প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৩ ২০:০০ পিএম
আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৩ ২০:১৮ পিএম
ডাক্তাররা যখন গ্রামবিমুখ, তখন তাদের গ্রামমুখী করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। দেশের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ও জাতীয় ঔষধনীতিসহ জনগণের দোড়গোরায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কাজ করে গেছেন আজীবন। সোচ্চার ছিলেন সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। মূলত জনগণের মধ্য থেকে জনগণের স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধান করার কাজ করে গেছেন তিনি।
রবিবার (৩০ এপ্রিল) ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে (ডিআরই) স্বাস্থ্য আন্দোলন আয়োজিত ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্য দেন কবি ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মাজহার। তিনি বলেন, ’জাফর ভাই নানাভাবে আমাদের অনুপ্রাণিত করতে থাকবেন, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তবে তার সঙ্গে সপ্রাণ সম্পর্ক জারি রাখার সবচেয়ে ভালো পথ হচ্ছে তার কাজের তাৎপর্য নিষ্ঠার সঙ্গে অনুধাবন করার চেষ্টা করা। বিশেষত তার কাজের সর্বজনীন দিকগুলোকে সমসাময়িকতার বাইরে দূরদর্শী ভবিষ্যতের জায়গা থেকে বোঝা খুবই জরুরি। বিশেষত স্বাস্থ্য আন্দোলনের গতিমুখ ও প্রধান কাজের ক্ষেত্র নির্ণয়ের জায়গাগুলো স্পষ্ট করে তোলা দরকার।’
স্বাস্থ্যসেবায় জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ’স্বাস্থ্য আন্দোলনে কোন ক্ষেত্রগুলোর ওপর আমরা বিশেষভাবে জোর দেব, সে বিষয়ে গুছিয়ে ভাবতে পারার সামর্থ অর্জন করাটা তাকে সম্মানিত করবার সঠিক পথ। তার সাধারণ কাজের নীতি ছিল জনগণের সঙ্গে থাকা, তাদের বাস্তব সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে বোঝার চেষ্টা করা এবং কোনো গণবিচ্ছিন্ন ‘এক্সপার্ট’ দিয়ে নয়, জনগণকে নিয়েই তার সমাধান বের করা।’
ফরহাদ মাজহার বলেন, ’বিশেষজ্ঞতার দরকার আছে, কিন্তু গণবিচ্ছিন্ন বিশেষজ্ঞতা জ্ঞান এবং জ্ঞানের সামাজিক উপযোগিতার মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান তৈরি করে, তাকে কাটিয়ে ওঠা খুবই কঠিন। তিনি ওষুধনীতির ক্ষেত্রে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু ডাক্তার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বড় একটা অংশ তার বিরোধিতা করেছিলেন। বাংলাদেশে তার উদ্যোগে তৈরি স্বাস্থ্যনীতি ব্যর্থ হওয়ার কারণ মূলত বিশেষজ্ঞদের বিরোধিতা। কিন্ত জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমৃত্যু গণমানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন।’
তিনি বলেন, ’বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি (১৯৯০) ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞদের বিরোধিতার মুখে পঙ্গু হয়ে গিয়েছে। তাই গণমানুষের সঙ্গে থাকা এবং জনগণকে নিয়েই জনগণের সমস্যা সমাধানের নীতি পপুলিজম না। জনগণের মধ্যে থেকে জনগণের বাস্তব সমস্যার সমাধান কথাটা বলা সহজ, কিন্তু তাৎপর্যের দিক থেকে ভীষণ ভারী। এই অতি সাধারণ অথচ বিপ্লবী মর্মসম্পন্ন চিন্তাই জাফরুল্লাহ চৌধুরী সারা জীবন চর্চা করে গিয়েছেন।‘
ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কাজী কামরুজ্জামান বলেন, ’জাফরুল্লাহ নেই, তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কোনোভাবেই যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তার কাজগুলো যেন আরও ভালো করে চলতে থাকে, সে লক্ষ্যে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ডা. জাফরুল্লাহ কোনো শিল্পপতি ছিল না, কিন্তু অনেক শিল্পের আইডিয়া তার কাজ থেকে এসেছে। তার প্রতিষ্ঠিত ফার্মাসিউটিক্যালস দেশের অন্যান্য ফার্মাসিউটিক্যালসগুলোর জন্য আদর্শ মডেল হিসেবে কাজ করেছে।’
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের এপিডেমিওলজি ও রিসার্চের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ’’ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রতিবাদ করতেন, ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতেন। তিনি ছিলেন খুবই দূরদর্শী একজন মানুষ। তার চিন্তা-চেতনা ছিল খুবই তীক্ষ্ণ। আমরা এখন ধূমপান প্রতিরোধে কাজ করছি, তামাক বন্ধে আন্দোলন করছি। কিন্তু আশির দশকেই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তামাক ও ধূমপানের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন এবং নিজ অবস্থান থেকে কঠোর পদক্ষেপ নিতেন। সেই সময়ে দেখতাম গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে সেখানে লিখে দেওয়া হতো ‘ধূমপায়ীদের আবেদন করার প্রয়োজন নেই’।’’
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ছেলে বারিশ চৌধুরী বলেন, ’বড় হওয়ার পর বাবা আমাকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষত প্রত্যন্ত গ্রাম ও চরাঞ্চলে নিয়ে যেতেন। যেখানে দুই-এক দিনের জন্য মেডিকেল ক্যাম্প করা হতো। সাধারণত কারও বাড়িকে করা হতো প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র। রান্নাঘরকে বানানো হতো অপারেশন থিয়েটার। চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত থাকা এই মানুষগুলোকে সেবা করতে পেরে বাবা খুব খুশি হতেন।’
তিনি বলেন, ’বাবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উদ্যোগগুলো তখন সফল হবে, যখন মানুষ বিদেশে না গিয়ে দেশেই চিকিৎসা নেবে। তিনি বলতেন, যে দেশের মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীরা চেকাপের জন্য বিদেশে যায়, সে দেশের স্বাস্থ্য খাতের কোনো দিন উন্নতি হবে না।‘
স্বাস্থ্য আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদা আখতারের সঞ্চালনা ও ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালের চেয়ারম্যান ড. কাজী কামরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন জাতীয় কমিটির সভাপতি ড. রশিদ-ই-মাহবুব, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. লেনিন চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. এম মুশতাক হোসেন, নারী স্বাস্থ্য প্রকল্পের পরিচালক সামিয়া আফরীন প্রমুখ।