চট্টগ্রাম বন্দর
টানা বর্ষণ ও সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আমদানিপণ্য নিয়ে আসা ৫৫টি বড় জাহাজ এখন অলস ভাসছে। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের কান্দলা বন্দর থেকে ৫৪ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন লবণ নিয়ে ৫ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছিল পানামার পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি ট্রুওং মিনহ লাকি’। কুতুবদিয়া বহির্নোঙরে নোঙর করার পর পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাহাজটি থেকে পণ্য খালাস এখনও শুরু করা যায়নি। শুধু এই একটি জাহাজই নয়, টানা বর্ষণ ও সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আমদানিপণ্য নিয়ে আসা এমন অন্তত ৫৫টি বড় জাহাজ এখন অলস ভাসছে।
সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সোমবার থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলে একদিকে লাইটার বা ছোট জাহাজের মালিক ও আমদানিকারকেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে চাল, ডাল, গম, স্ক্র্যাপ, কয়লা, সার, সিমেন্টের ক্লিংকারসহ বিভিন্ন ধরনের খোলা পণ্য (বাল্ক কার্গো) মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিওএ) চেয়ারম্যান সারোয়ার হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর থেকে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। কারণ জাহাজের হ্যাচ (ঢাকনা) খুলে বৃষ্টির মধ্যে খোলা পণ্য খালাস করতে গেলে ভেতরে পানি ঢুকে লাখ লাখ টাকার পণ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বাধ্য হয়েই গত চার দিন ধরে কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে।’
বন্দর কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৫৫টি মাদার ভেসেল অবস্থান করছে। এর মধ্যে ৪টি কন্টেইনারবাহী জাহাজ, ১১টিতে সিমেন্টের ক্লিংকার, ২টিতে চিনি, ৩টিতে খাদ্যশস্য, ১টিতে লবণ, ১টিতে সার, ১২টি অয়েল ট্যাংকার এবং ২১টিতে ব্যালাস্ট, কয়লাসহ বিভিন্ন ধরনের সাধারণ কার্গো রয়েছে। এই ৫৫টি জাহাজের মধ্যে মাত্র ৩টিতে বিশেষ ব্যবস্থায় কাজ চলমান থাকলেও বাকি ৫২টি জাহাজে পণ্য খালাস পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
পণ্য খালাস বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন লাইটার জাহাজের মালিকেরা। ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চট্টগ্রামের সহসভাপতি পারভেজ আহমেদ জানান, সাগর উত্তাল থাকায় লাইটার জাহাজগুলোকে নিরাপত্তার স্বার্থে কর্ণফুলী নদীর ভেতরের অংশে এনে নোঙর করে রাখা হয়েছে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার নিজের চারটি লাইটার জাহাজ পণ্য বোঝাই করে গত চার দিন ধরে বসে আছে। সাগর উত্তাল থাকায় সেগুলো গন্তব্যে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার পণ্য নিয়ে যেসব লাইটার জাহাজ দেশের বিভিন্ন নৌবন্দরে পৌঁছেছে, বৃষ্টির কারণে সেখানেও পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। এতে আমরা চরম আর্থিক লোকসানে পড়ছি।’
আমদানিকারকদেরও গুনতে হচ্ছে বিশাল অঙ্কের জরিমানা। এ বিষয়ে একেএস স্টিল মিলসের উপমহাব্যবস্থাপক ইমরুল কাদের ভূঁইয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আগে থেকে মজুদ করা স্ক্র্যাপ (লোহার টুকরো) দিয়ে কারখানার উৎপাদন আপাতত চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে, তাই উৎপাদনে এখনই বড় প্রভাব পড়ছে না। কিন্তু খালাস বন্ধ থাকার কারণে স্ক্র্যাপ নিয়ে আসা মাদার ভেসেলকে বেশিদিন অলস বসে থাকতে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে খালাস শেষ করতে না পারলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ হাজার মার্কিন ডলার বাড়তি জরিমানা গুনতে হয়। চার দিন খালাস বন্ধ থাকার অর্থ হলো, আমাদের অন্তত ৬০ হাজার ডলার বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।’
বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দরের মূল জেটির কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েনি। বৃষ্টির মাঝেও বন্দরের জেটিতে কন্টেইনার ওঠানামা এবং ইয়ার্ড থেকে কন্টেইনার ডেলিভারি স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, টানা বৃষ্টি শুরুর পরও গত ৭ জুলাই বন্দর থেকে ৩ হাজার ৬৭৫ টিইইউএস কন্টেইনার ডেলিভারি হয়েছে। পরদিন ৮ জুলাই ২ হাজার ৬০৬ টিইইউএস এবং ৯ জুলাই ২ হাজার ৮২০ টিইইউএস কন্টেইনার খালাস হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ায় বহির্নোঙরে খোলা পণ্য খালাস ব্যাহত হলেও বন্দরের ভেতরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো সমস্যা হয়নি। বুধবার দুপুরে মুষলধারে বৃষ্টিতে ইয়ার্ডে কিছুটা পানি জমলেও তা কন্টেইনার ডেলিভারিতে প্রভাব ফেলেনি।’
আবহাওয়া পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে কাঁচামালের এই জট শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত করার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই বৃষ্টি কমার পরপরই আটকে থাকা জাহাজগুলোর জট দ্রুত নিরসনে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারকেরা।