প্রসঙ্গ ড. ইউনূস
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৩ ২২:৫২ পিএম
আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৩ ২২:৫৭ পিএম
ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে ৪০ বিশ্বনেতার নামে একটি বিজ্ঞাপন আকারে খোলা চিঠি প্রকাশের ঘটনায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এর সমালোচনা করেছেন। তারা এটিকে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের নতুন কৌশল বলে গণ্য করছেন।
শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের ‘অন্যায় আচরণের শিকার’- এমন অভিযোগ করা হয় খোলা চিঠিতে। গত ৭ মার্চ প্রকাশিত ওই বিজ্ঞাপনের ওপর ভিত্তি করে দেশের কয়েকটি গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হয়েছে। তবে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত বিজ্ঞাপনটিতে ড. ইউনূস কী ধরনের অন্যায় আচরণের শিকার হয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকার অভিযোগ উঠেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছেন, ড. ইউনূসের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের আচরণের বিষয়ে যে অভিযোগগুলো তুলে বিশ্বনেতারা উদ্বেগ জানিয়েছেন, সেগুলো একেবারে অলীক।
গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, ‘পৃথিবী স্বীকার করেছে, বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। অনেকে, যারা বাংলাদেশকে দেখতে পারেন না, শেখ হাসিনাকে দেখতে পারেন না, তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভিন্ন রকমের প্রচেষ্টা চালান। শেখ হাসিনার কারণেই এই উন্নয়নগুলো তরতর করে হচ্ছে। তারে (শেখ হাসিনা) যদি বাদ দিতে পারি, তাহলে এখানে একটি অস্থিতিশীলতা হবে। সেই তালেই তারা আছেন। সে জন্যই তারা বিভিন্ন ফন্দিফিকির করছেন। বাট আই মাস্ট সে- এগুলো হচ্ছে আঙুর ফল টক। যে অভিযোগ (খোলা চিঠিতে) করেছেন, আই মাস্ট সে, এগুলো একেবারে অলীক।’
এদিকে খোলা চিঠির নামে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে এ রকম একটি বিজ্ঞাপন ছাপানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।
শুক্রবার (১০ মার্চ) সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটি একটি বিজ্ঞাপন। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রায় কোটি টাকা খরচ করে ৪০ জনের নামে একটি বিজ্ঞাপন ছাপানো হয়েছে। বিজ্ঞাপন আর বিবৃতির মধ্যে পার্থক্য আছে। এ রকম বিবৃতি কেনা বা বিজ্ঞাপন দিয়ে বিবৃতি, সেটাকে আবার কোটি টাকা খরচ করে প্রকাশ করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত, সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। যেভাবেই হোক ইউনূস সাহেব নোবেলজয়ী। তার পক্ষে এ রকম একটা বিবৃতি বিজ্ঞাপন দিয়ে ছাপানো, এটি তার ব্যক্তিত্বকেই খর্ব করেছে। আমার প্রশ্ন, তার এত টাকা কোথা থেকে আসে?’
প্রসঙ্গত ওয়াশিংটন পোস্টের বিজ্ঞাপনে ব্যাপক তথ্য ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। এতে ড. ইউনূস সারা বিশ্বে যে মানবিক কার্যক্রম চালিয়েছেন বা দেশে যে কার্যক্রমগুলো চালাচ্ছেন তার প্রশংসা করে সেগুলো অব্যাহত রাখতে পারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ হয়েছে। যদিও সেগুলো কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হলো কিংবা কোথায় কে বন্ধ করে দিল সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু নেই। প্রশ্ন উঠেছে, ড. ইউনূসের কি বিদেশ যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা আছে? বাধাহীনভাবেই তিনি দেশের বাইরে শত শত জায়গায় যাচ্ছেন। তার কার্যক্রমের ওপর কোথাও বাধা নেই।
অনেকেই বলছেন, ড. ইউনূসের সঙ্গে সরকার এমন কোনো আচরণ করেনি যার জন্য খোলা চিঠি, তা-ও বিজ্ঞাপন দিয়ে ছাপাতে হবে। লাখ লাখ ডলার খরচ করে বিবৃতি বিজ্ঞাপন দিতে হবে। নিউজ আইটেম যখন বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার করতে হয়, তখন বুঝতে হবে এর মধ্যে প্রচারিত তথ্যই বানোয়াট।
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। এক যুগ আগে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা সরানোর বিষয়ে একটি তথ্যচিত্র সম্প্রচার করা হয়। বর্তমানে ড. ইউনূসের গ্রামীণ টেলিকমের দুর্নীতির অনুসন্ধান চলছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অর্থ লোপাট, কল্যাণ তহবিলের অর্থ বিতরণ না করে ৪৫ কোটি ৫২ লাখ ১৩ হাজার টাকা আত্মসাৎ এবং ২ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সহযোগী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করার অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে এরই মধ্যে গ্রামীণ টেলিকমের এমডি নাজমুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক।
এ ছাড়া ১/১১ সেনা-সমর্থিত সরকারের সময় প্রধান দুই দলের নেত্রীকে মাইনাস করে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে। ওই সময় গ্রামীণ পার্টি নামে একটি দল করারও ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বাতিলের নেপথ্যে তার নেতিবাচক ভূমিকাকে বহুলাংশে দায়ী করা হয়।
ড. ইউনূসের গ্রামীণ টেলিকমের দুর্নীতির অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায় গত ৬ অক্টোবর তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে সুইডেনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নেত্রনিউজ। যুক্তরাষ্ট্রের একটি এনজিওর অর্থায়নে চলে অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটি। ওই প্রতিবেদনটি করেন বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া বিতর্কিত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন ইউনূসের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে।
এর এক সপ্তাহ পর ১৩ অক্টোবর ড. ইউনূসকে ‘মহানায়ক’ বানিয়ে খবর প্রকাশ করে ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য ইকোনমিস্ট। সেখানে বলা হয়, নোবেলজয়ী ইউনূসের বিরুদ্ধে নিপীড়ন বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি তাকে দুদকে উপস্থিত হতে হবে। আসতে পারে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞাও। যদিও এখন অবধি এ-জাতীয় কিছুই ঘটেনি।
এই প্রেক্ষাপটে সর্বশেষ ওয়াশিংটন পোস্টে ৪০ বিশ্বনেতার বিবৃতি প্রকাশকে ধারাবাহিক অপ্রচারের অংশ হিসেবেই দেখছেন দেশের সচেতন মানুষ।