ঘূর্ণিঝড় মোখা
নুপা আলম ও ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৩ ২১:২২ পিএম
আপডেট : ১৫ মে ২০২৩ ২২:০৩ পিএম
ঘূর্ণিঝড় মোখার আঘাতে সেন্টমার্টিনের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘর সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। প্রবা ফটো
ঘূর্ণিঝড় মোখার তাণ্ডবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজারের কৃষি। জেলার টেকনাফ উপজেলা ও সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাড়িঘর উড়ে গেছে, ভেঙে গেছে গাছপালা। জেলায় কৃষিতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে টেকনাফে পানচাষিদের ক্ষতি হয়েছে সাড়ে ৩ কোটি টাকা। সেন্টমার্টিনের ৭৫ শতাংশ গাছপালা ভেঙে গেছে। মাঠে কাজ করার সময় কয়েকজন মারা গেছেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ২ হাজার ৮০০ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেন্টমার্টিনের ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কক্সবাজারে কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলেও খাদ্যসংকট তৈরি হবে না। কারণ ঘূর্ণিঝড়ের আগেই সবাই বোরো ফসল ঘরে তুলেছেন।
টেকনাফের সাবরাং এলাকার পানচাষি গফুর উদ্দিন জানিয়েছেন, তার পানের বরজ পুরোটাই ভেঙে গেছে। যার ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ২০ লাখ টাকা।
ঘূর্ণিঝড়ে কৃষি খাতে ক্ষতি সম্পর্কে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক কবির হোসেন। তিনি বলেন, অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় মোখার আঘাতে জেলার কৃষিতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার একটি প্রতিবেদন তৈরি করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ৩ হাজার ৫২০ জন কৃষকের কৃষি খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। তার মধ্যে ১ হাজার ৭০ জন পানচাষির ক্ষতি ৩৮৯ কোটি টাকা, ২ হাজার ৪৫০ জন গ্রীষ্মকালীন সবজিচাষির ক্ষতি হয়েছে ৭৫৫ কোটি টাকা। জেলাটিতে মোট ফসলি জমির পরিমাণ ৭ হাজার ৮০৯ হেক্টর, সেখানে মোখায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০ হেক্টর। আংশিক ক্ষতি ২৯৬ হেক্টর, যা ৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আংশিক ক্ষতিকে সম্পূর্ণ ক্ষতিতে রূপান্তর করলে তা দাঁড়ায় ৮৩ দশমিক ৮২ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মোখার তাণ্ডবে গ্রীষ্মকালীন জমির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি। আক্রান্ত হয়েছে ১৬২ দশমিক ৫ হেক্টর জমি। তাতে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হেক্টর ও আংশিক ক্ষতি ১৫২ দশমিক ৫ হেক্টর জমি। শতকরা হিসাবে ৪ দশমিক ৬২ ও আংশিক ক্ষতি ৪৫ দশমিক ৯৪ হেক্টর জমি। টাকার অঙ্কে ৭৫৫ কোটি টাকা। আর পান চাষাবাদে প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। কেননা এবার ৩ হাজার হেক্টর জমিতে পান চাষ করা হয়েছে। আক্রান্ত জমির পরিমাণ ১৮৩ দশমিক ৫ হেক্টর। সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ৪০ হেক্টর। আংশিক ক্ষতি ১৪৩ দশমিক ৫ হেক্টর। আংশিক ক্ষতি শতকরা হিসাবে ৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আংশিক ক্ষতি সম্পূর্ণ ক্ষতিতে রূপান্তর করলে তা দাঁড়ায় ৩৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আর টাকার অঙ্কে তা ৩৮৯ দশমিক ৪২ কোটি টাকা।
ঘূর্ণিঝড় মোখার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন একটি পরিবারের সদস্যরা।
কক্সবাজার জেলার টেকনাফের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাকিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ’অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় মোখায় আমশূন্য হয়ে পড়েছে টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন। জেলার আমগাছগুলোর প্রায় সব আম ঝড়ে পড়ে গেছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে গ্রীষ্মকালীন শাকসবজিরও। উপজেলাটিতে ১৬০ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হেক্টর জমি। আংশিক ক্ষতি হয়েছে ১৫০ হেক্টর জমির। এ ক্ষতি টাকার হিসাবে প্রায় ৭ কোটি টাকা।’
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর (অব.) মোহাম্মদ নুরুল আবছার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ’কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন ও কুতুবদিয়ায় ঘূর্ণিঝড় মোখায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। যদিও বিপুল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল।’
লবণের মাঠে কাজ করতে গিয়ে ৩ শ্রমিকের মৃত্যু
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ঘূর্ণিঝড় মোখার সময় লবণের মাঠে কাজ করতে গিয়ে তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার (১৪ মে) রাতে তাদের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন হোয়ানক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মীর কাশেম চৌধুরী। তারা হলেন, উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নের কালাগাজিরপাড়া গ্রামের আবুল ফজলের ছেলে রিদোয়ান (৩৫), পানিরছড়া গ্রামের আকতার কবিরের ছেলে মুহাম্মদ নেছার (৩২) ও পানিরছড়া বারঘরপাড়ার মৃত মতিনের ছেলে আনছার।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ২ হাজার ৮০০ ঘর ক্ষতিগ্রস্ত
মোখার আঘাতে কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ২ হাজার ৮২৬টি ঘর ছাড়াও লানিং শেল্টার, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৭ রোহিঙ্গা নানাভাবে আহতও হন। কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ক্ষতির প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানানো হয়েছে।
ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় দ্বীপবাসী
সোমবার বিকাল ৫টার দিকে দেখা যায়, দ্বীপের ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের মালিকরা কিছুটা ভাঙা অংশ সংস্কারে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বাজারের কয়েকটি দোকানও খুলেছে। প্রয়োজনীয় মালামাল বা উপকরণ কিনছেন মানুষ।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জানান, দ্বীপের পশ্চিমপাড়া, উত্তরপাড়া, কোনারপাড়া, গলাচিপা, মাঝেরপাড়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পশ্চিমপাড়া এলাকার রফিকুল হুদা নামের এক জেলে জানান, সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। স্ত্রী, তিন সন্তান নিয়ে সংসার। ঘূর্ণিঝড়ের সময় আশ্রয় কেন্দ্রে ছিলেন। ফিরে এসে দেখেন ঘরটি ভেঙে গেছে।
এসএসসির স্থগিত পরীক্ষা ২৩ মের পর : শিক্ষামন্ত্রী
মোখার কারণে স্থগিত হওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাগুলো ২৩ মের পর অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। তিনি বলেন, ‘স্থগিত এই পরীক্ষার দিন-তারিখ ও সময়সূচি কিছু দিনের মধ্যেই জানানো হবে। বিষয়টি আন্তঃবোর্ড সমন্বয় কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সোমবার রাজধানীর সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বঙ্গবন্ধু সৃজনশীল মেধা অন্বেষণের জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।
মোখায় সরকারের সফলতা দেখছেন দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী
অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় মোখায় দেশে কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটাকে সরকারের সফলতা বলে মনে করছেন দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। তিনি বলেন, ’সেন্টমার্টিনে ১ হাজার ২০০ ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো প্রাণহানি হয়নি। এটা সফলতা। সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।