আমিনুল ইসলাম মিঠু, ফারুক আহমাদ আরিফ ও তাসনিম আলম
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৩ ১০:১৬ এএম
আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৩ ১০:২৫ এএম
চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া দাবদাহে সারা দেশের মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। ইতোমধ্যে বৈশাখ চলে এলেও এখনও দেখা মেলেনি স্বাভাবিক ঝড়-বাদল বা কালবৈশাখীর। বিভিন্ন এলাকায় বইছে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ। এ পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
নদীমাতৃক হলেও বাংলাদেশে দাবদাহ বা গরম বিরল ঘটনা নয়। তবে গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলের গরমের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। যার সঙ্গে সাধারণত মিল পাওয়া যায় মধ্যপ্রাচ্যের। তবে চলতি বছর এই সময়ে আমরা যখন গরমে হাঁসফাঁস করছি, তখন ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে।
গতকাল পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে ওয়েদারডব্লিউএক্সডটকম জানাচ্ছে, গতকাল সোমবার (১৭ এপ্রিল) ঢাকার সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরের তাপমাত্রা ছিল সর্বনিম্ন ২২ থেকে সর্বোচ্চ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে তাপমাত্রা ছিল ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, মদিনায় ছিল ৩২, জেদ্দায় ৩৩, মক্কায় ৩৭, কাতারের দোহায় ২৮, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে ২৮, ওমানের মাস্কাটে ২৯ এবং কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটিতে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
দুই দিন আগে গত শনিবারও এসব স্থানে ছিল প্রায় একই চিত্র। শনিবার মধ্যপ্রাচ্যের ওই সব শহরের মধ্যে মক্কায় তাপমাত্রা ছিল সর্বোচ্চ ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মধ্যপ্রাচ্যের উল্লেখিত রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে এপ্রিল-মে মাসে রিয়াদে সচরাচর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা থাকে যথাক্রমে ৩৫ ও ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দোহায় থাকে যথাক্রমে ৩১ ও ২১ ডিগ্রি। এ ছাড়া আবুধাবিতে যথাক্রমে ৩৪ ও ২৩ ডিগ্রি, মাস্কাটে ৩৪ দশমিক ৭ ও ২৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি এবং কুয়েত সিটিতে ৩১ ও ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের তথ্যমতে, সৌদি আরবে ডেজার্ট ক্লাইমেট বা মরু জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই দেশটির অধিকাংশ অঞ্চলে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করে। তবে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলবায়ু আধা শুষ্ক।
এ অবস্থায় গ্রীষ্মে সৌদি আরবের মধ্যাঞ্চলের আবহাওয়া থাকে প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক। তখন সেখানকার তাপমাত্রা অঞ্চলভেদে ২৭ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। উপকূলীয় অঞ্চলে তা থাকে ২৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রির মধ্যে। তবে শীতকালে সৌদি আরবের মধ্যাঞ্চলের তাপমাত্রা ৮ থেকে ২০ ডিগ্রির মধ্যে থাকে। একই মৌসুমে ১৯ থেকে ২৯ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকে লোহিত সাগর তীরবর্তী দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলে, যা শীতকালে দেশটির মধ্যে সর্বোচ্চ।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে দিনের তাপে উত্তাপ বেশি থাকলেও রাতে তা শীতল থাকে। তবে ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন। কারণ এখানে দিন ও রাতের তাপমাত্রায় খুব বেশি পার্থক্য থাকে না। কিন্তু সম্প্রতি দেশের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার মধ্যে পার্থক্য ক্রমশই বাড়ছে। দিন এবং রাতের তাপমাত্রায়ও ফারাক দেখা দিয়েছে। যা মরু অঞ্চল অর্থাৎ আরব দেশগুলোতেই হয়ে থাকে।
