প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২২ ১১:০৭ এএম
আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২২ ১৩:০২ পিএম
একাত্তরের ৩০ আগস্ট পাকিস্তানিরা তুলে নিয়ে যায় আলতাফ মাহমুদকে। ছবি : সংগৃহীত
একাত্তরের আগস্ট। যুদ্ধ চলছে সারা দেশে। আশঙ্কা-আতঙ্ক আর মুক্তির সুপ্ত প্রত্যাশা নিয়ে দিনযাপন করছে ঢাকাসহ সারা দেশের অবরুদ্ধ মানুষ। মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণে বিপর্যস্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। নাকানিচুবানি খেয়ে ভয়ঙ্কর ক্ষ্যাপাটে আর নৃশংস হয়ে উঠেছে তারা। গড়ে তুলেছে বিভিন্ন স্থানে টর্চার সেল। এ রকমই একটি টর্চার সেল ছিল ঢাকার তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ার ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এমপি হোস্টেলে।
একাত্তরের ৩০ আগস্ট এই টর্চার সেলে ধরে নিয়ে আসা হয় কিংবদন্তি গীতিকার-সুরকার আলতাফ মাহমুদ এবং তাঁর চার শ্যালক লিনু বিল্লাহ, দিনু বিল্লাহ, নুহে আলম বিল্লাহ ও খাইরুল আলম বিল্লাহকে। ঘটনাক্রমে সেদিন তাঁদের সঙ্গে ছিলেন চিত্রশিল্পী আবুল বারক আলভীও। তাঁকেও ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা।
আলতাফ মাহমুদের বাসা ছিল ৩৭০ আউটার সার্কুলার রোডে-রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উল্টোদিকে। সে বাসার রান্নাঘরের পেছনে একটি জায়গায় ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলাদের অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ পুঁতে রাখা হয়েছিল। আলতাফ মাহমুদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে পাকিস্তানি সেনারা বাধ্য করে স্থানটি খুঁড়ে অস্ত্রশস্ত্র বের করতে। তারপর তাদের একটি গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় টর্চার সেলের মার্শাল ল কোর্টে। সেখানে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয় তাদের ওপর।
পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম নির্যাতনে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত আলতাফ মাহমুদ জিজ্ঞাসাবাদে জানান, এই অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদের সব দায় তাঁর একার। অন্য সবাই নির্দোষ।
চিত্রশিল্পী আবুল বারক আলভী সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আলতাফ মাহমুদকে যখন মার্শাল ল কোর্টে তোলা হলো তখন তাঁর মধ্যে কোনো ভাবান্তর ছিল না। অথচ আমরা সবাই ভীষণ আতঙ্কিত। তিনি যেন বুঝেই গিয়েছিলেন তাঁর গন্তব্য। আলতাফ ভাই বলেছিলেন, আমার সঙ্গে যারা এসেছে, আমি ছাড়া আর কেউই অস্ত্রের ব্যাপারে কিছু জানে না।’
এরপর আবুল বারক আলভীদের ছেড়ে দেওয়া হলেও আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে যাওয়া হয় আরেকটি টর্চার সেলে। তারপর তাঁর আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
পাকিস্তানিরা আলতাফ মাহমুদকে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে আলতাফ মাহমুদ তাঁর স্ত্রী সারা আরা মাহমুদকে বলেছিলেন, ‘তুমি এত ভয় পাও কেন?’
অকুতোভয় এই মানুষটি সেদিন চলে যাওয়ার আগে বাসায় আরও রেখে গিয়েছিলেন ছোট্ট মেয়ে শাওনকে। প্রাণের মায়া না করে সহ্য করেছিলেন পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতন-নিপীড়ন। সেই থেকে ৩০ আগস্ট তারিখটি সারা দেশের মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে প্রেরণাময় একটি দিবসÑআলতাফ মাহমুদের অন্তর্ধান দিবস।
দিবসটিকে সামনে রেখে আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের রক্তঝরা দিনগুলোতে কিংবদন্তি সুরকার আলতাফ মাহমুদের লেখা গানের খাতা এবং ওই সময়ে লেখা চিঠির সংকলন নিয়ে বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শাওন বলেন, ওই গানের খাতায় লিপিবদ্ধ করা অপ্রকাশিত স্বরলিপি ও চিঠিগুলো আমি ও মা বহু কষ্টে সংরক্ষণ করেছি। দুজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা হয়েছে। বাবার অন্তর্ধানের পর ১নং মালিবাগে বঙ্গবন্ধু আমাদের বাসা বরাদ্দ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর সেই বাড়ি থেকে আমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। তখন বাবার অনেক স্মৃতিচিহ্নই আমাদের হারাতে হয়েছে। তবুও যেটুকু রাখতে পেরেছি, তা এবার প্রকাশ করতে যাচ্ছি।
তিনি জানান, আলতাফ মাহমুদের লেখা ও সুর করা ‘হাজার তারের বীণা’ নৃত্যনাট্যটি নতুন আঙ্গিকে মঞ্চে আনবেন তারা।
কিংবদন্তি আলতাফ মাহমুদের সুরারোপিত অনেক গান তাঁর অন্তর্ধানের পর কোনো কোনো সুরকার ও শিল্পী নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন শাওন মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘ওরা ভেবেছে বাবা যেহেতু নেই, সেহেতু গানগুলো তারা নিে নেবে। তখন লেখা বা সুর করা গানের তো কোনো ডকুমেন্ট ছিল না। অনেক সময় গান লিখে ছিঁড়ে ফেলতে হতো। সাথে সাথে সুর করে তা রেকর্ড করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে দিতে হতো। যুদ্ধের পর বাবার কত গানের যে কথা ও সুর বদলে গেছে!’
আলতাফ মাহমুদ স্মরণে তাঁর পরিবার ও ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট প্রতিষ্ঠা করেন আলতাফ মাহমুদ ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশন প্রতিবছর দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের ‘আলতাফ মাহমুদ পদক’ দেয়। তবে করোনা মহামারির কারণে গত তিন বছর ধরে এই পদক প্রদান অনুষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।
শাওন মাহমুদ জানান, উপযুক্ত সময়ে আলতাফ মাহমুদের জন্মদিন বা অন্তর্ধান দিবসে আবারও এ পদক দেওয়া শুরু হবে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, ফেরদৌসী মজুমদার, সৈয়দ হাসান ইমাম, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, সংগীতশিল্পী অজিত রায় ও বিপুল ভট্টাচার্য, সাবিনা ইয়াসমীন, সুধীন দাশ, আলম খান, মুস্তাফা মনোয়ার, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এরই মধ্যে এ পদক পেয়েছেন। পদকের মূল্যমান ১০ হাজার টাকা।
আলতাফ মাহমুদের জন্ম ১৯৩৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর, বরিশাল চেলার মুলাদি উপজেলার পাতারচর গ্রামে। তাঁর পারিবারিক নাম এএনএম আলতাফ আলী। পরে দাদা আল মাহমুদের উপাধি নিয়ে তিনি নাম বদলে রেখেছিলেন আলতাফ মাহমুদ।
শৈশবে দুষ্টুমি করে গ্রামের বাড়িতে কাঁঠালগাছের বাকল খুঁড়ে তিনি নিজের নাম লিখেছিলেন ‘ঝিলু দ্য গ্রেট’। সেটি দেখতে পেয়ে তার বাবা নাজেম মিয়া হাওলাদার তাঁকে বলেছিলেন, গাছে খোদাই করে আর গানবাজনা করে কি আর ঝিলু দ্য গ্রেট হওয়া যায় রে? পড়াশোনা না করলে তুই কোনোদিনই গ্রেট হতে পারবি না।
তা শুনে আলতাফ মাহমুদ বলেছিলেন, আমি ঝিলু দ্য গ্রেট হয়েই দেখাব।
বরিশাল জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাসের পর তিনি ব্রজমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। তখন থেকেই বরিশালের খ্যাতনামা বেহালাবাদক সুরেন রায়ের কাছে তিনি সংগীতের তালিম নিতে শুরু করেন। সক্রিয় হন সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে। চিত্রকলা শেখার জন্য ভর্তি হন কলকাতা আর্ট কলেজে। ১৯৫০ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পর আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানে সুরারোপ করে তিনি গানটিকে বাঙালির হৃদয়ের সংগীতে পরিণত করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি প্রচারাভিযানে তাঁর গাওয়া দুটি গান ‘মন্ত্রী হওয়া কি মুখের কথা’ এবং ‘মোরা কি দুঃখে বাঁচিয়া রবো’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং তাঁর নামে হুলিয়াও জারি হয়। ১৯৬৯ সালে জহির রায়হান ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে এই সুরারোপিত গানটি ব্যবহার করেন।
১৯৫৬ সালে আলতাফ মাহমুদ করাচি বেতারে প্রথম সংগীত পরিবেশন করেন। তিনি ‘ইত্তেহাদে সিকি’ নামে দশ মিনিটের একটি অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন। তিনি ১৯৬৫ সালে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ দেবু ভট্টাচার্যের। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে সংগীতও পরিচালনা করেন তিনি।
১৯৬৭ সালে পল্টনে মঞ্চস্থ হয় আলতাফ মাহমুদের গীতিনাট্য ‘জ্বলছে আগুন ক্ষেত খামার’। এই গীতিনাট্যে তিনি গাইলেন ‘ও বাঙালি, তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’। ১৯৭১ সালে মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় স্বাধীনতার দাবিতে যেখানেই যে অনুষ্ঠান হতো সেখানেই আলতাফ মাহমুদ অংশ নিতেন। যুদ্ধ শুরুর পর তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দেশপ্রেমমূলক নানা গান রচনা ও সুর করতেন। তারপর তা রেকর্ড করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিতেন।
ঢাকা শহরে গেরিলা আক্রমণ চলে ২নং সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ ও মেজর হায়দারের নেতৃত্বে। তাদের সহযোগিতা করার জন্য ছাত্র-তরুণদের নিয়ে গঠিত হয় ক্র্যাক প্লাটুন। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একটি অপারেশন হয়। এতে যুক্ত ছিলেন আলতাফ মাহমুদ, হাফিজ ও সামাদ। তারা বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের ঢাকায় অবস্থানকালে হোটেলটিতে বোমা বিস্ফোরণ ঘটান। এ খবর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
পরে আলতাফ মাহমুদ তাঁর বাসায় ক্র্যাক প্লাটুন সদস্যদের অস্ত্রশস্ত্র ও অব্যবহৃত গোলাবারুদ লুকিয়ে রাখেন। পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা এ খবর জেনে যায়। ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট ভোরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আলতাফ মাহমুদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। কিন্তু মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও তাদের অত্যাচারে তিনি মাথা নত করেননি ‘ঝিলু দ্য গ্রেট’ থেকে হয়ে উঠেছেন অকুতোভয় এক মুক্তিপথিক।
প্রবা/ইউরি