণ। ৮৮ শতাংশ নারী অন্তত একবার একজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে গর্ভকালীন বা এএনসি সেবা গ্রহণ করেছেন, যা ২০১৭ সালে ছিল ৮২ শতাংশ। কিন্তু কোভিড চলাকালীন চারবারের বেশি গর্ভকালীন সেবা বা এএনসি গ্রহণ করেছেন খুব কম নারী।

দেশে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে সিজারে সন্তান জন্মদান। স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালকেন্দ্রিক প্রসব বাড়ার কারণে সি-সেকশন বা সিজারিয়ানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২২ সালে সিজার বৃদ্ধি পেয়ে ৩৪ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সিজারের বেশিরভাগই হয়েছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। ২০২২ সালে দেশের মোট সিজারে জন্মদানের ৮৪ শতাংশই হয়েছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। এ ছাড়া ১৪ শতাংশ হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে। বাকি ২ শতাংশ হয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিওতে)।

২০২২ সালে বাংলাদেশে মোট ৩৭ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। এর মধ্যে ১৬ লাখ শিশু সিজারের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করে। ২০২২ সালে ঘরে শিশু জন্মদান হয়েছে ১২ লাখ ৬২ হাজার ৩২৪ জন, সরকারিতে ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৪৩৮ জন, বেসরকারি হাসপাতালে ১৬ লাখ ৩১ হাজার ২৫৫ জন ও এনজিওতে ৬১ হাজার ৪৮৯ জন। তাদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে সিজার হয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৮ জনের। বেসরকারিতে ১৩ লাখ ৫৩ হাজার ৯৪২ জনের সিজার হয়েছে। এ ছাড়া এনজিওতে সিজার হয়েছে ২২ হাজার ১৩৬ জনের।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা