আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ১৩:২২ পিএম
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬ ১৩:২২ পিএম
ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সরকারি দলের নেতাকর্মীরা যাতে ঠিকাদারির কাজ পেতে পারেন, সে লক্ষ্যে বিদ্যমান পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জাতীয় সংসদে এ নিয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই বিধিমালা সংশোধনে ইতোমধ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি পিপিআর সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা তৈরি করবে।
বর্তমানে সরকারি সকল ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫ অনুযায়ী। এই বিধিমালার বিধান অনুযায়ী, ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত কাজের ক্ষেত্রে কোনো অভিজ্ঞতা চাওয়া যাবে না। তবে এই বিধানে অনলাইনে বাংলাদেশের যেকোনো জায়গা থেকে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া যায়। তাছাড়া কাজ বণ্টন করা হয় লটারিতে। এর ফলে সরকারি দল সমর্থকরা ঠিকাদারির কাজ না-ও পেতে পারেন।
একইভাবে পিপিআরে বড় ক্রয় প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উন্মুক্ত ক্রয় প্রক্রিয়ায় (ওটিএম) দরপত্র গ্রহণ এবং এসএলটির মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়ার বিধান রয়েছে। চলতি অর্থবছর বিধিমালায় এই এসএলটি প্রক্রিয়া যুক্ত করা হয়েছে। কেউ যাতে অস্বাভাবিক কম দর দিয়ে কাজ বাগিয়ে নিয়ে পরবর্তী সময় কাজ অসমাপ্ত রাখতে না পারেন এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার বা অতিরিক্ত টাকা দাবি করার মতো ঝুঁকি তৈরি করতে না পারেন, সে লক্ষ্যে এ প্রক্রিয়া চালু করা হয়। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার বিষয়টি বাধ্যতামূলক। কিন্তু গত ১৮ বছরে বিএনপির নেতাকর্মীরা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেননি। সে কারণে তাদের অভিজ্ঞতাও তৈরি হয়নি। পিপিআরের এই ধারায় তারা টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন কিংবা অংশগ্রহণের সুযোগই পাচ্ছেন না।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার চার মাসে সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি, পাবলিক হেলথ, গণপূর্ত, এইচইডি, শিক্ষা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে গিয়ে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা এই প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ক্রয় প্রক্রিয়ায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। এই কাজগুলো পাওয়ার ক্ষেত্রে সম্প্রতি সরকারি দলের নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগ আমলের দাপুটে ঠিকাদারদের আশ্রয় নিতে হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে গত ৮ জুন নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিন বকুল এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে একটি জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিস উত্থাপন করেন। স্পিকারের চেয়ারে বসা ডেপুটি স্পিকারসহ সংসদের সকল মন্ত্রী-এমপি টেবিল চাপড়ে তাকে সমর্থন জানান। এ সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “ই-জিপি টেন্ডারে আওয়ামী লীগ আমলের ঠিকাদারদের কাজ পাওয়া ঠেকাতে সরকার পিপিএ ২০০৬ এবং পিপিআর সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব সমস্যা ও ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার অবগত রয়েছে। এই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা ও কাজের ক্ষতিকর হাতবদল ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনাও হয়েছে”।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর ঘোষণার এক মাসের মধ্যে গত রোববার সন্ধ্যায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এক প্রজ্ঞাপনে সরকারি ক্রয় কার্যক্রমকে আরও ফলপ্রসূ ও অর্থবহ করতে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের (কমিটি ও অর্থনৈতিক) অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, দেশের অর্থনৈতিক ও সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সার্বিক কার্যক্রম সংস্কার ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে ৯ সদস্যের এই কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, নৌপরিবহন এবং সেতু প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, এবং বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম মঈন উদ্দীন আহমেদ।
এই কমিটির কার্যপরিধির বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে যে, ‘অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ; পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ), ২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫-এর অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আওতাভুক্ত অংশ পর্যালোচনাসহ অধিকতর কার্যকর করার বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন এবং অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি কর্তৃক অর্পিত যেকোনো দায়িত্ব পালন।’ কমিটি প্রয়োজনে সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে।
এমপিদের দাবিতে যা ছিল: আশরাফ উদ্দিন বকুল ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্যরা গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার অবকাঠামোসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে জানান। তারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় এলাকার কাজ অন্য জেলা বা বিভাগের ঠিকাদাররা পান। কিন্তু বহিরাগত ঠিকাদাররা অনেক সময় নিয়মিত কাজ তদারকি করেন না, স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকে না, শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং কাজের গুণগত মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার মতো অভিযোগও প্রায়ই পাওয়া যায়। সেই কাজ হাতবদল হয়ে স্থানীয় ঠিকাদারদের কাছেই আসে। কিন্তু তারাও যদি প্রফেশনাল না হন, তাহলে আবারও কাজের হাতবদল হয়। এভাবে কাজের খরচ বেড়ে যায়, বাড়তি খরচ মেটাতে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়। তাতে কাজের গুণগত মান নষ্ট হয়। তবে স্থানীয় ঠিকাদাররা এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা, জনসাধারণের চাহিদা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও মৌসুমি বাস্তবতা সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন। কাজের মান খারাপ হলে তাদের স্থানীয় জনগণের কাছে জবাবদিহিও করতে হয়। স্থানীয় ঠিকাদারদের কাজ দিলে স্থানীয় অর্থনীতি সচল হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও উপকৃত হয় বলে দাবি করেন এমপিরা।
যা বলেছিলেন মন্ত্রী: এর জবাবে সংসদে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, ‘এলজিইডির আওতায় পিপিএ ২০০৬ এবং পিপিআর অনুযায়ী মূলত দুটি পদ্ধতিতে কাজ সম্পাদন করা হয়। এর মধ্যে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে শুধু সংশ্লিষ্ট জেলার ঠিকাদাররাই অংশ নেন, যেখানে বাইরের কারও সুযোগ নেই। তবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে শর্ত ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী দেশের যেকোনো প্রান্তের ঠিকাদার কাজ পেতে পারেন। সঠিক ও যোগ্য স্থানীয় ঠিকাদাররা যাতে যথাযথভাবে কাজ পান এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর মান যাতে বজায় থাকে, সেজন্য বিদ্যমান ক্রয় আইন বা পিপিআর কীভাবে রিভিউ বা সংশোধন করা যায়, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।’
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা : পিপিআর সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণে এ সম্পর্কিত রিসোর্স পারসন হিসেবে কাজ করেন গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দার। তিনি বলেন, ‘বর্তমান পিপিআর অনুযায়ী ইজিপি সিস্টেম একটি নির্দিষ্ট অ্যালগোরিদম মেনে কাজ করে। সে ক্ষেত্রে দরপত্রদাতা সর্বনিম্ন দরদাতা হলেই কাজ পাবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এলটিএমের ক্ষেত্রে কোনো অভিজ্ঞতা চাওয়ার বিধান নেই। তবে তা নির্দিষ্ট অঙ্কের ক্রয়-প্রক্রিয়া পর্যন্ত। অভিজ্ঞতা ছাড়া বড় ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পিপিআর সংশোধন করবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে পাবলিক প্রকিউরমেন্টে ওয়ার্কস অ্যান্ড গুডস নেচারের কাজের মধ্যে ভিন্নতা থাকা দরকার। যেটা বর্তমান পিপিআরে নেই।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে ডলারের ওঠানামার ক্ষেত্রে লিফট ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বর্তমান ইজিপি তা সাপোর্ট করে না।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ক্রয় প্রক্রিয়া সংশোধন করবে।