শুরু হয়েছে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা। তবে এবারের পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষায় নিবন্ধিত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৩ শতাংশই অংশ নেননি, যা শিক্ষা খাতে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার মূল কারণ হিসেবে শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও প্রস্তুতির অভাবকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ ও প্রস্তুতির অভাবে পরীক্ষার বিষয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ অনুভব করেছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দুই বছর আগে (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) এসএসসি পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিলেন প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে এবার এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। গত বছর পরীক্ষা না দেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি, যা এক বছরের ব্যবধানে ৪ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে। এ বছর এই বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি ফরমই পূরণ করেননি।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ঝরে গেলÑ এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “মূলত প্রস্তুতির ঘাটতি এবং পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কারণে ফেল করার ভয়ে এই বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী ঝরে পড়েছেন। শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টার নির্ভর ছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তারা কোচিং বা কলেজের ক্লাসÑ কোথাও ঠিকমতো অংশ নিতে পারেননি। ফলে ফল নিয়ে তাদের মাঝে একধরনের হতাশা কাজ করেছে এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ অনুভব করেছেন।” ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ও তদারকির অভাবের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেশে মাত্র ১০-১৫ শতাংশ স্কুলে নিয়মিত ক্লাস রুটিন অনুসরণ করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ের মনিটরিং অত্যন্ত দুর্বল।” তার মতে, নিয়ম অনুযায়ী ৭৫-৮০ শতাংশ উপস্থিতি না থাকলে ফরম পূরণের সুযোগ পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে এবং জরিমানার নামে টাকা নিয়ে অনেক স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেয়।
এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “আগে এসএসসির পর সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ত। কিন্তু এবার মাদ্রাসায় ৪৪ শতাংশ, কারিগরিতে ৫৪ শতাংশ এবং সাধারণ শিক্ষায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করে ভবিষ্যতে সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”
সংকট উত্তরণে আধুনিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে ড. মুহাম্মদ আজাদ খান এই প্রতিবেদককে বলেছেন, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ওয়েবসাইটে তাদের ক্লাস রুটিন প্রকাশ করতে হবে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভিডিও কলের মাধ্যমে ক্লাস ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি তদারকি করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এসএম হাফিজুর রহমান বলেন, ‘কাঠামোগত কিছু সমস্যার কারণে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে যেখানে প্রায় ৪০-৫০ লাখ শিক্ষার্থী থাকে, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সেটা ১০-১২ লাখে নেমে আসে। এ বিষয়ে সরকারিভাবে সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
প্রথম দিনের পরীক্ষার চিত্র
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্যমতে, চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনে সারা দেশে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট ১০ লাখ ২৪ হাজার ৯০৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অংশ নিয়েছেন ১০ লাখ ১২০ জন। সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে মোট ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। আর অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বহিষ্কার করা হয়েছে সাতজনকে।
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অংশ নেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৪ জন। অনুপস্থিত ছিল ১৭ হাজার ২৩৩ জন। বহিষ্কৃত হন পাঁচজন (যশোর ২, কুমিল্লা ১, দিনাজপুর ১ ও ময়মনসিংহ ১)। বোর্ড ভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বোর্ডে ৩ হাজার ৯৭১ জন, রাজশাহী বোর্ডে ২ হাজার ৪৯৭, কুমিল্লা বোর্ডে ১ হাজার ৭৯৫, যশোর বোর্ডে ২ হাজার ৭৮, চট্টগ্রাম বোর্ডে ১ হাজার ৩৪০, সিলেট বোর্ডে ১ হাজার ১২৭, বরিশাল বোর্ডে ১ হাজার ৩৪৬, দিনাজপুর বোর্ডে ১ হাজার ৯৩৭ ও ময়মনসিংহ বোর্ডে ১ হাজার ১৪২ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া মাদ্রাসা বোর্ডে কুরআন মাজিদ বিষয়ে ৪ হাজার ৪৭৮ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বাংলা-২ পরীক্ষায় ৩ হাজার ৭৩ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। দুই বোর্ডে বহিষ্কার হয়েছেন একজন করে। তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন বিদেশের ৮টি কেন্দ্রের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।