আলাউদ্দিন আরিফ ও সৈয়দ ঋয়াদ
প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৩ ১১:১৪ এএম
আপডেট : ২৪ মে ২০২৩ ১১:২৮ এএম
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়। প্রবা ফটো
বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদারের একটি মামলার রায় হতে পারে আগামী দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে। ২৭৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের এ মামলায় তার সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।
ইতোমধ্যে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ, বাদী ও সাক্ষীদের জেরা প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু আর্গুমেন্ট বাকি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
পিকে হালদার ভারতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের আলিপুর কারাগারে আছেন। অর্থপাচার ও আত্মসাতের অভিযোগে পিকে হালদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যে ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি প্রথম মামলাটি করেন দুদকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী।
মামলাটি তদন্ত করেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. সালাহ উদ্দিন। ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর কমিশন সভায় অনুমোদনের পর ১৪ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে ৫৬ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ঢাকার বিশেষ জজ-১০ মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের আদালতে শুরু হয় বিচার কার্যক্রম।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, এ মামলায় মোট ১০৮ জন সাক্ষী দিয়েছেন। আদালতে সাক্ষীদের জেরা সম্পন্ন হয়েছে।
পিকে হালদার ও তার প্রায় ১০০ সহযোগীর বিরুদ্ধে দুদকের অপর ৩৫টি মামলার তদন্ত এখনও চলছে। বিভিন্ন দেশে পাঠানো মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্টসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত না পাওয়ায় মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে বলে জানান তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তিনি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফিন্যান্সসহ বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন।
পিকে হালদারের বিরুদ্ধে দায়ের করা প্রথম মামলার ১৪ আসামির মধ্যে ১০ জনই পলাতক। তারা হলেন-- পিকে হালদার, তার মা লীলাবতী হালদার, সহযোগী পূর্ণিমা রানী হালদার, উত্তম কুমার মিস্ত্রি, অমিতাভ অধিকারী, প্রিতীশ কুমার হালদার, রাজিব সোম, সুব্রত দাস, অনঙ্গ মোহন রায় ও স্বপন কুমার মিস্ত্রি।
বাংলাদেশে কারাবন্দি আসামিরা হলেন-- পিকে হালদারের বান্ধবী অবন্তিকা বড়াল, সহযোগী শংখ বেপারী, পিকে হালদারের আয়কর আইনজীবী সুকুমার মৃধা ও সুকুমারের মেয়ে অনিন্দিতা মৃধা।
দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, মামলার অন্যতম আসামি পিকে হালদারের আয়কর আইনজীবী সুকুমার মৃধা অর্থপাচারে সহযোগিতা করতে বিভিন্ন জাল কাগজপত্র তৈরি, নামসর্বস্ব কোম্পানি গঠন, ভুয়া জাতীয়পত্র তৈরিসহ যাবতীয় জালিয়াতির হোতা। মামলার শুনানিকালে তিনি দফায় দফায় সাক্ষী ও তদন্ত কর্মকর্তাকে বিভ্রান্ত করে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. সালাহ উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মামলায় ১০৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে আমাকেও দফায় দফায় জেরা করা হয়েছে। জেরা প্রায় শেষ। এখন রায়ের অপেক্ষা। আশা করছি, সকল আসামির সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত হবে।
দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্রশান্ত কুমার হালদারসহ আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা ও অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২৭৪ কোটি ৯১ লাখ ৫৫ হাজার টাকার সম্পদ অর্জন করেন। পরে তারা সেই সম্পদ দখলে রেখে অবৈধভাবে ভোগ করেন।
আসামিরা ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৭ (১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করার বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া তার ওই অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ উৎস, প্রকৃতি, অবস্থান, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ, উৎস গোপন বা আড়াল করার লক্ষ্যে স্থানান্তর-হস্তান্তর করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২-এর ৪ (২), ৪ (৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করার প্রমাণ মিলেছে।
দুদকের আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সাক্ষীদের জেরা শেষ পর্যায়ে। এখন আর্গুমেন্ট বাকি। এর জন্য মাস দেড়েক সময় লাগতে পারে। আমরা আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। আইনের ধারা অনুযায়ী আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেছি। আশা করছি, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত আইন অনুযায়ী আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করবেন।
তিনি আরও জানান, পিকে হালদারের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪ (২), ৪ (৩) ধারায় ১২ বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড ও দুদক আইন ২০০৪-এর ২৭ (১) ধারায় ১০ বছর কারাদণ্ড চেয়েছি। পিকে ছাড়া অপর আসামিদেরও ৩ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে।
গত বছর মে মাসে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও দুদক পিকে হালদারকে গ্রেপ্তারে ভারত সরকারকে অনুরোধ করে। ওই মাসেই উত্তর চব্বিশ পরগনার অশোকনগর থেকে পিকে হালদার, গণেশ হালদার, স্বপন মৈত্র, উত্তম মৈত্র, ইমাম হোসেন, আমানা সুলতানাকে (শর্মী হালদার) গ্রেপ্তার করে ভারতের অর্থ-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)।
ইতোমধ্যে পিকে হালদারসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগে একটি মামলার পর ভারতের আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে ইডি। কলকাতার স্পেশাল সিবিআই কোর্ট ৩-এ মামলাটির বিচার চলছে।
পিকে হালদারকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তাকে ফিরিয়ে আনার যাবতীয় প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’