ভারত মহাসাগর সম্মেলন
রাশেদ মেহেদী
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৩ ২১:৪০ পিএম
আপডেট : ১৩ মে ২০২৩ ২২:১৯ পিএম
ষষ্ঠ ভারত মহাসাগর সম্মেলনে অতিথিরা।
নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত করার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে শনিবার (১৩ মে) ঢাকায় শেষ হয়েছে ষষ্ঠ ভারত মহাসাগর সম্মেলন।
সমাপনী অধিবেশন শেষে শনিবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, এবারের আয়োজন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। কারণ এ অঞ্চলের ৪০টি দেশের প্রতিনিধিরা এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। তারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন। অসুস্থ থাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
একজন সাংবাদিক জানতে চান, যে মুহূর্তে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের জন্য বিশ্ব রাজনীতির দুটি পক্ষের মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা চলছে সে সময় ঢাকায় বড় মাপে এই আয়োজন করে কী পেল বাংলাদেশ?
জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘সম্মেলনে অংশ নিয়ে ভিয়েতনামের প্রতিনিধি বলেছেন, ভিয়েতনামও চায় এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য জোটনিরপেক্ষ অবস্থা। অর্থাৎ এবারের ঢাকা সম্মেলনেরে মধ্য দিয়ে দুই পক্ষ নয়, বহুপক্ষীয় এবং জোটনিরপেক্ষ যৌথ উন্নয়ন প্রচেষ্টার মতামত জোরালো হয়েছে, যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।’
পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, ৪০টি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মতবিনিময়ের সুযোগ পেয়েছেন। এটাও বড় একটা অর্জন। আর এত বড় আয়োজন তো কূটনৈতিক সাফল্য বটেই। অপর এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সম্মেলনে ঢাকার চীনা দূতাবাসের দুজন কর্মকর্তা অংশ নিয়েছেন। সম্মেলনে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শুধু মিয়ানমারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে তিনি জানান।
সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর এই মুহূর্তে প্রিমিয়ার প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে ভারত মহাসাগর সম্মেলন। বর্তমান বাস্তবতায় এটা সবার কাছেই পরিষ্কার যে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর যৌথ উন্নয়ন প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। সেই যৌথ প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতেই এবারের সম্মেলনে যোগাযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও নিরাপত্তার ইস্যুগুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশ এ অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এ কারণে ঢাকায় এবার সম্মেলনের স্থান নির্বাচনও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্ব ঐতিহাসিক অটুট বন্ধনের দ্বারা স্বীকৃত। ভারত সব সময় বাংলাদেশের সঙ্গে আছে।
ষষ্ঠ ভারত মহাসাগর সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে শনিবার পাঁচটি থিমেটিক সেশন হয়। এসব সেসনে অংশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের উপমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরম্যান বলেন, ইন্ডিয়ান ওশান অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে সহযোগিতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক গড়ে তুলতে চায় এবং এ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
জাপানের পররাষ্ট্র দপ্তরের পার্লামেন্টারি ভাইস চেয়ারম্যান তাকাগি গেই সম্মেলনে অংশ নিয়ে বলেছেন, জাপান ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের উন্নয়নে বহু বছর আগে থেকেই সম্পৃক্ত। এ মুহূর্তে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং যৌথ নিরাপত্তার ইস্যুকেই গুরুত্ব দিচ্ছে জাপান।
ভিয়েতনামের উপপ্রধানমন্ত্রী দু হুয় ভিয়েত বলেন, ভিয়েতনাম ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি জোট নিরপেক্ষ অবস্থা দেখতে চায়। এ অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি দেখতে চায় না ভিয়েতনাম।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নারায়ণ প্রকাশ সৌদ বলেন, নেপাল ল্যান্ড লক দেশ থেকে ল্যান্ড লিংক দেশ হতে চায়। নেপাল এখন পাহাড় থেকে সমুদ্রে কানেক্টিভিটি এগিয়ে নিতে কাজ করছে। এ জন্যই এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে নেপাল।
প্লেনারি সেশনে ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তান্দি দর্জি বাংলায় বলেন, ‘আমি বাংলাদেশে ফিরে এসেছি। খুব ভালো লাগছে। ভুটান সমুদ্রবেষ্টিত দেশ না হলেও সমুদ্রবেষ্টিত দেশগুলোর ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী।’
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ বদর বিন হামাদ বিন হামুদ আলবু সাইদি সম্মেলনে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে বলেন, ওমান সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে চায়। তথ্য বিনিময়, সন্ত্রাসবাদ, পাচার প্রতিরোধে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একযোগে কাজ করতে চায়।
ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য এএম জে আকবর বলেন, এ প্ল্যাটফর্ম আরও কার্যকর করতে এবারের সম্মেলন ভূমিকা রাখবে।
দ্বিতীয় দিনের সম্মেলনে অংশ নেওয়ার ফাঁকে প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাইড লাইনে অস্ট্রেলিয়ার সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাপানের ভাইস মিনিস্টার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহকারী মন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রতিমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের রাষ্ট্রে নিয়ে যেতে চাই। এর জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা বিশেষ করে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্ডিয়ান ওশান অঞ্চলের দেশগুলোর সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, অস্ট্রেলিয়ায় একজন বাংলাদেশি ছাত্র নিহত হয়েছে। এ ঘটনার যেন ন্যায়বিচার হয় সেজন্য অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধির প্রতি আহবান জানানো হয়েছে।
গত ১২ মে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই দিনের ষষ্ঠ ভারত মহাসাগর সম্মেলন উদ্বোধন করেন। করোনা ভাইরাস-পরবর্তী অবস্থা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘পিস, প্রসপারেটি অ্যান্ড পার্টনারশিপ ফর আ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’।
এর আগে শুক্রবার চারটি প্রি-কনফারেন্স প্লেনারি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। শনিবার সমাপনী বক্তব্য দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। সপ্তম ভারত মহাসাগর সম্মেলন আগামী বছর অষ্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে বলে সমাপনী অধিবেশনে জানানো হয়।