তোফাজ্জল হোসেন কামাল
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৫১ মিনিট আগে
সীমান্ত পাহারায় বিওপির সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশ-ইন ঠেকাতে বর্ডার আউট পোস্টের (বিওপি) সংখ্যা বাড়িয়েছে বিজিবি। একই সঙ্গে বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থাপন করা হয়েছে টেম্পোরারি অপারেশনাল ব্যাজ (টিওবি)।
এছাড়া দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষায় অপরাধ দমন, চোরাচালান, সন্ত্রাস, মাদক ও নারী-শিশু পাচার রোধে অত্যাধুনিক সার্ভিল্যান্স সিস্টেমের আওতায় করা হচ্ছে কঠোর নজরদারি।
গত মে মাসে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জয়ের পর থেকে পুশইন বা মানুষকে সীমান্ত পার করে ঠেলে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনা বেড়েছে। যাদের অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম বংশোদ্ভূত।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভোটে জয় পাওয়ার পরপরই তার সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির উল্লেখ করে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের’ আটক করার কথা বলেন। প্রায় ৫ হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত যেতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে বাংলাদেশের তরফে দাবি করা হয়েছে, প্রতিটি ঠেলে পাঠানোর ঘটনাকে প্রতিহত করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও সীমান্তের দেশপ্রেমিক মানুষ। একতরফা পুশইন শুরুর পর থেকে তা ঠেকাতে সীমান্তে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে বিজিবিসহ গ্রামবাসী। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক বিজিবি সদস্য সীমান্তে মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে বিজিবির সদস্য সংখ্যা ৬০ হাজার।
বিজিবির মিডিয়া শাখার উপমহাপরিচালক (ডিডিজি) কর্নেল আবুল হাসনাত মো. মাহমুদ আযম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “পুশইন ঠেকাতে বিজিবির সদস্যরা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। এতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন গ্রামবাসী, যাদের ভেতরে দেশপ্রেম ও মনোবল প্রবল। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর পুশইনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সীমান্তে বিওপির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। করা হয়েছে টিওবিও। এসব করা হচ্ছে সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায়”।
বিজিবির বরাত দিয়ে এইচআরডব্লিউ গত ১৭ জুন জানায়, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে তারা শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে ‘পুনইন’ করার অন্তত ২১টি প্রচেষ্টা নস্যাৎ করেছে। এর আগে মে মাসের শেষদিক থেকে জুনের প্রথম ভাগ পর্যন্ত সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্টে অন্তত ২০০ জন মানুষকে বিএসএফ বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
বিজিবি বলছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের বাহিনীর সদস্যদের সাথে স্থানীয় মানুষ একজোট হয়ে বাধা দেওয়ায় বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি কেউ।
একই দিন সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ১৭ জুন বিএসএফের পুশইন করা ২ হাজার ৩৬৯ জনের মধ্যে ২ হাজার ১৭৫ জনকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১১ জনকে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর এবং ১৮৩ জনকে পুশব্যাক করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৮৬০ জনকে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিজিবির হিসাবে, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ২ হাজার ৩৪৪ জনকে পুশইন করা হয়েছে। বিজিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলাভিত্তিক চুয়াডাঙ্গায় ৬২ জন, মেহেরপুরে ১১৬, সাতক্ষীরায় ৩২, কুষ্টিয়ায় ৯, ঝিনাইদহে ২৬, ফেনীত ৬৯, মৌলভীবাজারে ৫৮০, ময়মনসিংহে ৩৩, নেত্রকোণায় ৭৬, পঞ্চগড়ে ১৯৬, লালমনিরহাটে ১৫০, কুড়িগ্রামে ৯১, খাগড়াছড়িতে ১৫৩, ঠাকুরগাঁওয়ে ১০২, দিনাজপুরে ৫২, জয়পুরহাটে ৪, কুমিল্লায় ১৩, সিলেটে ২৮৯, হবিগঞ্জে ৪১, সুনামগঞ্জে ৭৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৯২, নওগাঁয় ৪৬, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৭ ও শেরপুরে ৩১ জন।
