প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ১৭:১০ পিএম
আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ২০:২১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
তীব্র দাবদাহে বেশ কিছুদিন ধরে হাঁসফাঁস অবস্থা মানুষের। এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়েছে দফায় দফায় লোডশেডিং। অনেক জায়গায় দিনে আট থেকে দশ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন কাটাতে হচ্ছে। এই অসহনীয় গরমের মধ্যে বিদ্যুতের এমন লুকোচুরিতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে সেহরি, ইফতার ও তারাবির সময় লোডশেডিং মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে।
দফায় দফায় লোডশেডিংয়ের কারণে শিশুদের নিয়ে বিপাকে পড়ছেন পরিবারের সদস্যরা। বৈদ্যুতিক পাখা থামতেই ঘুম ভেঙে কান্না শুরু হয়। তাদের শান্ত করতে রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হয় অন্যদের। রাজশাহী অফিস জানিয়েছে, দাবদাহের মধ্যেই বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলা ভোগান্তি বাড়িয়েছে নগরবাসীর। বোরো ধানের জমিতে সেচের পানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কিত কৃষকরা। দুর্গাপুর উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা রবি বলেন, পল্লী বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষকদের বিপদে পড়তে হচ্ছে। গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, দেশে রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। অথচ কৃষকরা সেচের জন্য বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।
বিদ্যুৎ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুতের ঘাটতি গড়ে ২৫ শতাংশ। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) রাজশাহী জোনের এক কর্মকর্তা জানান, সিটি করপোরেশন এলাকা, তানোর উপজেলা ও কাটাখালি পৌর এলাকায় খরা মৌসুমে গড়ে ৯০ থেকে ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। শনিবার ১০৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম মিলেছে। গতকাল রবিবার সকাল থেকে বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও দুপুরে তালাইমারি এলাকায় ১৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে ঢাকা থেকে। নেসকোর ওই কর্মকর্তা অবশ্য সংবাদমাধ্যমে নিজের নাম প্রকাশে রাজি হননি।
নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা তারেক রহমান বলেন, একে তো গরম; তার ওপর বিদ্যুৎ বিভ্রাট, সঙ্গে মশার উৎপাত। লোডশেডিংয়ের কারণে ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো পড়াশোনাও করতে পারছে না।
তানোর উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম জহুরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে এখানে বিদ্যুতের চাহিদা ২৫ মেগাওয়াট। এপ্রিলের শুরুতেও সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। তবে গত দুই-তিন দিন থেকে চাহিদার চেয়ে ২৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ মিলছে।
নেসকোর বিতরণ অঞ্চল রাজশাহীর প্রধান প্রকৌশলী আবদুল রশিদ বলেন, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে বিদ্যুতের চাহিদা মোট ৭২৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ৯৬ মেগাওয়াট কম পাওয়া যাচ্ছে। ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করা হচ্ছে।
সিলেট অফিস জানিয়েছে, গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন মানুষ। প্রতিদিন গড়ে ৮-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। অনেক সময় ইফতার ও সেহরির সময়ও বিদ্যুৎ থাকে না। অভিযোগ উঠেছে, চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাচ্ছেন না মানুষ।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, ন্যাশনাল গ্রিড থেকে তারা কম পাচ্ছেন বলে বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। শনিবার সিলেটে পিডিবির সবগুলো ডিভিশনের চাহিদার মাত্র ৪২ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। ঘাটতি ছিল ৫৮ শতাংশ। যে কারণে শনিবার সকাল থেকেই মহানগরের সব এলাকায় চরম বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা গেছে। গতকাল রবিবারও ছিল একই অবস্থা। এমন অবস্থা আরও তিন থেকে চারদিন থাকবে বলে জানা গেছে।
