প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২২ ২০:৪৯ পিএম
আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২২ ২১:৩৩ পিএম
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আলোচনা সভায় বক্তারা। প্রবা ফটো
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের প্রকৃত চেহারা ও তাদের রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের রাজনীতি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে বলে অভিমত এসেছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আলোচনা সভা থেকে।
ভার্চুয়াল মাধ্যমে আয়োজিত ওই সভায় সংযুক্ত হয়ে লেখক-সাংবাদিক, ব্লগার, নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলেছেন, ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিশন গঠন করা যেতে পারে।
তারা বলেন, ২১ আগস্টের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।
আলোচনায় যুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্রিটিশ মানবাধিকার নেতা জুলিয়ান ফ্রান্সিস বলেন, '২১ আগস্টের ঘটনার দিন আমি ঢাকায় ছিলাম। নিরাপত্তার জন্য আমি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অফিসে গিয়েছিলাম। এই ঘটনা নানাভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার মানসিকতাও দেখেছি।’
ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বলেন, ‘রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও রাষ্ট্রযন্ত্র--এই তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যাসহ শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা করার জন্যই ২১ আগস্ট হামলা করেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা।’
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি জঙ্গিবাদকে অগ্রসর করছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘জঙ্গিবাদের যারা অর্থায়ন করছে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা দমন করা যাচ্ছে না। যে রাজনীতি ২১ আগস্টের ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে তাদের চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।'
প্রাক্তন আইজিপি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মোহাম্মদ নুরুল আনোয়ার বলেন, ‘পাকিস্তানের আইএসআইয়ের সাহায্য নিয়ে এ ঘটনায় জড়িত দুজন অফিসার হারিস চৌধুরী ও সে সময়ের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের সঙ্গে আলোচনা করে ২১ আগস্ট ঘটনার পরিকল্পনা করেছিলেন। আফগান ফেরত জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যরাও সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। যাদের নাম সামনে এসেছে তারা ছাড়াও এই ঘটনায় আরও অনেকে জড়িত ছিল। ২১ আগস্টের কুশীলবদের অনেকের নাম আড়ালে থেকে গেছে। তাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল বলেন, 'শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থায় ধর্মের প্রভাব প্রতিফলিত। আজ পর্যন্ত মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে না পারায় বর্তমানে দেশের এই অবস্থা। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধরে রাখতে হলে আইনের ভূমিকা, গণতন্ত্রের চর্চা, বহুসংস্কৃতির সমাজব্যবস্থাকে আরও জোরদার করতে হবে।’
ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা বলেন, ‘সংগঠন হিসেবে হরকাতুল জিহাদ নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু একই অপরাধ করেও বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের বিচার হচ্ছে না, এরা নিষিদ্ধ হচ্ছে না। দল হিসেবে বিচার না হলে এরা বারবার হত্যা করবে, হত্যাচেষ্টা করবে, শুধু সহযোগী বদলাবে। শেখ হাসিনা বা বাংলাদেশের অস্তিত্ব, কোনোটাই এদের হাতে নিরাপদ নয়।’
আলোচনায় আরও যুক্ত হন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক এলাহী, নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী জাগরণ-এর যুগ্ম সম্পাদক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লেখক মারুফ রসুল, নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভিন, নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় আইন সহায়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নাসির মিয়া।
সভাপতির বক্তব্যে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারে মাঠ পর্যায়ের ঘাতকদের শাস্তি হলেও যে রাজনীতি ও সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড আমাদের দেশে সংঘটিত হয়েছে তার বিচার হয়নি। ঘাতকদের দল শুধু রাজনীতিই করছে না, প্রকাশ্যে স্লোগান দিচ্ছে- ’৭৫-এর হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার।’
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে ধর্মের নামে রাজনীতি ও সন্ত্রাস নিষিদ্ধ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘যারা পর্দার আড়ালে থেকে, রাজনীতির কারণে বঙ্গবন্ধুর কন্যার ওপর বারবার হামলা করেছে এবং হত্যার উদ্যোগ নিয়েছে সেই রাজনীতি এবং তার মূল নেতৃত্বকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
‘আজকের এই অনুষ্ঠান থেকে আমরা সরকারের নিকট দাবি জানাচ্ছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের প্রকৃত চেহারা এবং তাদের রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের রাজনীতি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ’২১ আগস্টের কুশীলব কারা ছিলেন তা অবশ্যই খুঁজে বের করে জনসমক্ষে প্রবেশ করতে হবে। আমরা ইতোমধ্যে কাজ করছি এ বিষয়ে। কয়েক জনকে চিহ্নিত করেছি। খুব শিগগির আমাদের কাজের একটা আশাব্যঞ্জক সমাধানে পৌঁছতে পারব।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে নৃশংস গ্রেনেড বোমা হামলা নিয়ে শাহরিয়ার কবিরের প্রামাণ্যচিত্র ‘জিহাদের প্রতিকৃতি’র সংক্ষিপ্ত ভাষ্য প্রদর্শিত হয়।
প্রবা/রাই/জেআই