২০১৭ সালে রাজধানী ঢাকার ৩৬টি এলাকার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রার পার্থক্য নির্ণয় করে বায়ুমণ্ডলীয় অধ্যয়নকেন্দ্র (ক্যাপস)। ‘অ্যাসেসমেন্টস অব টেম্পারেচার ভেরিয়েশন অ্যাট সাম সিলেক্টেড জোন্স ইন ঢাকা সিটি’ শীর্ষক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জানুয়ারি ও মে মাসে রাজধানীর তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকা, মতিঝিল শাপলা চত্বর, মিরপুর-১০, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, ফার্মগেট, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুর এলাকার গড় তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। এসব এলাকাকে ১ থেকে ৯ নম্বরের মধ্যে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া সামগ্রিক র্যাংকিংয়ে ৩৬টি এলাকার মধ্যে তেজগাঁওকে ১ নম্বরে রাখা হয়েছে। আর বাকি আটটি এলাকাকে ২ থেকে ৫ নম্বরের মধ্যে রাখা হয়। কারণ হিসেবে এ এলাকাগুলোতে গাছপালা, পুকুর ও জলাশয়, জলাধার কম থাকা এবং ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ার দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। তাই এ ৯টি এলাকার গড় তাপমাত্রা শীত ও গ্রীষ্ম দুই সময়েই বেশি ছিল বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
রাজধানীর ৩৬টি এলাকার মধ্যে ১০ থেকে ২৭ নম্বর পর্যন্ত এলাকাগুলোকে ২০১৭ সালের ওই অধ্যয়নে ‘মধ্যম তাপমাত্রার’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ এলাকাগুলোর মধ্যে কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট, কমলাপুর, পল্টন, শান্তিনগর, গুলশান-১, বনানী মডেল টাউন, হাতিরঝিল, বনশ্রী ও বসুন্ধরা উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া সদরঘাট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, রমনা পার্ক, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ধানমন্ডি, পিলখানা, রমনাসহ ৯টি এলাকাকে তুলনামূলক কম তাপমাত্রার এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে ক্যাপস।
গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, শুধু ঢাকা শহরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর সর্বনিম্ন ছিল ২৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ ছিল ঢাকা বিভাগের ফরিদপুরে ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি আর সর্বনিম্ন ছিল কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলীতে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
রাজশাহী বিভাগে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন ছিল নওগাঁ জেলার বদলগাছীতে ২৩ দশমিক শূন্য ডিগ্রি। রংপুর বিভাগে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল দিনাজপুরে ৩৯ দশমিক ৫ ও সর্বনিম্ন কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ২১ দশমিক ৫ ডিগ্রি, ময়মনসিংহ বিভাগে ছিল ময়মনসিংহে সর্বোচ্চ ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন নেত্রকোণায় ২৩ দশমিক শূন্য ডিগ্রি।
সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ছিল সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক শূন্য ও সর্বনিম্ন ২৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি, চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ছিল টেকনাফে যথাক্রমে ৩৬ দশমিক ৪ ও ২২ দশমিক ১ ডিগ্রি। খুলনা বিভাগের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন চুয়াডাঙ্গায় ৪২ দশমিক ৫ ও ২৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি, বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ বরিশাল জেলায় ৩৬ দশমিক ৭ ও সর্বনিম্ন ভোলা ও খেপুপাড়ায় ২৭ দশমিক শূন্য ডিগ্রি। এতেও দেখা যাচ্ছে, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার মধ্যে পার্থক্য বেশি রয়েছে।
‘মরুকরণের লক্ষণ’
২০১৭ সালের জানুয়ারি ও মে মাসে রাজধানীর ৩৬টি এলাকার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা এবং চলতি এপ্রিল মাসের গত দুই সপ্তাহের গড় তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করে দেখেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ। এতে দেখা গেছে, ২০১৭ সালেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিন ও রাতের গড় তাপমাত্রার পার্থক্য ছিল ৯ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। আর এপ্রিলের শুরু থেকে তাপমাত্রাতেও পার্থক্য মিলেছে।