অতিরিক্ত গরমের কারণে ঘরবাড়ি, মার্কেট, অফিসপাড়ায় এসির ব্যবহার বেড়েছে। ঈদ উপলক্ষে শপিং মলগুলোও দীর্ঘ সময় খোলা থাকছে। তবে ঈদের ছুটিতে অফিস, কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেলে তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরীর নেহারীপাড়ার বাসিন্দা সহিদ আহমদ সাকিব জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন অচল হয়ে পড়ছে। দিনে গড়ে ৮-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ইফতার ও সেহরির সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। তারাবির সময়ও বিদ্যুৎ থাকে না। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় সমস্যা হচ্ছে। আমরা এর সমাধান চাই।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ সিলেট-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ-ই-আরেফিন জানান, গতকাল রবিবার দুপুরে তার ডিভিশনে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দরকার ছিল। কিন্তু সরবরাহ করা হয়েছে ১৭ মেগাওয়াট। ফলে অনির্ধারিত লোডশেডিং হচ্ছে। আর সরবরাহ কম থাকায় গ্রাহকদের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
শাহ-ই-আরেফিন জানান, মহানগর ও শহরতলি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পিডিবি। আর গ্রামাঞ্চলসহ কিছু শহরতলি এলাকায় সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ। কিন্তু বিদ্যুৎ বণ্টনের ক্ষেত্রে পল্লী বিদ্যুতের চেয়ে পিডিবিকে কম দেওয়া হচ্ছে। পিডিবির চাহিদার অর্ধেকের চেয়েও কম বিদ্যুৎ পাচ্ছেন তারা।
কুমারগাঁও গ্রিডের ইনচার্জ কাজি মুতাসসিম বিল্লাহ বলেন, অভিযোগটি আসলে সঠিক নয়। আমরা ন্যাশনাল গ্রিড থেকেই কম পাচ্ছি। সে অনুযায়ী বিতরণ করছি।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিবেদক জানিয়েছেন, টানা দুই সপ্তাহের দাবদাহে সেখানকার জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসহনীয় লোডশেডিং। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতকাল রবিবার বেলা ৩টায় এ জেলায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ১৪ শতাংশ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বলছে, দেশে চলমান তীব্র দাবদাহ এবং রমজানের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। এর পাশাপাশি কিছু কারিগরি দুর্বলতাও রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সহসাই এই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিবেদক জানিয়েছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চরম আকার ধারণ করছে। প্রতিদিন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে লোডশেডিংয়ের মাত্রা। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুতের যাওয়া-আসার কারণে অজু, গোসল ও খাবার পানি সংরক্ষণ করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
বটতলী সদরের কম্পিউটার দোকানদার মোহাম্মদ আমান উল্লাহ বলেন, দিনে ১৫ থেকে ২০ বার বিদ্যুৎ চলে যায়। অব্যাহত লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে।
চুনতি ইউনিয়নের গৃহিণী রিদুআনা ফেরদৌসি কলি বলেন, লম্বা সময় ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে ফ্রিজের জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিল কমে না, উল্টো বাড়তি বিল আসে।
আধুনগর ইউনিয়নের থ্রি-স্টার মুড়ি ফ্যাক্টরির ম্যানেজার মাহামুদুর রহমান ভুট্টো বলেন, লোডশেডিংয়ের জন্য ফ্যাক্টরি ঠিকমতো চালাতে পারি না। কারণ, কারখানার অধিকাংশ যন্ত্রপাতি বিদ্যুৎনির্ভর।
লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম মো. শাহজাহান বলেন, লোডশেডিং শুধু লোহাগাড়ায় নয়, পুরো চট্টগ্রামে হচ্ছে। সংকট উত্তরণের চেষ্টা চলছে।
নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিবেদক জানিয়েছেন, ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন পুরো উপজেলার মানুষ। দিনে গড়ে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মিলছে না। রমজান মাসে গরমের মধ্যে এমন লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, ‘পিক আওয়ারে ২৮ মেগাওয়াটের জায়গায় ১৫ মেগাওয়াট এবং দিনের বেলায় ২০ মেগাওয়াটের জায়গায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাই। তাই চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পেলে লোডশেডিং কখনও কমবে না।’