প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৩ ২৩:০৫ পিএম
শেষ সম্বল ছাই পানিতে খুঁজছে দোকানিরা। প্রবা ফটো
বেলা সোয়া ২টা। বঙ্গবাজারের পুরো মার্কেট আগুনে ভস্মীভূত। তখনও জ্বলছে এনেক্সকো টাওয়ার। টাওয়ারের পশ্চিম পাশেই বঙ্গ ইসলামিয়া মার্কেট। আগুন থেকে শেষ রক্ষা পায়নি ইসলামীয়া মার্কেটের অনেক দোকান। এই দুই মার্কেটের মধ্যের রাস্তায় পানি আর কাপড় পোড়া ছাই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ছাই পানি হাতড়ে শেষ সম্বল খুঁজছেন কয়েকজন দোকানি। মঙ্গলবার (৪ এপ্রিল) বঙ্গ ইসলামীয়া মার্কেটের সামনে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। কেউ ভেজা, পোড়া কাপড়ের মধ্যে নির্বাক হয়ে বসে আছেন। কেউ পানিতে ভেজা আধা পোড়া মালামাল কুড়িয়ে নিচ্ছেন। অনেকেই কুড়িয়ে নেওয়ার মতোও কিছু পাচ্ছেন না। তাই ভেজা, পোড়া ছাইয়ের ওপরে বসে কান্নাকাটি করেছেন।
বঙ্গ ইসলামীয়া মার্কেটের ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন জানান, বঙ্গবাজারের আগুনে পোড়া কাপড় রাস্তায় ফেলার পর সেই কাপড় থেকে আমাদের মার্কেটে আগুন লেগেছে। আমাদের মার্কেটে আগুন লাগার কথা ছিল না। ঈদ উপলক্ষ্যে আমি ১ কোটি টাকার ওপরে মালামাল কিনেছিলাম। দুটি ব্যাংক থেকে লোন করেছি। আমার যা ইনভেস্ট ছিল সব দিয়ে দোকানে সাজিয়েছি। এখন আমি পথের ভিখারী হয়ে গেছি।
ইসলামীয়া মার্কেটের সামনের ফুটপাতে ভেজা ও অর্ধপোড়া মালামাল পৃথক করছিলেন ইমরান হোসেন। তিনি বলেন, আমি খালুর দোকানে সেলসম্যানের কাজ করি। তারা দুই ভাই। তাদের ৭টি দোকান রয়েছে। এর মধ্যে বিল্লালে সেন্ডোগেঞ্জি, আন্ডারওয়্যার, বেল্ট, নারী শিশুদের পোশাক আর ইয়াসিনের শার্ট জিন্সপ্যান্টসহ বিভিন্নধরনের মালামালের দোকান ছিল। তিনি আরও বলেন, আগুন লাগার খবর পেয়ে আমি ৭টার দিকে আসি। তখনও আমাদের মার্কেটে আগুন লাগে নাই। ব্রিজের উপরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলাম, এরই মধ্যে হঠাৎ ১০টার দিকে বঙ্গ হোমিও ভবনে আগুন লাগে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে ইসলামীয়া মার্কেটে। তিনি দাবি করে বলেন, বঙ্গবাজারের আগুনের ফুলকি এই মার্কেটে পড়ে আগুন লেগেছে। আবার অনেকে বলছেন, বঙ্গবাজারের পোড়া কাপড় চোপড় রাস্তায় এবং তাদের মার্কেটের সামনের ফুটপাতে রাখায় সেখান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।
এদিকে, গুলিস্তানের বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ব্যবসায়ীদের সব মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পোশাক ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে রাস্তায় বসে আহাজারি করতে দেখা যায়।
মহানগর মার্কেটের দোকানী মো. মানিক মিয়া। দ্বিতীয় তলার ৯৬৩ নম্বর নিউ লাইফ স্টাইল দোকান ছিলো তার। সেখানে জিন্সের প্যান্ট বিক্রি করতেন তিনি। সব কিছু হারিয়ে রাস্তায় মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিলেন তিনি। পাশে থাকা তার দোকানকর্মীর সান্ত্বনা দিচ্ছেলেন। তিনি নিস্তব্ধ হয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন মাটির দিকে। কথা বলতে চাইলে বলেন, আর কি হবে কথা বলে? আমার সব গেছে গা। দোকানে ৫ লাখ টাকার মাল ছিলো। উপরের তলায় গোডাউনে ছিলো ১০ লাখ টাকার মাল। সব শেষ হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ী লিটন মাঝি। বঙ্গবাজারে তার সাতটি দোকান ছিলো। ওই সব দোকানে তার কোটি টাকার মালামাল ছিল। সব আগুনে পুড়ে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে লিটন মাঝি বলেন, কীভাবে কী হলো আল্লাহ জানেন। এখন আর আমার কিছু নাই। আমি শেষ হয়ে গেছি। সব টাকা ব্যবসায় দিয়েছিলাম। আগুন সবকিছুই নিয়ে গেছে।
সিরাজুল ইসলাম নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, আগুন লাগার খবর পেয়ে বঙ্গবাজারে ছুটে আসি। আমার দোকানে ২০ লাখ টাকার পোশাক ছিল। আমি প্রায় অর্ধেক পণ্য বের করতে পেরেছি, কিন্তু সেগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে। পানির কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আরেক ব্যবসায়ী রাকিব বলেন, তিনি দোকান থেকে এক টুকরো কাপড়ও বের করতে পারেননি।
বঙ্গবাজারের প্যারাডাই দোকানের মালিক তারেক জানান, খবর পেতে দেরি হয়েছে। এসে দেখি সব পুড়ে গেছে। কিছুই বের করতে পারি নাই। দোকানে প্রায় ২০ লাখ টাকার মালামাল ছিল। বঙ্গবাজারের পিছনের মার্কেট মহানগর মার্কেটের ব্যবসায়ীরা কিছুটা মালামাল বের করতে পারলেও বঙ্গ বাজারে কোন ব্যবসায়ী কোন ধরনের মালামাল বের করতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, দোকানের ক্যাশে নগদ টাকা, ব্যাংকের চেক, ক্রেডিট কার্ড ও হিসাবের খাতা সব পুড়ে গেছে। হিসেবের খাতাটা উদ্ধার করতে পারলে কিছুটা রেহাই পাওয়া যেত। অনেক ব্যবসায়ীর কাছে পাওনা রয়েছে কয়েক লাখ টাকা।
মায়ের দোয়া প্যান্ট হাউজের মালিক ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, মহানগর মার্কেটে ৭টি দোকান ও এনএক্স ভবনে তার তিনটি গোডাউন রয়েছে। সব মিলিয়ে চার কোটি টাকার মালামাল ছিলো। গত রাতেও গোডাউনে ৭০ লাখ টাকার মালামাল ঢুকিয়ে বাসায় ফিরেছেন। সকালে খবর পেয়ে এসে কিছু মালামাল বের করেন বলে জানান দেলোয়ার। তিনি বলেন, ৪-৫ লাখ টাকার মালামাল বের করতে পেরেছি। বাকি সব শেষ। চোখের সামনে আমার তিলতিল করে গড়ে তোলা দোকানগুলো পুড়ে গেছে।
মহানগর মার্কেটের রাসেল গার্মেন্টসের মালিক রাসেল জানান, তার ৪ টি দোকান ছিল মার্কেটে। সব নারীদের পোশাক। তিনি একটি দোকানের মালামাল বের করেছেন। বাকি দোকানগুলো পুড়ে গেছে। যে দোকানের মালামাল বের করে এনেছি সেটাও ১১ টার দিকে আগুনে পুড়ে গেছে।