বায়ুমণ্ডলী অধ্যয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আহম্মদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, সাধারণত বাংলাদেশে দিন ও রাতের পার্থক্য খুব বেশি হয় না, এটা কাছাকাছি থাকত। এখন দিনে দিনে এই পার্থক্য বাড়তে শুরু করেছে। যা মরুকরণের লক্ষণ। ২০১৭ সালের সমীক্ষাটি করার সময় গড় পার্থক্য বাড়ার বিষয়টি দেখা গেছে। অর্থাৎ সেই সময় থেকেই মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘রাজধানীর ৩৬টি এলাকার তাপমাত্রার চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যেসব এলাকায় জলাশয় ও গাছপালা বেশি ছিল সেখানে তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর যেখানে ছিল না সেখানে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আমরা যদি এখনই জলাধার সংরক্ষণ না করি, গাছপালার পরিমাণ না বাড়াই, ফসিল ফুয়েল ব্যবহার না কমাই এবং ভবনগুলোতে যদি প্রচুর তাপ শোষণকারী গ্লাস ব্যবহার করা হয়, তাহলে এ পরিস্থিতি আরও তীব্র হবে।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম বলেন, ‘মরুভূমিতে গ্রীষ্ম বা শীতকাল দুটি মৌসুম থাকে। আর আমাদের দেশে ছয়টি ঋতু। মরুভূমিতে দিনে প্রচণ্ড গরম আবার রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। কিন্তু আমাদের পার্থক্য প্রচুর। যেমন, বর্ষা মৌসুমে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলে তাপমাত্রা কমে যায়। বৃষ্টি না হলে আবার বেড়ে যায়। বর্তমানে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় পার্থক্য রয়েছে ১০-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।’
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এ জেড এম মঞ্জুর রশিদ বলেন, ‘শুধু গাছপালা বা জলাধার থাকলেই পরিবেশ ভালো হবে, তা কিন্তু না। এটি কোনো একক বিষয় না। রাজধানী ঢাকায় জনসংখ্যার পরিমাণ ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি। এখানে যথাযথ শহর পরিকল্পনা প্রয়োজন। দাবদাহসহ যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সামগ্রিক দিক থেকে ঘাটতি রয়েছে। কোনো দুর্যোগ এলে আমরা বিষয়গুলো নিয়ে হইচই করি। কিন্তু পরে সেগুলো মাথায় রাখি না। ঢাকায় পুকুর-জলাশয় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঢাকায় যে তাপমাত্রা তা আমিনবাজারে ২ ডিগ্রি কম ও আমিনবাজার থেকে জাহাঙ্গীরনগরে আরও ২ ডিগ্রি কম। অর্থাৎ জলাশয়গুলো এলাকাভেদে প্রাকৃতিকভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। প্রতিটি স্থানে সমন্বয় থাকতে হয়। আমাদের মধ্যে সেই সমন্বয় নেই।’
আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান খান বলেন, ‘সমুদ্র থেকে বাতাস কম আসার কারণে বাতাসে ময়েশ্চারের মাত্রা কমে গেছে। যে সামান্য বাতাস আসছে তার গতিও খুব দুর্বল। স্থানীয়ভাবে যে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর ও জলাশয় কিছু ময়েশ্চার করে সেগুলো ভরাট ও ধ্বংস করা হচ্ছে। বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ খুবই কম। জলীয়বাষ্প না থাকায় শরীর ঘামছে না। বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বাড়লে তাপমাত্রা কমে যাবে। বাতাসে এখন যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প আছে তা অতিরিক্ত তাপের কারণে জমতে পারছে না। বর্তমানে চলা উচ্চ তাপমাত্রা ১৯ এপ্রিলের পর কিছুটা কমবে তবে দাবদাহ চলমান থাকবে।’
স্মরণকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ঈশ্বরদীতে
গতকাল পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। গত ১৫ দিন এ জেলায় প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। দাবদাহে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ। প্রচণ্ড খরায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে পানিও উঠছে না টিউবওয়েলে। উপজেলাজুড়ে তীব্র পানিসংকট দেখা দিয়েছে। ঈদযাত্রায় ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের অবস্থাও বেগতিক। তাপপ্রবাহ দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রভাব পড়ছে ফসলের উৎপাদন। বিশেষ করে বোরো ধান ও লিচুর চাষিরা এ আবহাওয়ায় শঙ্কায় পড়েছেন।
ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক নাজমুল হক রঞ্জন বলেন, ১৭ এপ্রিল ঈশ্বরদীতে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। এ মৌসুমে এটি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। আরও কয়েক দিন এমন তাপমাত্রা থাকতে পারে।
সন্ধ্যায়ও চুয়াডাঙ্গায় ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড
গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অফিস বলছে, আগামী ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত এমন তাপমাত্রা বজায় থাকবে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ মো. জামিনুর রহমান বলেন, টানা ১৫ দিন ধরে এ জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করছে। গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় ছিল ৩১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর দুপুর ১২টায় তাপমাত্রা বেড়ে ৩৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি হয়ে যায়। এরপর বেলা ৩টায় ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। শুরু হয় অতি দাবদাহ। আজ মঙ্গলবার আকাশ আংশিক মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। দিনের চেয়ে রাতের তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে।
৯ বছর পর ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি রাজশাহীতে
রাজশাহীর ওপর দিয়ে বইছে তীব্র দাবদাহ। এর আগে ২০১৪ সালের ২১ মে রাজশাহীর তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দীর্ঘ ৯ বছর পর ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পুড়ছে রাজশাহীর শহর, নগর এবং গ্রামের জনবসতি, প্রকৃতি ও প্রাণিকুল। দাবদাহের কারণে আক্রান্ত হয়ে গত সাত দিনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫২ জন রোগী। যাদের অধিকাংশই খেটে খাওয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
তীব্র খরায় রাজশাহী অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এতে সেচের পানিসহ গৃহস্থালি ও খাওয়ার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষকরা জমিতে পানির জন্য হাহাকার করছেন। আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মৃদু দাবদাহ, ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রাকে মাঝারি এবং ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি বা তার ওপরের তাপমাত্রাকে তীব্র দাবদাহ হিসেবে অবহিত করা হয়। সেই হিসেবে রাজশাহীর ওপর দিয়ে তীব্র দাবদাহ বয়ে চলেছে।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের উচ্চ পর্যবেক্ষক রাজিব খান বলেন, গতকাল সোমবার বেলা ৩টায় রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ১৮ শতাংশ। এর আগে ২০১৪ সালের ২১ মে রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি। ২০০৫ সালের ২ জুন রাজশাহীর সর্বোচ্চ তামপাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ভারতে ত্রিপুরা ও ওড়িশায় বিশেষ ব্যবস্থা
গ্রীষ্মের দাবদাহে পুড়ছে গোটা ত্রিপুরা রাজ্য। রাজধানী আগরতলার তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ৪১ ডিগ্রি ছুঁয়েছে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছেন, খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ যেন ঘর থেকে বাইরে বের না হয়। এ পরিস্থিতিতে পাঁচ দিনের জন্য সব স্কুলে ছুটি ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকারের শিক্ষা দপ্তর। আজ মঙ্গলবার থেকেই ছুটি কার্যকর হবে।
তীব্র তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় ও নাগরিকদের স্বস্তি দিতে ভারতের ওড়িশা সরকার বিশেষ গাইডলাইন জারি করেছে। স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি শহর ও নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, মার্কেট, বাস স্টপে পর্যাপ্ত নিরাপদ খাওয়ার পানির ব্যবস্থাসহ হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোকে আক্রান্তদের জন্য বিশেষ বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওষুধের দোকানগুলোতে আক্রান্তদের জন্য স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুদ রাখারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।