গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শেষ মুহূর্তে বড় পরিবর্তন আসছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ব্যক্তিশ্রেণি আয়করে আরও ছাড়, আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, মুদি দোকানসহ ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের আওতা মুক্ত রাখা এবং ব্যাংক হিসাব চালু করতে করদাতা শনাক্তকরণ নাম্বার বা টিআইএনের ব্যবহার বাধ্যবাধকতা করার বিধান প্রত্যাহার ইত্যাদি। অর্থবিলÑ ২০২৬-এ এসব পরিবর্তন এনে আগামীকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট পাস হচ্ছে।
১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেন। এই বাজেট ঘোষণার পর বাড়তি রাজস্ব আহরণের জন্য তিনি যে সব কর প্রস্তাব করেন, সেগুলোর বিষয়ে ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সমালোচনার পরপ্রেক্ষিতে বাজেট পাসের আগে এসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে। আগামীকাল জাতীয় সংসদে বাজেট পাসের পর পহেলা জুলাই থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে নতুন অর্থবছরের বাজেট।
ব্যক্তিশ্রেণি করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা
বাজেট ঘোষণার সময় ব্যক্তিশ্রেণি করদাতাদের আয়করে ছাড় দেন অর্থমন্ত্রী। আগে করমুক্ত আয়সীমা ছিল বার্ষিক সাড়ে ৩ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে এই সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর পর বিভিন্ন মহল থেকে করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানোর জোরালো দাবি উঠে। এর যুক্তি হিসেবে বলা হয় যে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়াতে হবে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে জনগণকে স্বস্তি দিতে ব্যক্তি আয়করে আরও ছাড় দিয়ে করমুক্ত সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হচ্ছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।
আবাসন খাতে নেই কালোকে সাদা করার সুযোগ
আবাসন খাতে টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবারের বাজেটে। বলা হয়েছিল, জমির মৌজা মূল্য ও প্রকৃত মূল্যের মধ্যে যে পার্থক্য থাকবে সেই অর্থ কেউ ঘোষণা করলে বিনা প্রশ্নে তা মেনে নেবে এনবিআর। বাজেটে এমন নিয়ম প্রস্তাব করার পর এ নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নবানে জর্জরিত হন অর্থমন্ত্রী। সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে এনবিআর। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে আবাসন খাতে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ আর থাকবে না।
ভ্যাটের আওতায় আসছে না ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা
এবারের বাজেটে আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়নে প্রচুর টাকার দরকার। সে জন্য ভ্যাটের আওতা তৃণমূল পর্যন্ত সম্প্রসারণের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। বাড়তি রাজস্ব আহরণের জন্য মুদি দোকানসহ কম পক্ষে ১৬ টি খাতকে নতুন করে ভ্যাটের আওতায় আনার ঘোষণা দেন তিনি। কিন্তু অর্থমন্ত্রী সংসদকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পর সারাদেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তারা যুক্তি দেন, ছোট ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনলে সাধারণ জনগণের ওপর করের বোঝা আরও বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। তা ছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরকে ভ্যাটের আওতায় আনা হলে তা হবে আইনের পরিপন্থি। শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর নির্দেশে এনবিআর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।
ব্যাংক হিসাবে টিআইএন বাধ্যতামূলক নয়
এবারের বাজেটে ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) দেওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। বাজেট ঘোষণার পরই বিষয়টির পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা হয়। কারণ, টিআইএন থাকলে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। তাই অনেক মানুষকে করযোগ্য আয় না থাকলেও রিটার্ন জমা দিতে হবে। এতে ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার এই সময় এমন ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তাই এ সিদ্ধান্ত থেকে সরকার ‘ইউটার্ন’ নিতে যাচ্ছে।
আরও যেসব পরিবর্তন আসতে পারে
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে স্বর্ণের মূল্য রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। এই বিশেষ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে স্বর্ণ খাতে করের বোঝা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত অর্থ বিলে করদাতার রিটার্নে ঘোষিত স্বর্ণ, রুপা, গহনা, মূল্যবান পাথর, হীরা, মুদ্রা, ডিজিটাল মুদ্রা, শিল্পকর্ম, পুরাকীর্তি ও ক্লাবের সদস্যপদ বিক্রি বা হস্তান্তর থেকে অর্জিত মুনাফাকে মূলধনি মুনাফা হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছিল। এই ধরনের মূলধনি মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়। তবে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের আপত্তির পর এই করের হার ১৫ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে মাত্র ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে। এছাড়া ট্রেজারি বিল, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, ডিবেঞ্চার, সুকুক ও অন্যান্য শরিয়াহভিত্তিক সিকিউরিটিজ এবং বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও স্টক বিক্রি থেকে অর্জিত মূলধনী লাভের ওপরও ১৫ শতাংশ কর আরোপের যে প্রস্তাব রয়েছে, তা কমতে পারে।
দেশের উচ্চশিক্ষার ব্যয় সংকোচন এবং এই খাতের সামগ্রিক বিকাশের কথা চিন্তা করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করপোরেট করের হারেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং শুধুমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি বা আইসিটি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ১০ শতাংশ করপোরেট কর প্রযোজ্য রয়েছে। এই করের হার অর্ধেক কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই প্রস্তাবটি কার্যকর হলে বেসরকারি উচ্চশিক্ষায় স্বস্তি ফিরবে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যয়ভার কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।