প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৩ ২১:৩৭ পিএম
আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৩ ২১:৫৫ পিএম
ছয় দশকের রাজনৈতিক সহচর, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিরবিদায় নিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। মঙ্গলবার (২৫ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর পোস্তগোলা শ্মশানে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিজনদের ভাষ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো পঙ্কজ ভট্টাচার্যের প্রয়াণে।
রবিবার (২৩ এপ্রিল) দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতাল হেলথ অ্যান্ড হোপে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন পঙ্কজ ভট্টাচার্য। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তিনি সেপটিক শক, নিউমোনিয়া, শ্বাসতন্ত্রীয় রোগ (ব্রংকিয়াক্টিয়াসিস), উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। রবিবার রাত থেকে পঙ্কজ ভট্টাচার্যের মরদেহ রাখা হয়েছিল শমরিতা হাসপাতালের হিমঘরে।
মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালের হিমঘর থেকে তার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসেন তার পরিবার ও দল ঐক্য ন্যাপের শীর্ষ নেতারা। প্রথমে ঐক্য ন্যাপ ও পরে জাতীয় পতাকায় মুড়ে দেওয়া হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা পঙ্কজ ভট্টাচার্যের মরদেহ। এ সময় ঢাকা জেলা প্রশাসন তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান (গার্ড অব অনার) প্রদান করে। এতে নেতৃত্ব দেন ঢাকা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট একেএম হেদায়েতুল ইসলাম। এ সময় ডিএমপির একটি চৌকস দল বিউগলে করুণ সুর তোলে। পঙ্কজ ভট্টাচার্যের স্বজন, রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের অনেকের চোখ এ সময় অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।
ঐক্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ তারেকের নেতৃত্বে দলটির নেতারা প্রথমে ফুলেল শ্রদ্ধা জানায় পঙ্কজ ভট্টাচার্যের মরদেহে। পরে অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সদস্যরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ঐক্য ন্যাপের আয়োজনে শ্রদ্ধা জানাতে আসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন।
পঙ্কজ ভট্টাচার্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসে তার বর্ণাঢ্য জীবনের নানা অধ্যায়ের স্মৃতিচারণ করেন রাজনীতিবিদ, নাগরিক ব্যক্তিত্বরা।
তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে প্রগতিশীল রাজনীতিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক যে আদর্শ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন পঙ্কজ ভট্টাচার্য, জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে, শত প্রলোভনেও সেই আদর্শ থেকে কখনও বিচ্যুত হননি তিনি। প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবিচল রাজনীতির এই মহীরুহ মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক এক দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন আমৃত্যু।
গণফোরামের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর দলটির সভাপতি ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘পঙ্কজ ভট্টাচার্য সারা জীবন মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সামনে থেকে লড়াই করেছেন। আর সেই পথে তিনি ছিলেন আপসহীন। তিনি অনন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের নেতৃত্বে দলটির নেতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তার সঙ্গে ছিলেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্য-সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী পরে তার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘সত্যিকারের রাজনীতিবিদ কেমন হওয়া প্রয়োজন, তার উদাহরণ হলেন পঙ্কজ ভট্টাচার্য। সারা জীবন তিনি গণমানুষের রাজনীতি করেছেন। তার রাজনৈতিক জীবন থেকে অনেক কিছু শেখার আছে আজকের প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান ও যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের নেতৃত্বে দলটির নেতারা শ্রদ্ধা জানান পঙ্কজ ভট্টাচার্যের মরদেহে।
আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর পঙ্কজদার যুদ্ধ থেমে যায়নি। তিনি মুক্তির যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। বামপন্থি রাজনৈতিক ঐক্যে বিভেদ তৈরি হলেও তিনি আবারও সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তার মৃত্যু গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।’
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের শাসনবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার যে আন্দোলন তিনি শুরু করেছিলেন, আমৃত্যু মানুষের জন্য ওই আন্দোলন তিনি করে গেছেন।’
সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘আমৃত্যু তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে, নতুন সৃষ্টির নায়ক হিসেবে তিনি থেকে যাবেন।’
বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘ছাত্রাবস্থাতেই তিনি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে নিজেকে জড়িয়েছিলেন, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সেখানে নিজেকে জড়িত রেখেছেন। এখানেই তার জীবনের সার্থকতা।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া কবির বলেন, ‘রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার সময় অনেকের মতো তিনি মুখস্থ বুলি আওড়াতেন না। আলোচনার কোন দিকে রেজাল্ট কী হবে, কোন ইস্যুটাকে সামনে আনা দরকার, এসব তিনি খুব ভালো জানতেন।’
নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, ‘কিশোর বয়স থেকে যে বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে পঙ্কজ ভট্টাচার্য তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন, নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে সেই বিশ্বাসকে ধরে রেখে তারা কাজ করে গেছেন। ওই একটি জেনারেশন চলে যাচ্ছে, এটি গভীর দুঃখের। আজকের জেনারেশন স্থির থাকছে না, তারা ভীষণ অস্থির। আর এর ফল হচ্ছে অস্থির রাজনীতি।’
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক জোট, জাসদ, বাংলাদেশ জাসদ, গণফোরাম (মন্টু), কমিউনিস্ট কেন্দ্র, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ, গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানী অনুসারী পরিষদ, পিপলস পার্টি শ্রদ্ধা জানায় পঙ্কজ ভট্টাচার্যের মরদেহে।
উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো শ্রদ্ধা নিবেদন করে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় কবিতা পরিষদ, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়ন, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এদিন শ্রদ্ধা জানিয়েছে।