রাশেদুল হাসান
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১০:৩৫ এএম
আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১১:৩৭ এএম
প্রবা ফটো।
বায়ুদূষণে মাঝেমধ্যেই বিশ্বে শীর্ষস্থানে থাকে ঢাকা। এখানে দূষণের অন্যতম কারণ বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য মোটরযানের বিষাক্ত ধোঁয়া। কিন্তু যানবাহনের ধোঁয়া নিঃসরণ পরীক্ষার কোনো যন্ত্র নেই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে। ফলে ফিটনেস সনদ দেওয়া ও নবায়নের সময় এই নিঃসরণের মাত্রা পরীক্ষা করতে পারে না প্রতিষ্ঠানটি। আবার দূষণকারীদের শাস্তির আওতায়ও আনা যায় না।
বিআরটিএ কর্মকর্তারা জানান, কোন যানবাহন কী পরিমাণ ধোঁয়া নিঃসরণ করছে, তা শুধু চোখের দেখায় পরীক্ষা করা হচ্ছে। যেসব গাড়িতে কালো ধোঁয়া স্পষ্ট দেখা যায়, শুধু সেগুলোকেই আনা হচ্ছে আইনের আওতায়। ফলে বেড়েই চলছে দূষণ।
কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৮টি নিবন্ধিত মোটরযান রয়েছে। এর বাইরে অনিবন্ধিত অবস্থায় রয়েছে আরও কয়েক লাখ। আর ঢাকায় এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা ১৯ লাখ ৬৬ হাজার ৪৯৫টি।
বিআরটিএর ৬৪ জেলা সার্কেল এবং ছয়টি মেট্রো সার্কেল থেকে ফিটনেস সনদ ও রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। কিন্তু ধোঁয়া দূষণ পরীক্ষার কোনো যন্ত্র নেই তাদের কাছে।
বিআরটিএর কাছে না থাকলেও সরকারের আরেক প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে এ ধরনের পরীক্ষা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) মোহাম্মাদ আবদুল মোতালিব জানান, পেট্রোলের জন্য গ্যাস অ্যানালাইজার এবং গ্যাস ও ডিজেলচালিত যানবাহনের জন্য স্মোক মিটার নামের আলাদা দুটি পরীক্ষা যন্ত্র ব্যবহার করেন তারা। মানভেদে বর্তমানে এসব যন্ত্রের দাম ১০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মতো।
পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ এবং বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২২-এ মোটরযানের ধোঁয়া নিঃসরণে বিভিন্ন পদার্থের আদর্শমাত্রার কথা বলা আছে। এতে প্রতি কিলোমিটারে ও ঘণ্টায় কতটুকু কার্বন, হাইড্রোকার্বন, নাইট্রোজেনের অক্সাইড, মনোক্সাইড, বস্তুকণা নিঃসরণ করা যাবে (অনুমিত) সেটি বলা আছে। মোটরযানের বিভিন্ন ধরন যেমন- নতুন, পুরোনো, যাত্রীবাহী, ব্যক্তিগত এবং ডিজেল, পেট্রোল ও ইঞ্জিন অয়েলচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য। বিধিমালায় বিআরটিএ-কে দূষণকারী যানবাহন বন্ধ, নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশবান্ধব যানবাহন চালুর ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদরা বলছেন, চোখের দেখা নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে দূষণকারী মোটরযানকে শাস্তির আওতায় আনা দরকার।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ‘চোখের দেখায় যদি এ ধরনের বৈজ্ঞানিক সূচকগুলো নির্ণয় করতে হয়, তাহলে এটা দিন শেষে অবৈধ আয়ের উৎস হওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না। কেউ বলবে বেশি, কেউ বলবে কম। বিজ্ঞান হলো এমন একটা জিনিস, যার মাধ্যমে একটি প্রতিবেদন বের হবে। সূচক দেওয়া থাকবে। মাত্রার বাইরে যেগুলো যাবে, সেগুলো দূষণকারী হিসেবে চলার জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবে।’
এই গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বলেন, পরিদর্শনকালে মোটরযানের হেডলাইটের অ্যালাইনমেন্ট, হুইলের অ্যালাইনমেন্ট ও সাসপেনশন কিছুই দেখা হয় না। বিআরটিএ’র কাছে নিবন্ধন মানে শুধু প্রয়োজনীয় ফি জমা নেওয়া।
বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, যিনি দূষণ করেন তিনি যদি জানতেন তবে কিছুটা ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু চোখের আন্দাজে যখন পরিমাপ করা হয়, তখন তিনিও বুঝতে পারেন সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করা যাবে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের যুগে নিঃসরণ মাপার যন্ত্র না থাকা যুগের সঙ্গে যায় না।
বিআরটিএর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যমতে, ভারী যানবাহনের ফিটনেস সনদের জন্য ৯০০ টাকা এবং পরিদর্শন ফি বাবদ ৪৫০ টাকা দিতে হয়। ভারী ব্যতীত অন্যান্য মোটরযানের জন্য দিতে হয় ৪৫০ টাকা সনদ ফি এবং ৪৫০ টাকা পরিদর্শন ফি।
২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৩২২টি ফিটনেস সনদ ইস্যু ও নবায়ন করে বিআরটিএ। অর্থাৎ সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবস হিসেবে দৈনিক গড়ে ২ হাজার ১৬২টি সনদ দেয় তারা।
বিআরটিএ ফিটনেস সনদ দেয় যেভাবে
গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুর-১৩ এলাকায় ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এর কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকের সামনের রাস্তা ও ভেতরে সারি সারি গাড়ি। কিন্তু যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্রটি ফাঁকা। কারণ জানতে চাইলে বিআরটিএর কর্মচারীরা জানান, এখানে গাড়ি পরিদর্শন হয় না। কাজ হয় ফটকের সামনের রাস্তায়।
বেলা আড়াইটায় তাজুল ইসলাম নামের একজন মোটরযান পরিদর্শক একটি বাসের সামনে দাঁড়ালেন। তিনি বাসের সঙ্গে একটি ছবি তুললেন। তারপর চালককে বললেন, ‘আপনি এখন আসতে পারেন।’ ফিটনেস পরীক্ষার সময় কী কী বিষয় পরীক্ষা করা হয়, জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএ কেরানীগঞ্জ অফিসের একজন পরিদর্শক বলেন, ‘ফিটনেস পরীক্ষায় গাড়ির ইঞ্জিন, ব্রেক, লাইট ও নিঃসরণ দেখতে হয়। ভেহিক্যালস ইন্সপেকশন সেন্টার আছে শুধু মিরপুরে। ফলে আমরা খালি চোখে যা দেখি, তাতেই হয়ে যায়।’
নিঃসরণ পরীক্ষা কীভাবে হয়? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘চোখ দিয়ে দেখি কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে কি-না। এর বেশি আর কী দেখব? আমাদের তো খুঁটে খুঁটে পরীক্ষা করার মতো মেশিন নেই।’
স্বাভাবিক শ্বাস নিতে পারছে না শিশু
রাজধানীর ১০টি বিদ্যালয়ের ওপর করা আন্তর্জাতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যানবাহন থেকে নির্গত গ্যাস ও অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণা শ্রেণিকক্ষের ভেতর জমে থাকছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সেন্টার ফর ক্লিন এয়ার রিসার্চ, যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে- স্কুলগুলোর ৪০ শতাংশ শিশু স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছে না। নিঃশ্বাস পরিমাপ করার বিশেষ যন্ত্র ফ্লো মিটার দিয়ে করা পরীক্ষায় বেশিরভাগ শিশুর মধ্যে বায়ুদূষণজনিত কোনো না কোনো সমস্যা পাওয়া গেছে।
কর্তৃপক্ষ কী বলছে
বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার নিজেও মোটরযানের ধোঁয়া দূষণরোধে অক্ষমতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে জানিয়েছেন, কালো ধোঁয়ার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিঃসরণ পরিমাপের যন্ত্র কেনার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।
বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শীতাংশু শেখর বিশ্বাস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট শীর্ষক একটি প্রকল্প নিচ্ছি। খুব শিগগিরই এটা শুরু হবে। এর আওতায় ভেহিক্যাল এক্সহস্ট টেস্টার মেশিন কিনব। সব কয়টি সার্কেল অফিসে দিতে না পারলেও গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলগুলোতে এই মেশিন দেওয়া হবে।’