প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৩ ১৭:০৪ পিএম
আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৩ ২২:০৮ পিএম
গত বছর ৫ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন লেগে অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়। ছবি : সংগৃহীত
২০২২ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১০৩৪ শ্রমিক; আহত হয়েছেন আরও ১০৩৭ জন। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৩৫ শ্রমিক নিহত এবং ১৫৫ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন সেক্টরে ১৯৬টি শ্রমিক-অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১১৫টি শ্রমিক-অসন্তোষ ঘটে তৈরি পোশাক খাতে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মক্ষেত্র পরিস্থিতি বিষয়ে সংবাদপত্রভিত্তিক বিলস জরিপ-২০২২’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে দুর্ঘটনা, নির্যাতন, শ্রম-অসন্তোষ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সোমবার (২ জানুয়ারি) জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, বিদায়ী বছরে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মৃত্যু আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশ কম। নিহতদের মধ্যে ১০২৭ জন (৯৯ শতাংশ) পুরুষ এবং সাতজন (১ শতাংশ) নারী শ্রমিক। খাত অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ৪৯৯ জন (৪৮ শতাংশ) শ্রমিকের মৃত্যু হয় পরিবহন খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১৮ জন (১১ শতাংশ) শ্রমিকের মৃত্যু হয় নির্মাণ খাতে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১১২ জন (১১ শতাংশ) শ্রমিকের মৃত্যু হয় কৃষি খাতে। এ ছাড়া দিনমজুর ৪৬ জন (৫ শতাংশের কম), কনটেইনার ডিপোতে ৪৪, মৎস্য শ্রমিক ৪৩ জন, ইলেক্ট্রিক শ্রমিক ২২ জন, নৌপরিবহন খাতে ১৫ জন, হোটেল রেস্টুরেন্ট শ্রমিক ১২ জন, ইটভাটা শ্রমিক ১০ জন, জাহাজভাঙা শিল্প শ্রমিক সাতজন, কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি শ্রমিক ছয়জন এবং অন্যান্য খাতে ১০০ জন শ্রমিক নিহত হন।
২০২২ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১০৩৭ জন শ্রমিক আহত হন। এর মধ্যে ৯৬৪ জন (৯৩ শতাংশ) পুরুষ এবং ৭৩ জন (৭ শতাংশ) নারী শ্রমিক। মৎস্য খাতে সর্বোচ্চ ৫০৩ জন (৪৯ শতাংশ) শ্রমিক আহত হন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কনটেইনার ডিপোতে ১২৫ জন (১২ শতাংশ) আহত হন। তৃতীয় সর্বোচ্চ তৈরি পোশাক খাতে ৯০ জন (৯ শতাংশ) শ্রমিক আহত হন। এ ছাড়া পরিবহন খাতে ৮৭ জন (৮ শতাংশ), নির্মাণ খাতে ৮৬ জন (৮ শতাংশ), নৌপরিবহন খাতে ২৫, জাহাজভাঙা শিল্পে ২৩ জন, উৎপাদন শিল্পে ১৫ জন, কৃষি শিল্পে ১৫ জন, মেডিসিন ফ্যাক্টরিতে ১২ জন, দিনমজুর নয়জন, স্টিল মিলে সাতজন এবং অন্যান্য খাতে ৪০ শ্রমিক আহত হন।
সড়ক দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎষ্পৃষ্ট হওয়া, বজ্রপাত, অগ্নিকাণ্ড, সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড়ে ট্রলার ডুবি, পড়ন্ত বস্তুর আঘাত, মাথায় কিছু পড়া, বিষাক্ত গ্যাস, নৌদুর্ঘটনা, দেয়াল/ছাদ ধ্বসে পড়া, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ইত্যাদি কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
