ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৩ ০৮:৫৮ এএম
আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৩ ০৯:০০ এএম
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ভবন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সুযোগসন্ধানীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ফেসবুকে সরকারবিরোধী অপপ্রচারে তৎপর হতে পারে। দেশি-বিদেশি বিশেষ কোনো মহল এর নেপথ্যে ইন্ধনও দিতে পারে।
বিশেষ করে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে দেশজুড়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা হতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেওয়া। এরকম নানা আশঙ্কা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এরই মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থা বেশকিছু আইডি শনাক্ত করেছে, যেগুলোকে কঠোর নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।
এসব বিষয় সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অবহিত করার পর তা আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে (বিটিআরসি) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, অতীতে বিভিন্ন সময়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবারও নানা অপপ্রচার হতে পারে- এমন আশঙ্কা করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ যাতে অপপ্রচার চালাতে না পারে, সেজন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর পরপরই সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তাদের ওয়েবসাইট, আইডি ও ইউটিউব লিংক চিহ্নিত করা হয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর ধারা ৮ (১) ও (৩) অনুসারে তাদের চিহ্নিত করার জন্য বিটিআরসিকে বলা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের ফেসবুক আইডি ও লিংক বাতিল করতে বলা হয়েছে। সরকারের নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির একাধিক সভায়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়।
ওই সভাগুলোয় এ বিষয়ে উদাহরণ টানতে গিয়ে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপ থেকে ফয়েজ উদ্দীন নামে এক ব্যক্তি প্রথম ফেসবুক লাইভে এসেছিলেন। সেখান থেকেই গুজবের ডালপালা ছড়াতে শুরু করে। মণ্ডপের দিকে লাঠিসোটা নিয়ে উত্তেজিত মানুষ এগোচ্ছেন- এমন একটি জটলার ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘লাইভ করে দাও’, ‘লাইভ করে দাও’।
একই বছর রাজধানীর পল্লবীতে সন্তানের সামনে সাহিন উদ্দীনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এটিকে নোয়াখালীতে যতন সাহা হত্যার ভিডিও বলে প্রচারের ঘটনাও ঘটে। ওই ঘটনায় চট্টগ্রাম থেকে রতন শীল ও ঢাকার বদরুন্নেসা কলেজের শিক্ষক রুমা সরকারকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সেই অপচেষ্টা ধরা পড়ে। তবে ঘটনার উদ্দেশ্য ছিল- বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেওয়া। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও এভাবে সাইবার স্পেসে গুজব রটিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা হতে পারে- এমন আশঙ্কা রয়েছে অনেকের।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ফেসবুকে দেশবিরোধী অপপ্রচার করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অপপ্রচার বন্ধে তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। ফেসবুকের সিঙ্গাপুর প্রতিনিধিরা এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ঘুরেও গেছেন। তারাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়ন করবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে- দেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি মহল ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করছে। এগুলো প্রমাণিত হওয়ায় মানুষ এখন তা বিশ্বাস করছে না। কারণ বিশ্বাসের আগে তারা তথ্য ও যুক্তিটা জানতে পারে। তবে কেউ সংক্ষুব্ধ হয়ে বিচার চাইলে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বাংলাদেশে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। সুযোগসন্ধানীরা ধর্মীয় ইস্যু ও গুজব দ্রুত ছড়িয়ে সহিংসতা সৃষ্টিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ফেসবুক ব্যবহার করছে। তারা ফটকাবাজি, বিতর্ক ও সংঘর্ষ তৈরি করতে পারে- এমন সব তথ্য প্রকাশ করে আসছে। উদ্দেশ্য নিয়েই ফেসবুকে দেশবিরোধী মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। বিশেষত, ধর্মীয় ইস্যুতে অপপ্রচার চালিয়ে সহিংসতা সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার অপচেষ্টা হচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এটা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র আরও বলছে, জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনের আগে-পরে রাজনৈতিক গুজব বেশি চলে। তবে ধর্মীয় ইস্যুতে গুজব ছড়ানোর ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশি ঘটেছে। ২০১৭ সালে প্রচারিত গুজবের ৫ শতাংশ ছিল ধর্মীয়, ২০২০ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশ। আবার উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার হওয়ার হার ৮২ শতাংশ। এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দেশের শিক্ষিত তরুণ বা শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে তারাই উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা এতটাই সহজ যে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান পণ্য বিক্রির নামে চটকদার প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে অনায়াসে মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। এমন অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দেখা গেছে- যারা তাদের কাছে পর্যাপ্ত মোটরবাইক না থাকলেও বাইক কিনতে প্রলুব্ধ করতে- ‘সাইক্লোন অফার’, ‘ধামাকা অফার’- এমন হাজারো নাম দিয়ে ফেসবুকে পণ্য কেনায় আগ্রহী করেছে সাধারণ মানুষকে। আর সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অফারের ফাঁদে পা-ও দিয়েছে।
অনেকেই পণ্য না পেলেও শুধু বিশ্বাস করে আগাম অর্থ পরিশোধ করেছে। এভাবে প্রতারকরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সটকে পড়ছে। পুরো ব্যাপারটাই ঘটছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অপব্যবহারের মাধ্যমে। গুজব ছড়ানোর পাশাপাশি সব ধরনের অপচেষ্টা রোধ করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এখন সর্বোচ্চ নজরদারি শুরু করেছে।