ঐতিহাসিক ১০ এপ্রিল
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৩ ১২:০৩ পিএম
আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৩ ১২:০৪ পিএম
ফটো সংগৃহীত
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন ১০ এপ্রিল। ১৯৭১ সালের এই দিন বিশ্ববাসীর সামনে ঘোষণা করা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা। ঘোষিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। পরবর্তী সময়ে এই সরকার দেশে-বিদেশে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার বা মুজিবনগর সরকার নামেও পরিচিতি পায়।
একাত্তরের ১০ এপ্রিল রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ওই ভাষণে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা জানান বিশ্ববাসীকে। ঐতিহাসিক ভাষণটি পরদিন ১১ এপ্রিল ভারতের আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র থেকেও একাধিকবার প্রচার করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদের সেই ভাষণের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের সবাই জানতে পারেন, স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনার জন্য একটি আইনানুগ সরকার গঠিত হয়েছে।
এর আগে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা, নিপীড়ন-নির্যাতনের তাণ্ডবে আওয়ামী লীগসহ স্বাধীনতাকামী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মী, গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেন। এ সময় তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক নেতারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা চান। এর পরপরই শুরু হয় বাংলাদেশ সরকার গঠনের কাজ। উভয় পরিষদের যেসব নির্বাচিত সদস্য কলকাতায় পৌঁছেছিলেন তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করেন। এ সময় স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্বাধীন সরকারের আইনগত বৈধতা দেওয়ার বিষয়টি প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম প্রমুখের সহায়তায় স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হয়।
স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্র ১০ এপ্রিল প্রচার করা হয়। পাশাপাশি ওইদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই সরকার সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে তাকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করে। তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে অর্থমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদকে পররাষ্ট্র, আইন এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র; কৃষি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে এই মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয়। চার মন্ত্রীকে ১২টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়।
স্বাধীনতার এ ঘোষণাপত্রের ধারাবাহিকতায় ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলায় মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়। ওইদিন সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন গণপরিষদের সদস্য অধ্যাপক ইউসুফ আলী। এ দিনটিকে বর্তমানে ‘মুজিবনগর দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। এই ঘোষণাপত্র কার্যত প্রথম বাংলাদেশ সরকারের অলিখিত সংবিধান ছিল।
অবশ্য এ সরকার গঠনের পর কেউ কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে নানা বিতর্ক উত্থাপন করলে সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচিত এমপিএ ও এমএনএ-দের এক সম্মেলন আহ্বান করা হয়। একাত্তরের ৪ জুলাই এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ভারতের শিলিগুড়িতে। সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব ছিল কুমিল্লার কাজী জহিরুল কাইয়ুমের ওপর। ভারতের পক্ষ থেকে সমন্বয়ক হিসেবে ভূমিকা রেখেছিলেন ডিপি ধর। ওই সম্মেলনে বিভিন্ন নেতার বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের দেওয়া বক্তব্য বিভ্রান্তি সৃষ্টির সব প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দেয়।
এ প্রসঙ্গে সত্তরের নির্বাচিত এমপিএ ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু জানান, ১০ এপ্রিল সরকার গঠনের ঘোষণার গুরুত্ব অপরিসীম। সেই সম্মেলনে অন্য সবার সঙ্গে তিনিও উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় খন্দকার মোশতাক চক্র অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
এদিকে ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস পালন উপলক্ষে আগামীকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও যশোর- এই পাঁচটি জেলা শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, দলীয় সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের মতবিনিময় সভা হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।