প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬ ১৬:০০ পিএম
আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬ ১৬:০২ পিএম
২০২৪ সালে ১৪ জুলাই রাতে স্লোগানে স্লোগানে মুখর ছিল ঢাবি চত্বর। ছবি: ভিডিও থেকে
তখনও রাতের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ছিল কিছুটা স্বাভাবিক। তবে চারদিকে একটি স্লোগান ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তেই বদলে যায় পরিস্থিতি। হঠাৎই উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। হলপাড়া থেকে একের পর এক মিছিল বের হতে থাকে। সবার মুখে ধ্বনিত হতে থাকে একই স্লোগান ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’।
হলপাড়ার কণ্ঠগুলো মিলিত হয় টিএসসি চত্বরে। এরপর বের হয় সম্মিলিত বিক্ষোভ মিছিল। সেদিন রাতের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে। রাতারাতি স্লোগানটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে।
দাবানলের মতো তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। নিমিষেই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। পুরো দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। সেদিন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট ছিল এ্ রাত এবং এই রাতের স্লোগান। এই স্লোগানে বিদীর্ণ হয় রাতের নিস্তব্ধতা। রাতটি ছিল ১৪ জুলাই ২০২৪। এ ঘটনার মাত্র ২১ দিনের মাথায় ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে সেদিন বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘রাজাকারের সন্তান ও নাতিপুতি’বলে মন্তব্য করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। এই একটা কথাই যেন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
ঘটনাটি ছিল ১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে একজন টিভি সাংবাদিক মেধা ও কোটা বাছাই নিয়ে তার মতামতে বলেন, তিনি দুজনের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে বেছে নেবেন। তার বক্তব্যের এ সময়ে শেখ হাসিনা জোরের সঙ্গে বলেন, ‘অবশ্যই’। এরপর তিনি বলে ওঠেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এত ক্ষোভ কেন? তার মানে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা মেধাবী না। যত রাজাকারের বাচ্চারা, নাতি-পুতিরা হলো মেধাবী’।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় ওই সাংবাদিকের প্রশ্ন ও শেখ হাসিনার মন্তব্য। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ওই মন্তব্য। সন্ধ্যার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা একত্র হতে থাকেন।
মাঝরাতে শিক্ষার্থীরা হল ছেড়ে ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার-রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার-স্বৈরাচার’ স্লোগান দিতে দিতে টিএসসিতে এসে সমবেত হয়। ছাত্রীরাও হল গেটের তালা ভেঙে সেদিন আন্দোলনে যোগ দেন। তারা আরও স্লোগান দেন ‘চাইতে এলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’। এসব স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস।
বিভিন্ন হল ও আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কোটা বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। ছাত্রীরাও হল গেটের তালা ভেঙে আসেন সে আন্দোলনে। ঢাবি ক্যাম্পাস থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সেদিন কোটাবিরোধী আন্দোলন জ্বলে ওঠে দেশ।
পরদিনই ক্যাম্পাসে হামলা করে তৎকালীন সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। এ যেন বারুদে দেশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠি ছুঁয়ে গেল। শিক্ষার্থীরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ক্যাম্পাস ও হল থেকে বিতাড়িত করে ছাত্রলীগকে। ক্যাম্পাস দখলে নেয় সাধারণ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৬ বছর চেতনার মোড়কে রাজনীতি করে যাওয়া স্বৈরাচারের মসনদে ভাঙন ধরে তখনই। যদিও ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের প্রতিহত করতে মধ্যরাতেই শাহবাগে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মো. এ আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি নিখিলের নেতৃত্বে আওয়ীমী লীগ. যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সগযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয়।
তাতেও থামানো যায়নি বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের। ভোরের আলো ফুটার সাথে সাথে আবারও রাজপথে নামেন তারা। যা নড়বড়ে করে দেয় স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্ষমতার সিংহাসন।