রাশেদুল হাসান
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৩ ১১:০১ এএম
আপডেট : ০৮ মে ২০২৩ ১৪:১৫ পিএম
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট যানবাহনের অন্তত ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক মোটরযানে রূপান্তর করতে চায়। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধের লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বৈদ্যুতিক মোটরযানগুলোকে সড়কে চলাচলের জন্য নিবন্ধন ও রুট পারমিট দেওয়া হবে।
বৈদ্যুতিক মোটরে চার্জ বা সংযুক্ত রিচার্জেবল ব্যাটারির সাহায্যে চালিত থ্রি-হুইলার, বাস ও মোটরসাইকেল এই নিবন্ধন ও পারমিট পাবে। তবে বাইকেল, রিকশা ও রিকশা ভ্যান এর আওতায় পড়বে না। এ ছাড়া সড়কে চলাচল করা বিদ্যুৎচালিত ইজিবাইক, নছিমন বা করিমন, ভটিভটি ধরনের যানগুলো নিরাপদ মডেল অনুসরণ করলে তারাও নিবন্ধন পাবে।
বৈধতা পেলেও যেসব ইলেকট্রিক মোটরযানের গতি ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের কম, সেসব যানবাহন জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে চলাচল করতে পারবে না। এ ছাড়া নিবন্ধন ব্যতীত ডিলার, এজেন্ট, আমদানিকারক, স্থানীয় প্রস্তুতকারী ও উৎপাদনকারীরা ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার ও মোটরসাইকেল ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন না।
গত ৪ মে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ‘ইলেকট্রিক মোটরযান রেজিস্ট্রেশন ও চলাচল সংক্রান্ত নীতিমালা’ সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। এর আগে গত ৪ এপ্রিল এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন হয়।
বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বর্তমানে সড়কে যেসব ইজিবাইক, নছিমন বা করিমন ও ভটভটি চলে, সেগুলো যদি আমাদের নিরাপদ মডেল অনুযায়ী তৈরি হয় তবে তা নিবন্ধন ও রুট পারমিট পাবে। কিন্তু বর্তমানে সড়কে চলা যানবাহনের বেশিরভাগ কাস্টমাইজড। চায়নার নিম্নমানের গাড়ি। কেউ যদি নিবন্ধনের জন্য নিয়ে আসে, তখন কারিগরি নির্দেশ অনুযায়ী উত্তীর্ণ হলে নিবন্ধন পাবে। তবে বিদেশি কোনো বিখ্যাত কোম্পানির থ্রি-হুইলারের পরিবর্তন না করলে অথবা যেগুলো কাস্টমাইজ করা হয়েছে সেগুলো নিরাপদ মডেলে রূপান্তর করলে আমরা সরাসরি নিবন্ধন দিয়ে দেব।’
থ্রি-হুইলারের কারিগরি বিনির্দেশ তৈরি হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল এটি প্রণয়নে কাজ করছে। নীতিমালায় পরিবহন খাত থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ২০৩০ সালে দেশে ব্যবহৃত যানবাহনের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ ইলেকট্রিক মোটরযান ক্যাটাগরিতে রূপান্তর করা প্রয়োজন। এ উদ্দেশ্যে সরকার আগামী জুনে ১০০ বৈদ্যুতিক বাস আনছে ঢাকায়।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এসএম সালেহ উদ্দিন মনে করেন, এ যানবাহনে দুর্ঘটনা ও পরিবেশদূষণ দুটিই বাড়তে পারে।
নীতিমালায় মোটরযানের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, মোটরযান শনাক্তকরণের জন্য বডি বা ফ্রেমে আন্তর্জাতিক যানবাহন শনাক্তকরণ নম্বর কোড অনুযায়ী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক খোদাইকৃত নির্ধারিত ডিজিটের চেসিস নম্বর এবং শনাক্তকরণের বডিতে প্রস্তুতকারক কর্তৃক খোদাইকৃত নির্ধারিত ডিজিটে স্পষ্ট মোটর নম্বর থাকতে হবে।
নিবন্ধন পদ্ধতিতে বলা হয়েছে, ইঞ্জিনচালিত মোটরযানের প্রচলিত রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি অনুযায়ী ইলেকট্রিক মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং এর রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট এবং ট্যাক্স টোকেন, রুট পারমিট যে ফরম্যাটে দেওয়া হচ্ছে, ইলেকট্রিক মোটরযানের ক্ষেত্রে একই ফরম্যাট ব্যবহারযোগ্য কর্তৃপক্ষ বা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি সংশ্লিষ্ট এলাকার জন্য নির্ধারিত সিলিং অনুযায়ী ইলেকট্রিক মোটরযান রেজিস্ট্রেশন দেবে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ বা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি ইলেকট্রিক মোটরযানকে অগ্রাধিকার দেবে।
রুট পারমিট দেওয়ার ক্ষেত্রে এ সংক্রান্ত প্রচলিত নিয়ম প্রযোজ্য হবে এবং মোটরযানের ব্যাটারির চার্জ ধারণক্ষমতা, চার্জিং অবকাঠামোগত সুবিধা বিবেচনা করতে হবে। রুট পারমিট দেওয়ার ক্ষেত্রে জেলা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটিকে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। সরকার বৈদ্যুতিক মোটরযানের ভাড়া নির্ধারণ করতে পারবে।
ইলেকট্রিক মোটরযান চলাচলের সময় রেজিস্ট্রেশন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, রুট পারমিট, ফিটনেস সার্টিফিকেট, ট্যাক্স টোকেন, ট্রাস্টি বোর্ডের আর্থিক সহায়তা তহবিলে জমাকৃত অর্থের রসিদ বা প্রত্যয়নপত্র ইত্যাদি কাগজপত্র মোটরযানের সঙ্গে রাখতে হবে।
সরকার মোটরযান টেস্টিংয়ের জন্য এককভাবে অথবা বেসরকারি খাতের সঙ্গে যৌথভাবে টেস্টিং ও রিসার্চ ল্যাব স্থাপন করবে এবং ধীরগতিসম্পন্ন বৈদ্যুতিক মোটরযানের চালকদের প্রশিক্ষণ দেবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ সালেহ উদ্দিন আরও বলেন, ‘থ্রি-হুইলার হিসেবে যদি নসিমন বা করিমন পড়ে, সেটা কখনও মোড অব ট্রান্সপোর্ট হতে পারে না। পঙ্গু হাসপাতালে গেলে দেখা যায়, দেশের বেশিরভাগ সড়কে দুর্ঘটনার কারণ এ যানবাহন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করছি বৈদ্যুতিক গাড়ি এলে পরিবেশের উন্নয়ন হবে। কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা কমবে। কিন্তু যখন এ যানের চাহিদা বেড়ে যাবে, তখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। আর বিদ্যুৎ তো জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে উৎপাদন করা হচ্ছে। এ ছাড়া এসব গাড়িতে যে ব্যাটারি ব্যবহার করা হয় তা খুবই ভয়ংকর। এ গাড়ির ব্যাটারি নদী ও খালে ফেলে দেওয়া হয়। ফলে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় হচ্ছে।