২০২১ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১০৫৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়; আহত হন ৫৯৪ জন। নিহতদের মধ্যে ১০০৩ (৯৫ শতাংশ) জন পুরুষ এবং ৫০ (৫ শতাংশ) নারী শ্রমিক ছিলেন। এ ছাড়া ২০২০ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় বিভিন্ন খাতে ৭২৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়; আহত হন ৪৩৩ জন।
জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার পথে ৩৬ শ্রমিক নিহত এবং ১২২ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন (৩৬ শতাংশ) নারী শ্রমিক এবং আহত শ্রমিকদের মধ্যে ৫৩ জন (৪৩ শতাংশ) নারী ছিলেন। ২০২১ সালে কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার পথে ৯১ শ্রমিক নিহত এবং ১১৪ জন আহত হন। ২০২২ সালে কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হন ৩৩৮ জন শ্রমিক। এর মধ্যে ২৯৪ জন (৮৭ শতাংশ) পুরুষ এবং ৪৪ জন (১৩ শতাংশ) নারী শ্রমিক। ৩৩৮ জনের মধ্যে ১৩৫ জন নিহত, ১৫৫ জন আহত, ৩৪ জন নিখোঁজ, একজনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয় এবং অপহৃত ১৩ জনকে পরবর্তীতে উদ্ধার করে পুলিশ। অপহৃতদের মধ্যে ১০ জন মৎস্য শ্রমিক এবং তিনজন ইটভাটা শ্রমিক ছিলেন।
সবচেয়ে বেশি ৯০ জন (২৭ শতাংশ) শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন পরিবহন সেক্টরে, যার মধ্যে ৬৪ জন নিহত, ২৬ জন আহত হন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৬ জন (২০ শতাংশ) শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন মৎস্য খাতে, যার মধ্যে ৪ জন নিহত, ২২ জন আহত, ৩০ জন নিখোঁজ এবং ১০ জন শ্রমিককে উদ্ধার করে পুলিশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩৩ জন (১০ শতাংশ) গৃহশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে ১২ জন নিহত, ২০ জন আহত, একজনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া ৩৩ জন গণমাধ্যমকর্মী নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে একজন নিহত এবং ৩২ জন আহত হন। ২৯ জন নিরাপত্তাকর্মী নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে ১০ জন নিহত এবং ১৯ জন আহত হন। কৃষি খাতে ২৫ জন শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে ১৮ জন নিহত, ছয়জন আহত এবং একজন নিখোঁজ হন।
কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, ছুরিকাঘাত, খুন, রহস্যজনক মৃত্যু, অপহরণ, মারধর ইত্যাদি।
২০২১ সালে কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হন ২৮৬ জন শ্রমিক। এর মধ্যে ২৩২ জন পুরুষ এবং ৫৪ জন নারী শ্রমিক। ২৮৬ জনের মধ্যে ১৪৭ জন নিহত, ১২৫ জন আহত, ছয়জন নিখোঁজ, দুইজনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যা, অপহৃত পাঁচজনকে উদ্ধার এবং একজনের ক্ষেত্রে নির্যাতনের ধরন উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া ২০২০ সালে ২৩২ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হন।
জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে কর্মক্ষেত্রের বাইরে নির্যাতনের শিকার হন ৩৩০ জন শ্রমিক। এর মধ্যে ২১৩ জন নিহত, ৭৪ জন আহত, একজন নিখোঁজ, ৪২ জনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়। ৩৩০ জনের মধ্যে ২৫২ জন (৭৬ শতাংশ) পুরুষ এবং ৭৮ জন (২৪ শতাংশ) নারী শ্রমিক। কর্মক্ষেত্রের বাইরে সবচেয়ে বেশি ৮৫ জন (২৬ শতাংশ) শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন তৈরি পোশাক খাতে, যার মধ্যে ৪০ জন নিহত, ৩৪ জন আহত, একজন নিখোঁজ, ১০ জনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৮ জন (১৮ শতাংশ) শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন কৃষি খাতে, যার মধ্যে ৪৩ জন নিহত, আটজন আহত এবং সাতজন আত্মহত্যা করেন। তৃতীয় সবোচ্চ ৪৬ জন (১৪ শতাংশ) শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন পরিবহন সেক্টরে, যার মধ্যে ৩৪ জন নিহত, সাতজন আহত, পাঁচজন আত্মহত্যা করেন। এ ছাড়া নির্মাণ খাতে ২১ জন শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে ১৬ জন নিহত, দুইজন আহত এবং তিনজন আত্মহত্যা করেন। ১৪ জন দিনমজুর নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে আটজন নিহত, তিনজন আহত এবং তিনজন আত্মহত্যা করেন।
কর্মক্ষেত্রের বাইরে নির্যাতনের ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌন হয়রানি, ছুরিকাঘাত, খুন, রহস্যজনক মৃত্যু, অপহরণ, মারধর ইত্যাদি।
২০২১ সালে ৩০০ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রের বাইরে নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ১৯১ জন নিহত, ৭০ জন আহত, তিনজন নিখোঁজ, ২৬ জনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যা, অপহৃত আটজনকে উদ্ধার এবং দুইজনের ক্ষেত্রে নির্যাতনের ধরন উল্লেখ করা হয়নি। ৩০০ জনের মধ্যে ২১৫ জন পুরুষ এবং ৮৫ জন নারী শ্রমিক ছিলেন। এ ছাড়া ২০২০ সালে কর্মক্ষেত্রের বাইরে ৩৬৪ জন শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হন।
২০২২ সালে বিভিন্ন সেক্টরে সব মিলিয়ে ১৯৬টি শ্রমিক-অসন্তোষের ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি ১১৫টি (৭৯ শতাংশ) শ্রমিক-অসন্তোষের ঘটনা ঘটে তৈরি পোশাক খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫টি (৮ শতাংশ) শ্রমিক-অসন্তোষের ঘটনা ঘটে বিড়িশিল্পে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৪টি (৭ শতাংশ) শ্রমিক-অসন্তোষের ঘটনা ঘটে পাটশিল্পে। এ ছাড়া পরিবহনে ১১টি, টেক্সটাইল শিল্পে ১০টি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট খাতে পাঁচটি, রেলওয়েতে চারটি এবং অন্যান্য খাতে ২২টি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে।
জরিপ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৮৯টি (৪৫ শতাংশ) শ্রমিক-অসন্তোষের ঘটনা ঘটে বকেয়া বেতনের দাবিতে। এ ছাড়া দাবি আদায়ে ৪০টি (২০ শতাংশ), বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে ১৯টি (১০ শতাংশ), বেতন বাড়ানোর দাবিতে ১১টি (৬ শতাংশ), লে-অফের কারণে সাতটি, বোনাসের দাবিতে ছয়টি এবং অন্যান্য দাবিতে ২৪টি শ্রমিক-অসন্তোষের ঘটনা ঘটে।
আন্দোলন করতে গিয়ে এ সময় ১০ জন শ্রমিক আহত হন। আহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ এবং তিনজন নারী শ্রমিক ছিলেন। আহতদের সবাই টেক্সটাইল মিলের শ্রমিক। শ্রমিক-অসন্তোষের ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে বিক্ষোভ (১০৪টি, ৫৩ শতাংশ), মহাসড়ক অবরোধ (৩৫টি, ১৮ শতাংশ), মানববন্ধন (১২টি, ৬ শতাংশ)), ঘর্মঘট (নয়টি, ৫ শতাংশ), কর্মবিরতি (আটটি, ৫ শতাংশ), অনশন (৫টি), স্মারকলিপি প্রদান, র্যালি ইত্যাদি।
২০২১ সালে বিভিন্ন সেক্টরে সব মিলিয়ে ৪৩১টি শ্রমিক-আন্দোলন হয়। সবচেয়ে বেশি ১৭২টি শ্রমিক-আন্দোলন হয় তৈরি পোশাক খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫০টি শ্রমিক-আন্দোলন হয় পরিবহন খাতে। এ ছাড়া ২০২০ সালে বিভিন্ন সেক্টরে সব মিলিয়ে ৫৯৩টি শ্রমিক-আন্দোলনের ঘটনা ঘটে।