গাজীপুর ও টঙ্গী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৩ ০৮:৫৯ এএম
বিশ্ব ইজতেমার ময়দান। ছবি: প্রবা
দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর জোবায়েরপন্থিদের প্রথম পর্ব দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্ব পান সাদপন্থিরা। তবে আগামীতে নিজেদের প্রথম পর্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। এদিকে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে আজ রবিবার শেষ হচ্ছে ৫৬তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। রবিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুর ১২টা এই মোনাজাত পরিচালনা করবেন মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বড় ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী। এ সময় বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ার মানুষের সুখ, শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করা হবে। মন্ত্রিপরিষদের একাধিক সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা মোনাজাতে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
দ্বিতীয় পর্বের ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক জিম্মাদার মাওলানা আব্দুল্লাহ মনসুর জানিয়েছেন, তাদের মুরব্বিরা আগামীতে প্রথম পর্বে ইজতেমা আয়োজনের দাবি তুলেছেন। মাওলানা সাদ কান্ধলভিকে ছাড়াই এবারের আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে তার তিন ছেলে ও জামাতা এসেছেন। আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় ইজতেমার প্রথম পর্বের মতো এ পর্বেও মুসল্লিদের ঢল লক্ষণীয়। গতকাল শনিবারও টঙ্গীর তুরাগতীরে ছিল লাখো মুসল্লির পদচারণ। এদিন টঙ্গী অভিমুখী বাস, ট্রাক, ট্রেন, লঞ্চসহ বিভিন্ন যানবাহনে ছিল মানুষের ব্যাপক ভিড়। সকালেই টঙ্গী শহর, ইজতেমাস্থল ও সংলগ্ন এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় ইজতেমা ময়দান। মূল প্যান্ডেলে স্থান না পেয়ে অনেকে নিজ উদ্যোগে বাইরে পলিথিন ও কাপড়ের শামিয়ানা টানিয়ে তাতে অবস্থান নিয়েছেন। এ পর্বে শনিবার দুপুর পর্যন্ত ৬০টি দেশের প্রায় ছয় হাজার বিদেশি মুসল্লি অংশ নেন বলে জানা গেছে।
এবারের দুই পর্বের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরু হয় গত ১৩ জানুয়ারি। ১৫ জানুয়ারি এটি শেষ হওয়ার পর ২০ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব। আজ এই পর্বের আখেরি মোনাজাতকে সামনে রেখে শনিবার রাত থেকে ওই এলাকায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে পুলিশ। আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব বিধিনিষেধ বলবৎ থাকবে।
ইজতেমা ঘিরে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রায় ১২ হাজার র্যাব ও পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি রয়েছে সাদা পোশাকে প্রায় তিন হাজার গোয়েন্দা সদস্য। আকাশ ও নৌপথে রয়েছে র্যাবের সতর্ক নজরদারি।
যাদের বয়ান শুনলেন মুসল্লিরা : ভারতের মাওলানা ইয়াকুব জিলানির বয়ানের মধ্য দিয়ে শনিবার শুরু হয় দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম। তিনি তাবলিগের ছয় উসুলের (মৌলিক বিষয়ে) ওপর বয়ান করেন। এ বয়ান বাংলায় তরজমা করেন বাংলাদেশের মাওলানা মনির বিন ইউসুফ। এরপর বাদ জোহর তুরস্কের মাওলানা ওমর, বাদ আসর মাওলানা সাদ কান্ধলভীর তৃতীয় ছেলে মাওলানা ইলিয়াস বিন সাদ কান্ধলভী এবং বাদ মাগরিব ভারতের মাওলানা আব্দুস সাত্তার বয়ান করেন। তাবলিগের ছয় উসুলের মধ্যে দাওয়াতে দ্বীনের মেহনতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তারা।
বয়ানে মুরব্বিরা বলেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে আমাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দুনিয়াতে যে একবার আসবে তাকে মরতে হবে। এই সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তন হবে না। দুনিয়া হচ্ছে ধোঁকার ঘর, ধোঁকার জীবন। মিছে এই দুনিয়ার আরাম-আয়েশের কথা ভুলে গিয়ে আখেরাতের কথা চিন্তা করুন। দুনিয়ার জিন্দেগি ক্ষণস্থায়ী। সবাইকে দ্বীনের মেহনত করতে হবে। আল্লাহর কাছে আমল ছাড়া এ দুনিয়ার জিন্দেগির কোনো মূল্য নেই।
