তারাচরন টিপু, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
‘বারি শিম-৭’ গ্রীষ্মকালসহ বছরের প্রায় সব মাসেই চাষ করা সম্ভব। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
শিম মানেই শীতকাল। দীর্ঘকাল দেশের মানুষ এমন ধারণাই করে আসছে। শীত বিদায় নিলেই বাজারে আর দেখা যেত না জনপ্রিয় এই সবজি। তবে এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র চট্টগ্রামের বিজ্ঞানীরা কয়েক বছরের গবেষণার ফল হিসেবে উদ্ভাবন করেছেন ‘বারি শিম-৭’, যা গ্রীষ্মকালসহ বছরের প্রায় সব মাসেই চাষ করা সম্ভব। নতুন এই জাতটি সফলভাবে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে দেশের সবজি উৎপাদনে নতুন এক অধ্যায়ের শুরু হতে পারে।
গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ‘বারি শিম-৭’ একটি দিবস নিরপেক্ষ ও তাপ সহনশীল উচ্চ ফলনশীল জাত। প্রচলিত শিমের মতো এটি দিনের দৈর্ঘ্য বা শীতল আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে গ্রীষ্মের উচ্চ তাপমাত্রাতেও ভালো ফলন দিতে পারে। এতে শুধু কৃষকের উৎপাদন বাড়বে না, বছরের প্রায় সব সময়ই বাজারে শিমের সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।
এই জাতের শিমের বেশকিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। গাছে সাদা ফুল ফোটে, শিম হয় মাঝারি সবুজ রঙের এবং প্রতিটি শিমে সাধারণত ৪ থেকে ৫টি বীজ থাকে। প্রতিটি শিমের গড় ওজন ৬ থেকে ৭ গ্রাম। গাছের জীবনকাল প্রায় ১৬৫ দিন হওয়ায় লম্বা সময় ধরে ফলন পাওয়া যায়, যা কৃষকের জন্য বাড়তি সুবিধা।
গবেষকদের মতে, সুনিষ্কাশিত দোআঁশ কিংবা বেলে-দোআঁশ মাটিতে এই জাত সবচেয়ে ভালো জন্মে। গ্রীষ্মকালীন চাষের জন্য চৈত্র মাস এবং আগাম শীতকালীন চাষের জন্য ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বপন উপযোগী। প্রতি একর জমিতে মাত্র ২ দশমিক ৮ থেকে ৩ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়।
ভালো ফলনের জন্য জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি পরিমিত ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার প্রয়োগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। এ ছাড়া জাব পোকা, থ্রিপস ও অ্যানথ্রাকনোজ রোগ দমনে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। তবে স্প্রে করার পর অন্তত ১৫ দিন পর্যন্ত শিম সংগ্রহ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, অনুকূল পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে প্রতি শতকে ৬০ থেকে ৭২ কেজি, অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে প্রায় ৬ থেকে ৭.২ টন পর্যন্ত ফলন সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৌসুম ছাড়া অন্যান্য সময় শিমের বাজারমূল্য তুলনামূলক অনেক বেশি থাকে। এ সময় উৎপাদন সম্ভব হলে কৃষকরা অতিরিক্ত মুনাফা পাবেন। ফলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের পুষ্টি নিরাপত্তাও আরও শক্তিশালী হবে।
কৃষি গবেষণা কেন্দ্র চট্টগ্রামের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মনিরুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বছরের যে সময়ে সবজির ঘাটতি থাকে, সেই সময় মানুষের হাতে পুষ্টিকর সবজি পৌঁছে দেওয়াই আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য। সেই চিন্তা থেকেই ‘বারি শিম-৭’ উদ্ভাবন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৬ সালে এই জাতের গবেষণা শুরু হয় এবং ২০২০ সালে তা সম্পন্ন হয়। এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গ্রীষ্মকালেও জাতটি ভালো ফলন দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গ্রীষ্মকালে এই শিমের চাষ হলে কৃষক সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। কারণ ওই সময়ে বাজারে শিমের সরবরাহ কম থাকে। আমরা আশা করছি, চট্টগ্রাম জেলাজুড়ে এই জাতের চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে শিম উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং কৃষকের আয়ও বাড়বে।