বিজিবি জানায়, মে মাসের শেষদিকে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা সংলগ্ন সীমান্তের ভারত অংশে কয়েকশ মানুষ জড়ো হওয়ার বিষয়টি প্রকাশিত হলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী সব অঞ্চলেই নজরদারি বাড়ায় বিজিবি। আর তার পর থেকেই ঝিনাইদহ, যশোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জেলার সীমান্তে এই ‘পুশইন’ করা মানুষ থামাতে থাকে তারা।
বেড়েছে বিওপি, নতুন করে হচ্ছে টিওবি
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, মে মাসের আগে দেশের সীমান্ত এলাকায় বিওপির সংখ্যা ছিল ছয় শতাধিক। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিওপির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এখন ৮ শতাধিক বিওপি রয়েছে সীমান্তে।
তিনি জানান, সীমান্তে একটি বিওপি থেকে আরেকটি বিওপির গড় দূরত্ব ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার। যেখানে দূরত্ব বেশি সেখানেই প্রয়োজন অনুসারে বাড়ানো হয়েছে বিওপির সংখ্যা। এ সংখ্যা আরও বাড়বে। এছাড়া সীমান্তের দুর্গম এলাকা বিশেষ করে বনাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকা রয়েছে, সে সব এলাকার সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ত্রুটি কমাতে স্থাপন করা হয়েছে টেম্পোরারি অপারেশনাল ব্যাজ (টিওবি)।
টিওবির সংখ্যা কত, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই উল্লেখ করে বিজিবির এই কর্মকর্তা বলেন, বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় বিওপি টু বিওপির যে দূরত্ব তা কমাতেই স্থাপন করা হয়েছে টিওবি। আরও টিওবি স্থাপন করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিজিবি সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা মূলত আজও টহল ও স্থানীয় জনগণের সতর্কতার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে বিওপি, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও নিয়মিত টহলের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। সীমান্তের নদীবেষ্টিত এলাকাগুলোয় জলপথেও টহল পরিচালনা করা হয়। এদিকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের উল্লেখযোগ্য অংশ নদী, চর, পাহাড় ও বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে সব এলাকায় একই ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি এখনও।
উড়ছে ড্রোন, কাজ করছে অত্যাধুনিক সার্ভিল্যান্স সিস্টেম
বিজিবি সূত্র জানায়, তারা সীমান্তে রাডার, থার্মাল ক্যামেরা ও হাইস্পিড বোট ব্যবহার করে জোরদার করছে নজরদারি। বিজিবি জওয়ানরা প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, নদীমাতৃক জনপদ ও সুন্দরবনের মতো গহিন বনাঞ্চলেও অক্লান্ত পরিশ্রম করে দায়িত্ব পালন করছেন। সীমান্তের সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে পর্যবেক্ষণ চৌকি স্থাপন ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষ করে যশোর, সাতক্ষীরা, জয়পুরহাট ও টেকনাফ সীমান্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য করা হয়েছে আধুনিক বর্ডার সার্ভিল্যান্স সিস্টেম (বিএসএস) স্থাপন। বিএসএস হলো সীমান্তে সন্দেহজনক চলাচল বা কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যামেরা, সেন্সর ও অন্যান্য নজরদারি প্রযুক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি আধুনিক ব্যবস্থা। এছাড় কক্সবাজার অঞ্চলের টেকনাফ, রামু, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় থার্মাল ইমেজিং সিস্টেম ব্যবহারের মাধ্যমে দিন-রাত নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে। থার্মাল ইমেজিং সিস্টেম এমন একটি প্রযুক্তি, যা মানুষ, প্রাণী বা বস্তুর শরীর থেকে নির্গত তাপ শনাক্ত করে অন্ধকার, কুয়াশা বা কম আলোতেও তাদের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা কী?
বাংলাদেশের দিক থেকে এখন পর্যন্ত সীমান্তে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেছেন, আন্তঃসীমান্ত বিভিন্ন অপরাধ দমনের জন্য মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হবে। ভারতের সঙ্গে সীমান্তের বিভিন্ন স্থানেও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা বিবেচনাধীন।