৫ মুসল্লির মৃত্যু : এ পর্বের ইজতেমায় পাঁচ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন ঢাকার কদমতলী থানার পূর্ব জুরাইন এলাকার বাসিন্দা আব্দুল জব্বারের ছেলে আব্দুল হান্নান (৪৫), গাইবান্ধার শুক্কুর মণ্ডলের ছেলে আব্দুল হামিদ মণ্ডল (৫৫), রাজধানীর গুলিস্তানের বঙ্গবাজার এলাকার ব্যবসায়ী বোরহান উদ্দিন (৪৮), ঢাকার সাভারের বাসিন্দা আব্দুল আলীমের ছেলে মফিজুল ইসলাম (৫৪) এবং বরগুনার আব্দুল আলীর পুত্র মফিজুল ইসলাম (৭৫)।
ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের মিডিয়া সমন্বয়ক মোহাম্মদ সায়েম জানান, শুক্রবার এশার নামাজের সময় খিত্তায় বসে জিকিররত অবস্থায় আব্দুল হান্নান অজ্ঞান হয়ে সেখানেই মারা যান। ব্যবসায়ী বোরহান একইদিন রাত ১১টায় খিত্তায় অবস্থানকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সন্ধ্যায় গাইবান্ধার শুক্কুর মণ্ডল মারা যান। এ ছাড়া একইদিন ভোরে সাভারের শিমুলতলি এলাকার মফিজুল ইসলাম মারা যান।
যৌতুকবিহীন বিয়ে : গতকাল শনিবার বাদ আসর ইজতেমা ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় যৌতুকবিহীন বিয়ের আসর। তাবলিগের রেওয়াজ অনুযায়ী ইজতেমার দ্বিতীয় দিন বাদ আসর যৌতুকবিহীন বিয়ের আয়োজন করা হয়। কনের সম্মতিতে, তার অনুপস্থিতিতে উভয়পক্ষের লোকজনের উপস্থিতিতে এই কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। বিয়েতে মোহরানা ধার্য করা হয় ‘মোহর ফাতেমি’র নিয়মানুযায়ী। এ নিয়ম অনুযায়ী মোহরানার পরিমাণ ধরা হয় দেড়শ তোলা রুপা বা এর সমমূল্যের অর্থ। বিয়ের পর নবদম্পতিদের সুখ-সমৃদ্ধিময় জীবন কামনা করে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের দরবারে মোনাজাত করা হয়। এ সময় মঞ্চের আশপাশের মুসল্লিদের মাঝে খেজুর ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
মুসল্লিদের নির্বিঘ্ন যাতায়াতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা : গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোল্ল্যাহ নজরুল ইসলাম জানান, মুসল্লিদের আসা-যাওয়া নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শনিবার মধ্যরাত থেকে রবিবার বিকাল পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস মোড় থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত সড়কে অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের গাড়ি ছাড়া সব ধরনের সাধারণ যান চলাচল বন্ধ থাকবে। টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের মীরেরবাজার থেকে টঙ্গী স্টেশন রোড হয়ে কামারপাড়া এবং সাভারের বাইপাইল থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত সড়কের জন্য এটি প্রযোজ্য হবে।
এ ছাড়া ঢাকা বাইপাস সড়কের ভোগড়ায়, শাখা রোড বোর্ডবাজার, মীরেরবাজার থেকে আসা প্রত্যেকটি সড়কের ক্রসিংগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে রবিবার ভোর থেকে গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস মোড় এলাকা থেকে ইজতেমাস্থল পর্যন্ত মুসল্লিদের সুবিধার্থে পুলিশের পক্ষ থেকে শাটল বাস (ইজতেমার স্টিকার লাগানো) চলাচল করবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ ট্রাফিক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে বিশেষ ট্রেনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। ইজতেমা উপলক্ষে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-চট্রগ্রাম রুটের ট্রেনগুলো টঙ্গী রেলস্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে।
নিরাপত্তা : ইজতেমা উপলক্ষে ময়দানসহ সংলগ্ন এলাকায় পাঁচ স্তরের কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা তল্লাশি পেরিয়ে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করতে হচ্ছে। প্যান্ডেলের ভেতর ও বাইরে মুসল্লিবেশে রয়েছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রায় তিন হাজার সদস্য। ইজতেমা ময়দানের সব প্রবেশপথে সিসি ক্যামেরা এবং বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।