বৃষ্টি আর ঢলের পানিতে ফুলে ফেঁপে উঠেছে খোয়াই নদ। শুক্রবার হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেলসেতু এলাকা থেকে তোলা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বন্যাপরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে লাখো মানুষ পানিবন্দি ও দুর্ভোগে পড়েছেন। বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস, পাহাড়ি ঢল ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অন্তত ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন।
গত রবিবার থেকে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা পরে বন্যায় রূপ নেয়। তবে শুক্রবার বৃষ্টিপাত কিছুটা কমায় অনেক আশ্রয়কেন্দ্রবাসী বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চলতি বন্যায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। জেলার উখিয়া ও টেকনাফে পাহাড়ধসে ১৬ রোহিঙ্গাসহ ২৭ জন নিহত হয়েছেন। বান্দরবানের লামায় পাহাড়ধসে এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে পাহাড়ি ঢলে শিশুসহ সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। রাঙামাটির সদর উপজেলা ও বিলাইছড়িতে পাহাড়ি ঢলে দুজন, বাঘাইছড়িতে পাহাড়ধসে একজন এবং লংগদুতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একজন মারা গেছেন।
বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাও বন্ধ রয়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় স্বাভাবিক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দুর্গত এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র চালু করে রান্না করা খাবার, চাল, ডাল, চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও অন্যান্য শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর জন্য সরকার নগদ অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দিয়েছে।
সাতকানিয়া–বাঁশখালীতে বন্যাপরিস্থিতি
টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম জেলায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০। এ জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন। দুর্গত মানুষের জন্য ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ২৩ হাজার ৮৫০ জন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৩ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ৯ হাজার ৮৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া মজুত রয়েছে ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ১৭ লাখ টাকা।
পাহাড়ি ঢলে দুই শিশুর মৃত্যু
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে শুক্রবার পৃথক ঘটনায় মিরাজ (৫) ও আশিক (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আশিক দক্ষিণ ইলশা গ্রামের প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে এবং মিরাজ রত্নপুর এলাকার বাসিন্দা। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বাড়ির উঠানে খেলতে গিয়ে পাহাড়ি ঢলের স্রোতে ভেসে যায় তারা। স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তাদের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে গত চার দিনে চট্টগ্রাম জেলায় পাহাড় ও দেয়ালধস-সংক্রান্ত ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরে দুজন, সীতাকুণ্ডে একজন, রাউজানে একজন, রাঙ্গুনিয়ায় একজন, বাঁশখালীতে তিনজন, আনোয়ারায় একজন এবং বোয়ালখালীতে একজন মারা গেছেন।
কক্সবাজারে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অবরুদ্ধ
টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী এলাকার বন্যাপরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। একাধিক বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় তিন উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ত্রাণ বরাদ্দের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
বান্দরবানে পানি কমলেও স্বাভাবিক হয়নি যোগাযোগ
বান্দরবানে বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি সড়কে গণপরিবহন চলাচল শুক্রবারও বন্ধ ছিল। সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে বান্দরবান-থানচি ও বান্দরবান-রুমা সড়কেও কোনো বাস চলাচল করেনি।
জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস জানান, জেলার ২২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বান্দরবান শহরের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় চার হাজার মানুষ অবস্থান করছেন। তাদের জন্য রান্না করা খাবার, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। রেড ক্রিসেন্ট, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও জেলা প্রশাসন সমন্বিতভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রাঙামাটিতে পরিস্থিতির উন্নতি, খাগড়াছড়িতে দুর্ভোগ: শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় রাঙামাটিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। তবে জেলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এখনো পানিবন্দি। বাঘাইছড়ি, লংগদু ও নানিয়াচড়ে পানি কমতে শুরু করলেও বরকল ও জুরাছড়িতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। অন্যদিকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, সদর, মহালছড়ি, পানছড়ি ও কমলছড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে। হাজারও মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বহু সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এবং কয়েক হাজার একর কৃষিজমি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন
কক্সবাজারের পেকুয়ায় টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বান্দরবান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব। শুক্রবার তিনি মেহেরনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ পরিদর্শন করেন। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রেস সচিব ছাফওয়ানুল করিম, পাউবোর কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। তিনি দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত পুনর্বাসনের আশ্বাস দেন। চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীরও শপথ নেওয়ার পরদিন বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।
পাঁচ নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে
উজানের ঢল ও নিম্নচাপজনিত টানা বর্ষণে দেশের পাঁচটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবার সকাল ৯টার তথ্যের ভিত্তিতে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং কক্সবাজারে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখতে বলা হয়েছে।
কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, বৃহস্পতিবারের তুলনায় শুক্রবার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং উজানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর আগামী দিনের বন্যা পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
হবিগঞ্জে ৩০ গ্রাম প্লাবিত
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের চরহামুয়া (কালীগঞ্জ) এবং বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আকস্মিক বন্যায় বহু পরিবার পানিবন্দি ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। অনেকেই গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল এবং ১ হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মৌলভীবাজারে পানিবন্দি হাজারো পরিবার: টানা বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার সদর, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। মনু ও ধলাই নদীর একাধিক প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে আউশ ধান ও সবজি ক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক হিসাবে চার উপজেলার ৪ হাজার ১৭৫টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে।
সাতক্ষীরায় রেকর্ড বৃষ্টিপাত
সাতক্ষীরায় গত ২৪ ঘণ্টায় ২১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা জেলার ইতিহাসে এক দিনে সর্বোচ্চ। টানা বর্ষণে জেলাজুড়ে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। তবে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা দ্রুত কমে আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মোরেলগঞ্জে প্লাবিত ২৫ গ্রাম
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণে ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে ৫ শতাধিক মৎস্য ঘের।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রণজিৎ কুমার বলেন, নিচু এলাকার বেশ কিছু ঘের প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সুবল বড়ুয়া (চট্টগ্রাম অফিস), নুপা আলম (কক্সবাজার), সুফল চাকমা (বান্দরবান), মোহাম্মদ আলী (রাঙামাটি), খোকন বিকাশ ত্রিপুরা (খাগড়াছড়ি), ওবাইদুল আকবর রুবেল (ফটিকছড়ি), ইসমাঈল হোসেন (রাঙ্গুনিয়া), আজগর আলী সেলিম (চন্দনাইশ), বাহার উদ্দিন (পেকুয়া), আশরাফুল ইসলাম কহিনুর (হবিগঞ্জ), ইসমাইল মাহমুদ (মৌলভীবাজার) এবং এম. পলাশ শরীফ (মোরেলগঞ্জ) প্রতিবেদক।