প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৩ ২২:০৩ পিএম
আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৩ ০০:৫৫ এএম
তীব্র দাবদাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। প্রচণ্ড রোদে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না শ্রমিক-মজুরসহ খেটে খাওয়া মানুষজন। দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা ও চুয়াডাঙ্গা জেলার ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পঞ্চগড়, রংপুর, নীলফামারী, মৌলভীবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলাসমূহ এবং রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের অবশিষ্টাংশসহ ঢাকা, বরিশাল বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ চলছে। এর ওপর আছে লোডশেডিং। অনেক জেলা থেকে প্রায় অর্ধেক পরিমাণ বিদ্যুৎ ঘাটতির খবর আসছে। সবাই এখন বৃষ্টির অপেক্ষায়।
পাম্প চলছে না সিলেট সিটিতে
খরায় অধিকাংশ এলাকায় খাল-বিল ও পুকুর শুকিয়ে গেছে। কমে গেছে নদী-নালার পানি। খরার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎসংকটে সিলেট সিটি করপোরেশনের পাম্প চালাতে সমস্যা হওয়ায় নগরীতে পানীয় জলের অভাব দেখা দিয়েছে। নগরীর অনেক এলাকায় রমজান মাসে রোজাদারদের দোকান থেকে লিটারে খাওয়ার পানি কিনতে হচ্ছে। নগরীর বাগবাড়ি, সাগরদিঘীরপাড়, সুবিদবাজার, পাঠানটুলা, ফাজিলচিস্ত, জালালাবাদ, আম্বরখানা, ইলেকট্রিক সাপ্লাই রোড, ঈদগাহ, শিবগঞ্জ, উপশহর, জল্লারপাড়সহ আশপাশের এলাকায় পানীয় জলের সংকট সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে পানি সরবরাহ-ব্যবস্থা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। নগরীর কলোনিগুলোর পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ।’ বিদ্যুৎ না থাকায় বাসার মোটর চালু করা যাচ্ছে না বলে জানান নগরীর বাগবাড়ির আসমা বেগম। তিনি বলেন, ’ট্যাংকে কিছু পানি জমা হলেও তা ওপরে তোলা যাচ্ছে না। বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের অনেকে নিচের ট্যাংক থেকে বালতি বা কলসে করে পানি নিচ্ছেন।’
ইদানীং রাত জেগে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে বলে জানান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, ’রোজার মধ্যে রাতে ঠিকমতো ঘুমানো যাচ্ছে না।’
ঘন ঘন লোডশেডিং বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ সিলেট-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ-ই-আরেফিন বলেছেন, মঙ্গলবার দুপুরে তার বিভাগে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দরকার ছিল। কিন্তু সরবরাহ ছিল মাত্র ১৭ মেগাওয়াট। ঘাটতি ১৩ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং হয়েছে। এতে তাদের গ্রাহকদের পক্ষ থেকে তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে তিনি জানান।
গোপালগঞ্জে বিদ্যুতের লুকোচুরি
জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৩০ মিনিট পরপর আসা-যাওয়া করছে বিদ্যুৎ। আবার কোথাও কোথাও ৩০ মিনিট থাকলেও লোডশেডিং চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দিন বা রাত—কখনও বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।
‘বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদ যেন আগুনের ফুলকি হয়ে ঝরছে। বিশেষ করে দুপুরের পর আগুন ঝরা রোদের তেজে বাইরে বের হওয়া মুশকিল হয়ে পড়ছে।’ এভাবেই গরমের কথা জানান গোপালগঞ্জের এক বৃদ্ধ।
ওবায়দুর রহমান নামের পঞ্চাশ বছর বয়সি এক রিকশাচালক বলেন, ‘রোদে রিকশা চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। একটি ভাড়া টেনে অন্য ভাড়া ধরতে কষ্ট হয়। মাঝেমধ্যে ছায়ায় বসে প্রাণ বাঁচাতে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। কষ্ট হলেও তো কিছু করার নেই। সামনে ঈদ। কষ্ট হলেও আয় তো করতে হবে।’
অপর রিকশাচালক সোলাইমান হোসেন বলেন, ‘সারা দিন যা আয় হয় তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে। কিন্তু তীব্র গরমে রোদের ভয়ে ঘরে বসে থাকলে তো আর কেউ খাবার দিয়ে যাবে না। তাই কষ্ট হলেও রিকশা চালাতে হচ্ছে।’
চুয়াডাঙ্গা
টানা ১৫ দিন ধরে জেলায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হচ্ছে। এর ওপর রাতে-দিনে সময়-অসময় লোডশেডিং। এতে মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এ বিষয়ে জেলার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, তীব্র দাবদাহে বিদ্যুতের চাহিদা অত্যধিক পরিমাণ বেড়ে গেছে। তা ছাড়া কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোডশেডিং হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে।
তীব্র রোদে দুপুরের পর থেকে বাইরে বের হওয়া দায় হয়ে পড়ছে। জেলায় বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছে না কেউ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে, যাতে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত না হয় সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন শতাধিক মানুষ ডায়রিয়া, পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। তাপপ্রবাহে সবচেয়ে কষ্টে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ।